বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি

ব্যর্থতার দায় স্বীকার করলেন বাচ্চু

‘সাবেক এমডি, ক্রেডিট কমিটি ও শাখা ব্যবস্থাপকরা আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন। যারা টাকা নিয়েছেন তাদের আমি চিনি না।’ # দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে আবার অসুস্থ, ডাক্তার বললেন তিনি সুস্থ

  হাসান আল জাভেদ

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে চারটি মামলায় গতকাল প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংক পরিচালনা ও জালিয়াতি প্রতিরোধে নিজের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সাবেক এমডি, ক্রেডিট কমিটির প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকরা তাকে বিভ্রান্ত করেছেন। ঋণের নামে কারা কীভাবে টাকা নিয়েছেন, তাদের তিনি চেনেন না। এগুলো শাখা ব্যবস্থাপক ও ক্রেডিট ডিভিশনের লোকজন বলতে পারবেন। ঋণ জালিয়াতিতে ব্যাংকটির সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, ক্রেডিট কমিটির চেয়ারম্যান ফজলুস সোবহান ও গুলশান শাখার ম্যানেজার ওয়ালিউর রহমানের ওপর দোষ চাপান।

এদিকে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে গতকালও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে ডাক্তার দেখনো হয়। ডাক্তার তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করলে আবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন দুদক কর্মকর্তারা। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি চৌকস দল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এই দলে আরও ছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শামসুল আলম। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আবদুল হাই বাচ্চু ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের ভুল স্বীকার করে নেন। এই ভুলের জন্য তার শাস্তি হওয়া উচিত কিনাÑ এমন প্রশ্নে বলেন, ঋণের সব প্রস্তাব এসেছে শাখা পর্যায় থেকে। এগুলো ক্রেডিট কমিটি যাচাই-বাছাই করে এমডির কাছে দিয়েছে। এমডি সেগুলো যাচাই-বাছাই করে পর্ষদে নিয়ে গেছেন। ফলে জালিয়াতির দায় আমি কেন নেব। এর দায় নিতে হবে ব্যাংকের এমডি, ক্রেডিট কমিটি ও শাখা ম্যানেজারদের।
তিনি আরও বলেন, পর্ষদ ঋণের প্রস্তাবগুলো যখন পর্যালোচনা করে, তখন এ বিষয়ে কেউ কথা বলেনি। পর্ষদেও একাধিক কমিটি ছিল। তারাও কোনো দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে এর দায় আমি একা নেব না।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য আমাদের সময়কে বলেন, কমিশনের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। চলে বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত। এর ফাঁকে তিনি দুপুরের খাবার খেয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদের পর দুদক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে ৪ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুদক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আবদুল হাই বাচ্চু। দুদকের অভিযোগের বিষয়ে আপনি দোষী নাকি নির্দোষÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আবদুল হাই বাচ্চু বলেছিলেনÑ  অভিযোগের তদন্ত চলছে। এখনো অভিযোগ স্ট্যাবলিশ (প্রমাণিত) হয়নি। কাজেই এখনই এটি বলা মুশকিল। তিনি বলেছিলেনÑ দুদকের কর্মকর্তারা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত করছেন। এ বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমার পক্ষে যেটুকু বলা সম্ভব ছিল আমি সেসবের জবাব দিয়েছি। প্রয়োজনে দুদককে আরও সহযোগিতা করব।
বাচ্চুকে গতকাল ২০টি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসব মামলায় তিনি কোনো আসামি নন। এখন জিজ্ঞাসাবাদে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে চার্জশিটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে দুদক জানিয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা তার কাছে জানতে চান, যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকের কাছেও তাদের ঠিকানা ভুয়া। তারা কীভাবে ঋণ পেল। জবাবে বাচ্চু বলেন, এর দায় আমি নেব না। এগুলো শাখা ম্যানেজারদের নিতে হবে। ব্যাংকের সব কাজ চেয়ারম্যান করেন না। চেয়ারম্যান শুধু পর্ষদে সভাপতিত্ব করেন। পর্ষদের অন্য সদস্যরা আলোচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতাদের ভিত্তিতে প্রস্তাব পাস করা হয়। এখানে আপনারা শুধু আমাকে নিয়ে টানছেন কেন, বলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন দুদক কর্মকর্তাদের প্রতি। এ সময় দুদক কর্মকর্তারা বলেন, আপনি তো ছিলেন নেতৃত্বে। সে কারণে আপনাকে আমরা এখন গুরুত্ব দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। পরে অন্যদেরও করব। জালিয়াতির সঙ্গে আরও কারা জড়িত আছে, কাদের ব্যর্থতায় এসব ঘটনা ঘটেছে, তাদের নাম দিয়ে আমাদের সহায়তা করেন। জবাবে বাচ্চু বলেন, আমি সব ধরনের সহায়তা করব।
ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না বলেই আমরা জেনেছি, আপনার নিদের্শেই সব হয়েছেÑ দুদক কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবে কখনো কোনো ব্যাংক চলে না। আমি যেটি করেছি, তা হলোÑ সব বিষয় নিবিড়ভাবে তদারকি করিনি। ব্যাংকের সাবেক এমডি, ডিএমডি, শাখা ম্যানেজারদের বিশ্বাস করেছি। বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ব্যাংক চলে। এর বাইরে ব্যাংক চালানো যায় না।
আবদুল হাই বাচ্চুকে এ নিয়ে চতুর্থ দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রথম, ৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় এবং ৮ জানুয়ারি তৃতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এর মধ্যে দুদক এখন পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ৫৬টি মামলা করেছে।
উল্লেখ্য, প্রায় চার বছর অনুসন্ধান শেষে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় গত বছর রাজধানীর তিনটি থানায় ১৫৬ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। আসামিদের মধ্যে ২৬ ব্যাংক কর্মকর্তা এবং বাকিরা ঋণগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক জরিপ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত।
তবে এ তালিকায় বাচ্চু বা ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের কেউ না থাকায় দুদকের ওই তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে দুদকের বক্তব্য ছিলÑ ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা তারা পাননি। তাই তার নাম আসামির তালিকায় রাখা হয়নি।
কিন্তু ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের নিয়োগ করা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে