পুলিশের হামলায় পণ্ড বিএনপির কর্মসূচি

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৩৯ | অনলাইন সংস্করণ

বেধড়ক লাঠিপেটা, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও জলকামান থেকে রঙিন পানি ছিটিয়ে বিএনপির শান্তিপূর্ণ ‘কালো পতাকা প্রদর্শন’ কর্মসূচি প- করে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল সকালে নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের নেতাকর্মীরা কালো পতাকা হাতে দাঁড়ানোর পর পরই পুলিশ ‘হামলা’ চালায়। দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলসহ শখানেক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। অবশ্য বিএনপির দাবিÑ আটকের সংখ্যা দেড় শতাধিক। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনসহ আহত হন অন্তত ২৩০ জন। কার্যত পুলিশের লাঠিপেটা ও মারমুখী অবস্থানের কারণে কার্যালয় নয়াপল্টন এলাকা অশান্ত ছিল।

এ ঘটনার প্রতিবাদে আগামীকাল রাজধানীর থানায় থানায় বিক্ষোভ এবং জেলা সদর ও মহানগরে প্রতিবাদ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পুলিশ বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়েছে অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে সরকার পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিএনপির কোনো শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা কখনো বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু কেউ যদি মাত্রাতিরিক্ত করে জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়, তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কাজটি করার দরকার সে কাজ করে থাকে।

সকাল ৯টার পর নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের আশপাশের অলিগলি ও কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। এদিন পুলিশও ছিল মারমুখী। কার্যালয়ের আশপাশের এলাকায় কাউকে দেখামাত্র আটক এবং কাউকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার পর নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনের ফুটপাতে জড়ো হয়ে কালো পতাকা দেখিয়ে সেøাগান দিতে থাকেন। এর পরই পুলিশ অ্যাকশনে যায়। জলকামান দিয়ে রঙিন পানি ছিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার পর লাঠিপেটা শুরু করে। টিয়ারশেল নিক্ষেপও করতে দেখা যায়। এ ঘটনার মধ্যে সেখানে আসেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নেতাকর্মীদের সামনে এলে পুলিশের ছিটানো রঙিন পানিতে ভিজতে হয় তাকেও। এ সময় গণহারে মহিলা নেত্রীসহ নেতাকর্মীদের আটক করা। সিনিয়র নেতাসহ কিছু নেতাকর্মী কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন। গ্রেপ্তার এড়াতে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের কলাপসিবল গেট বন্ধ করে ভেতর থেকে সেøাগান দেওয়া হয়। এ সময় যেসব নেতাকর্মী বিভিন্ন গলিতে চলে যান, পুলিশ তাদের আটক করে। সাবেক সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরাসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশের ভ্যানে তুলতে দেখা যায়।

পুলিশের হামলার সময় মির্জা ফখরুলকে আহত মহিলা নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়। তিনি পুলিশকে শান্ত থাকতে বলেন। এর আগে কার্যালয়ের বাইরে যে প্যান্ডেল করা হয়েছিল, তাও পুলিশ ভেঙে দেয়।

দায়িত্ব পালনকালে পরিচয়পত্র দেখানোর পরও সমকালের স্টাফ রিপোর্টার কামরুল হাসানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের স্টাফ রিপোর্টার কিরণ শেখকে চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রিপোর্টারদের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বিএনপি নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

মতিঝিল জোনের পুলিশের উপকমিশনার শিবলী নোমান সাংবাদিকদের বলেন, কর্মসূচির জন্য বিএনপিকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। সড়ক দখল করে যান চলাচলে বিঘœ ঘটানো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হতে পারে না। জনদুর্ভোগ লাঘবে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, সব কর্মসূচিতে অনুমতি লাগবে কেন? আমরা তো রাস্তা ব্লক করিনি, মিছিল করিনি। সভা-সমিতি করা যাবে না ঠিক আছে। কিন্তু ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কালো পতাকা দেখানো যাবে না? এটি কীভাবে হয়? এটি মৌলিক অধিকার। তা হলে কী সংবাদ সম্মেলন করতে অনুমতি লাগবে? আমার বাড়িতে কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করতেও অনুমতি লাগবে?

দলের চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের পর থেকে ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। দলটি ঢাকায় ২২ ফেব্রুয়ারি সমাবেশ করতে চাইলে পুলিশ অনুমতি দেয়নি। এর প্রতিবাদে ঢাকা মহানগরীতে কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি।

কর্মসূচিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদিন ফারুক, গোলাম আকবর খন্দকার, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সসহ ২০-দলীয় জোট নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ইরান উপস্থিত ছিলেন।

বেলা ১১টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান কার্যালয়ে প্রবেশের সময় আরেক দফা লাঠিপেটা করে পুলিশ। কার্যালয়ের গেটের ভেতর থেকে কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে আটক করে পুলিশ। বাইরে পুলিশের অবস্থানের মধ্যেই দুপুর ১২টার দিকে দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে সংবাদ সম্মেলন করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ বিনা উসকানিতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা সারাক্ষণ চেষ্টা করছে উসকানি দিয়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার। পুরো পরিস্থিতিকে তারা নিজেরাই এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে, যাতে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, মহিলা নেতাকর্মীদের কী নির্মমভাবে পুলিশ আক্রমণ চালিয়েছে! তাদের পুরুষ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছেÑ এটি আগে কখনো দেখিনি। অফিসের ভেতর ঢুকে গলায় পাড়া দিয়ে টেনেহিঁচড়ে গ্রেপ্তারও করেছে। পুলিশের বিএনপি অফিসকে লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়লে কার্যালয়ের ভেতর এক দম বন্ধ করা হিটলারের গ্যাস চেম্বারের মতো বীভৎস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবার প্রমাণ হলোÑ দেশ এখন দুঃশাসনের করালগ্রাসে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনের ওপর পুলিশ এমনভাবে আক্রমণ করেছে, তিনি গুরুতর আহত হন। আমার সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ছিলেন, তাকেও নিচে ফেলে দিয়ে পিটিয়ে গাড়িতে তোলা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলে, সেই গণতন্ত্র মোনাফেকি ছাড়া আর কিছু নয়। ক্ষমতাসীনদের উসকানির পরও বিএনপি ‘সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।

সংবাদ সম্মেলন শেষে স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। নিজের গাড়িতে ওঠার সময় তাকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে একটি সিএনজিতে করে নিয়ে যায়।

আটককৃতদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য শামীমা সুলতানা শিলা, নেওয়াজ হালিমা আলী, রাশেদা বেগম হীরা, মহিলা দলের বেবী, মনিরা, ফেরদৌসী, মনিকা, ডা. নাসরিন, মায়া, নাছিমা তালুকদার, শ্রমিক দলের লিটন মিয়া, ছাত্রদলের আবদুর রহিম হাওলাদার, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা মহিউদ্দিন, লোবান, শ্যামপুর থানার নাসির মোল্লা, উত্তরের ইমতিয়াজ হোসেন বাবু, সেলিম হাওলাদার, সাব্বিরসহ সংগঠনের বেশ কয়েকজন ছাড়াও গ্রেপ্তার করা হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মী।

ছাত্রদল জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছাত্রদলের ঢাকা কলেজের শাহাদাত হোসেন সোহাগ, গোলাম মোস্তফা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল, সুমন, বাংলা কলেজের ফয়সাল রেজা, তেজগাঁও কলেজের মুনকির হাসান সাগর, ধানম-ি থানার শেখ ফারুকুজ্জামান জুয়েল। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব জানায়, সংগঠনের সহসভাপতি ও বিএনপির সহপরিবার কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন, অধ্যাপক ডা. রফিকুল কবীর লাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিপেটায় আহত দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুন রায়চৌধুরী, মোহাম্মদপুর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লা, চিত্রনায়িকা শাহরিয়ার ইসলাম শায়লাসহ মহিলা নেতাকর্মীদের দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর পরই মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ সিনিয়র নেতারা কার্যালয়ের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে বেরিয়ে যান। বিকালে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের কার্যালয়ের সামনে থেকে দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সাবেক এমপি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের সঙ্গে পুলিশ যে নৃশংস আচরণ করেছে, তা মনুষ্যত্বহীন। তার ঘাড় জাপটে ধরে শার্টের কলার ও বুক-পিঠের কাপড় টেনে সিএনজিতে তোলা হয়। একজন শিক্ষিত ও মননশীল রাজনীতিবিদের সঙ্গে পুলিশের এ আচরণের প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুল ইসলাম খান আলিম, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, আটককৃতদের যাচাই বাছাই চলছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে