‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই’

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৩:৪১ | আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৫:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

কত দিনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে, সে ব্যাপারে সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘এটি রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। তিনি যখন চাইবেন, তখনই নিয়োগ দিতে পারেন। কত দিনের মধ্যে নিয়োগ করবেন সেটা দেশের আইনমন্ত্রী জবাব দিতে পারবে না।’

গতকাল বুধবার রাজধানীর বারিধারায় এক মাদকবিরোধী সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ দাবি করেন। এদিকে গত ১০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি পদত্যাগপত্র পাঠালেও এখনো তার স্থলে নিয়োগের কোনো আভাস দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বিলম্বিত হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদসহ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হলেও এ ক্ষেত্রে বিলম্ব করা সমীচীন হবে না। একটা দেশে প্রধান বিচারপতি না থাকাটা অস্বাভাবিক কাজ।’

জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘এটা ঠিক সংবিধানে কত দিনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবেÑ সে ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এটাও ঠিক রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ আর সংসদ) মধ্যে বিচার বিভাগ একটি। বিচার বিভাগের প্রধানের পদটা খালি রাখা সমীচীন নয়। কারণ এখন যদি হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগের প্রয়োজন হয় বা আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দিতে হয়, তা হলে নবনিযুক্তদের শপথ পড়াবেন কে?’

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র এ আইনজীবী আরও বলেন, ‘নিয়ম হচ্ছে প্রধান বিচারপতিকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। আর প্রধান বিচারপতি শপথ পড়ান আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের। এখন তো তাদের শপথ পড়ানোর কোনো লোক নেই। কারণ ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তো প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেননি আবার শপথ নেওয়ার নজিরও নেই। আর যার নিজেরই শপথ নেই, তিনি অন্যকে শপথ পড়াবেন কীভাবে? আমি মনে করিÑ এসব কারণে বিলম্ব করাটা সমীচীন হবে না। তা ছাড়া দ্রুত নিয়োগ দেওয়াটা তো তেমন কঠিন কাজও নয়।’

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে নিয়োগ হওয়াটা স্বাভাবিক। একটি দেশে প্রধান বিচারপতি না থাকাটা একটা অস্বাভাবিক কাজ। যে রাষ্ট্রে বহুবিধ অস্বাভাবিক কাজ অহরহ হয়, সেই রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যখন চাইবেন তখন, যেভাবে চাইবেন সেভাবে নিয়োগ দেবেন। গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ হতে পারে না। সামন্তবাদে জমিদার, রাজাদের এই অপরিসীম ক্ষমতা ছিল। গণতন্ত্র মানে ক্ষমতাটা নীতি, প্রথা ও আইন দ্বারা সীমিত।’

গত ১০ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে বসেই পদত্যাগপত্র পাঠান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। এর পর ১১ নভেম্বর পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে পৌঁছে। মঙ্গলবার এটি রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেন। এখন রাষ্ট্রপতি তার ইচ্ছেমতো একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। কিন্তু সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে তা কত দিনের মধ্যে পূরণ করতে হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করে থাকেন। এ অনুচ্ছেদে শুধু বলা আছে ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন’। সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কী করণীয় সে ব্যাপারে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে।

এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁহার দায়িত্বপালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোন ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’

এর আগে ২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা যখন ছুটিতে যান, তখনই রাষ্ট্রপতি সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। এখনো তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

গতকাল বারিধারার ওই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমাদের সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি যতক্ষণ পর্যন্ত নিযুক্ত না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতিকে নিয়োগ দিতে পারেন এবং তিনি প্রধান বিচারপতির যা করণীয় সেটা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এখন যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন, তিনি ওই দায়িত্ব পালন করবেন, যতক্ষণ না রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন।’

কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে বিচারপতি সংকট দেখা দিয়েছে। বিচারপতি সিনহার আমলে অনেক বিচারপতি অবসরে গেছেন, অনেকে মারা গেছেন। কিন্তু সেই সব শূন্য পদ পূরণ হয়নি। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে মামলার স্তূপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে উচ্চ আদালতেই পাঁচ লাখের মতো মামলা বিচারাধীন। এ অবস্থায় বিচারপতি নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির শপথ না থাকার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন। এ কারণেও দ্রুতই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রত্যাশা আইনজীবীদের।

আপিল বিভাগের বিচারপতি সংকটের ব্যাপারে সাংবাদিকদের প্রশ্নে গতকাল আইনমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনাদের সঙ্গে আমি একমত, এবং সেটাও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। আমি মনে করি প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর পরই, আপিল বিভাগে বিচারপতির যে স্বল্পতা আছে, সেটা পূর্ণ করা হবে।’

বারিধারায় অনুষ্ঠান : গতকাল ‘আর মাদক নয়, এই হোক প্রত্যয়’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিক মাদক প্রতিরোধমূলক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কনসালট্যান্ট সৈয়দ ইমামুল হোসেন ও প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিকের চেয়ারম্যান নাজমুল হক। অনুষ্ঠানে আনিসুল হক বলেন, দেশের ভেতরে মাদক আমদানি আইন করে প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু আইন করে মাদকসেবন বন্ধ করা যায় না। এর জন্য আইনের পাশাপাশি সচেতনতামূলক প্রতিরোধ কর্মসূচির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে সমাজের সবাইকে দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়ে এ ক্ষেত্রে নিজেও সক্রিয় হওয়ার প্রতিশ্রুতি করেছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তিনি বলেন, ‘আইন করে মাদক আসা-যাওয়া, দেশের ভেতরে ঢোকা, এসব নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু আইন করে মাদকসেবন বা মাদকের ক্ষতিকর বিষয় বন্ধ করা যায় না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে