সিপাহি বিদ্রোহ স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ

  শান্তা মারিয়া

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০১:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

ঢাকার আন্টাঘর মাঠ। ময়দানের বিভিন্ন গাছের ডালে ঝুলছে মৃতদেহ। সিপাহি বিদ্রোহের পর এভাবেই জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ইংরেজ শাসকরা। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষের সশস্ত্র বহির্প্রকাশ। ইংরেজরা একে সিপাহি বিদ্রোহ নামে অভিহিত করলেও পরবর্তীকালের ইতিহাসবিদরা একে জাতীয় মহাবিদ্রোহ এবং কার্ল মার্কস, ফ্রেডেরিখ অ্যাংগেলসসহ অনেক সমাজচিন্তক, দার্শনিক একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণঅভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাউদ্দৌলাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলায় কোম্পানির শাসনের সূচনা হয়। এর পরের একশ বছর হলো ক্রমাগত শোষণ, লুণ্ঠন, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ইতিহাস। কোম্পানির সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের বারুদে অগ্নিসংযোগ হয়। বাহিনীর দেশীয় সিপাহিরা অভিযোগ করেন যে এই রাইফেলের কার্টুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মিশ্রিত করা হয়েছে হিন্দু ও মুসলমানের জাত মারার জন্য। কারণ এনফিল্ড রাইফেল দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। তবে বিদ্রোহের প্রকৃত কারণটি এত সামান্য ছিল না। বরং এর পেছনে ছিল ইংরেজের একের পর এক দেশীয় রাজ্য গ্রাসের আগ্রাসনমূলক পদক্ষেপ এবং ক্রমাগত শোষণ ও লুণ্ঠন এবং নীলকরদের অত্যাচার। কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরে বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। দেশীয় সিপাহি মঙ্গল পা-ে প্রথম বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মিরাট, দিল্লি, অযোধ্যা, কানপুর ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে। বিদ্রোহী সিপাহিরা শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে স্বাধীন হিন্দুস্তানের সম্রাট ঘোষণা করে যুদ্ধ চালাতে থাকে। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব, তাতিয়া টোপির মতো অভিজাত সম্প্রদায়ের অনেক নেতা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করেন। আবার ইংরেজ শাসনের সুবিধাভোগী নব্যজমিদাররা এর বিরোধিতা করেন। বাংলাদেশে এটি চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরে খ-যুদ্ধ হয়। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে জেলখানা থেকে সকল বন্দিকে মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নেয়, কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়।

যোগ্য নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের অভাবে সিপাহিরা ইংরেজ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। দিল্লিসহ অন্যান্য স্থানে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরভাবে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়। নারী শিশুসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে ইংরেজ বাহিনী। মোগল রাজবংশের সবাইকে হত্যা করা হয় এবং বৃদ্ধসম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে শিকলে বেঁধে রেঙ্গুন নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সেখানে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কে (তৎকালীন আন্টাঘর ময়দান) এ অঞ্চলের বিদ্রোহিদের ফাঁসি দিয়ে মৃতদেহ গাছের ডালে ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। সিপাহি বিদ্রোহের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষ শাসনাধীন হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে