যোগ্য দল খুঁজে পাচ্ছে না ইসি

  আসাদুর রহমান

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করেছে ৭৬টি রাজনৈতিক দল। নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে যোগ্য দল খুঁজে পাচ্ছে না। যাচাই-বাছাই করার সময় দেখা গেছে অধিকাংশ দলই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে পারেনি। অনেক দল দিয়েছে মিথ্যা তথ্য। একাধিক দলের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত দলের গঠনতন্ত্র হুবহু কপি করে জমা দিয়েছে একটি দল। আগামী সপ্তাহেই কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে যাচাই-বাছাই কমিটি। প্রতিবেদন নিয়ে এ মাসেই প্রাথমিকভাবে যোগ্য দলগুলোর কার্যালয় অনুসন্ধানে নামবে ইসি।

জানতে চাইলে নতুন দল যাচাই-বাছাই কমিটির প্রধান ও ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেছুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, বেশ কিছু দল আছে তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দাখিল করেনি। তাদের বিবেচনায় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবার কিছু দল আছে সব কাগজ দেয়নি। বিধি অনুসারে তাদের চিঠি দেওয়া হবে।

নিবন্ধনযোগ্য দলের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেখা গেল অনেকে জেলা-থানা পর্যায়ে নিজেদের অফিসের কথা উল্লেখ করেন। আদৌ তাদের অফিস আছে কিনা সেটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। আগামী রবিবার যাচাই-বাছাইয়ের পরবর্তী মিটিংয়ে প্রাথমিক যোগ্য দলের তালিকা কমিশনে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিতে গত ৩০ অক্টোবর আবেদন আহ্বান করে ইসি। আবেদনের জন্য শেষ দিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর। নির্ধারিত সময়ে ৭৬টি দল নিবন্ধন পেতে আবেদন করে। একাধিক উপসচিবের নেতৃত্বে ইসির অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়।

যাচাই কমিটির সদস্য এক উপসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, দলের নিবন্ধন পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। সেসব শর্ত পূরণ করা হয়েছে মর্মে দালিলিক প্রমাণগুলোও ঠিকমতো দাখিল করেনি অনেক দল। যেমনÑ নিবন্ধনের আবেদনপত্রের সঙ্গে ট্রেজারি চালান দেয়নি কয়েকটি দল। দলের গঠনতন্ত্র কী সে সম্পর্কে নূ্যূনতম ধারণা নেই বেশিরভাগ দলের। দলের সর্বস্তরে নির্বাচিত নেতৃত্ব থাকতে হবে গঠনতন্ত্রে তা উল্লেখ নেই। বিএনপির গঠনতন্ত্র হুবহু কপি করে জমা দিয়েছে একটি দল। এক জায়গায় বিএনপির নামটি পরিবর্তন করে নিজেদের দলের নামটিও বসায়নি। তবে দলটির নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

ইসি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নতুন দলের গঠনতন্ত্রে বেশকিছু তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দলের সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব থাকবে অনেক দলের গঠণতন্ত্রে তা উল্লেখ নেই। প্রতিটি উপজেলায় ২০০ ভোটারের স্বাক্ষর থাকা বাঞ্ছনীয় তা পুরো তথ্য ঘেঁটে কোথাও দেখতে পাননি। একটি দল তাদের ব্যাংকের স্থিতি দেখিয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা; যা ভুয়া। নিবন্ধিত একটি দলের প্রতীক চেয়ে নতুন দুটি দল আবেদন করেছে। এ ছাড়া মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন, বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষের মতো দেখতে গমের শীষ ও গমের ছড়া, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকার মতো দেখতে পানির জাহাজ প্রতীক চেয়েও আবেদন করেছে কয়েকটি দল। তথ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দলকে সময় দেবে ইসি। তবে নিবন্ধনের আবেদনপত্রের সঙ্গে যেসব দল ৫ হাজার টাকার ট্রেজারি চালান দেয়নি সেসব দলকে ১৫ দিনের সময় দিয়ে চিঠি দেওয়া হবে না।

জানা গেছে, ‘নাকফুল বাংলাদেশ’ নামের দলের আবেদনে অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয় দেখানো হয়েছে রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের বিএনএস সেন্টারের দশম তলা। কিন্তু সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নেই। যে কক্ষটিকে দলীয় কার্যালয় হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেটি একটি গার্মেন্টস ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রাজধানীর ২২/১ তোপখানা রোডের বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ ভবনে ৪টি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় রয়েছে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস-বিজেসি’ নামে একটি দল আবেদন করেছে। দলটির সভাপতির ফ্ল্যাটকে কেন্দ্রীয় কার্যালয় দেখানো হয়েছে। এমন আরও অনেক দল দলীয় কার্যালয়ের যে ঠিকানা উল্লেখ করেছে তার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ইসি কর্মকর্তারা।

যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা জানান, বেশ কয়েকটি দল দলীয় কার্যালয়ের নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। যেমন ঠিকানার জায়গায় শুধু মিরপুর-উত্তরা লিখে রেখেছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক কমিটির তালিকা জমা দেয়নি। প্রাথমিক বাছাইয়ে এসব দল বিবেচনা করা হলেও তদন্তে নামলে নিবন্ধন পাবে না বলে মনে করেন তিনি।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনে বলা হয়, নিবন্ধন পেতে হলে একটি দলকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কোনো নির্বাচনে অন্তত একটি সংসদীয় আসন পেতে হবে অথবা যে কোনো একটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ওই আসনে প্রদত্ত মোট ভোটের ৫ শতাংশ পেতে হবে, অথবা দলের একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকতে হবে, দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ২১টি প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা কমিটি থাকতে হবে এবং অন্তত ১০০ উপজেলা/মেট্রোপলিটন থানায় কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থনের প্রামাণিক দলিল থাকতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, তিনটির মধ্যে একটি শর্ত পূরণ হলেই তারা নিবন্ধনের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

এদিকে নিবন্ধনের জন্য যাচাই-বাছাইয়ের সুবিধার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের কাছে সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের তালিকা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ইসি।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ইসির উপসচিব মো. আবদুল হালিম খান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত তারিখের মধ্যে প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ জন্য সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের তালিকা প্রয়োজন। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে তালিকা সরবরাহের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে। চিঠি পাঠানোর পর তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও তালিকা পাঠায়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে মোখলেছুর রহমান বলেন, এখনো তারা কিছু জানায়নি। তাগাদাপত্র দেওয়ার কথা ভাবছেন তারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন দলের নিবন্ধন আহ্বান করেছে ইসি। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুসারে ফেব্রুয়ারিতে আবেদন যাচাই করে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়া এবং চলতি মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার কথা। বর্তমানে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৮০।

আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে