বিদেশ থেকেও আসছে নকল ওষুধ

  হাবিব রহমান, কুমিল্লা থেকে ফিরে

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০১:০০ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজর এড়িয়ে কুমিল্লা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবাধে আসছে ভারতীয় ওষুধ। এটি পুরনো খবর। বর্তমানে ভারতে তৈরি নকল ওষুধ সীমান্ত গলে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। এখানেই শেষ নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ভারতীয় ওষুধে নতুন করে উৎপাদন তারিখ লিখে বাজারজাত করছেন একশ্রেণির অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী। দাম কম হওয়ায় নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন তারা। কুমিল্লার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

অনুসন্ধান বলছে, কুমিল্লায় নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ভারতীয় ওষুধের ব্যবসার বড় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এখন বাবুল ওরফে গলাকাটা বাবুলের হাতে। তিনি বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশর নাগরিক। তবে বেশিরভাগ সময় ভারতেই থাকেন। আমীরদীঘির পাড়ের মো. বাচ্চু নামে একজন তার ডান হাত হিসেবে কাজ করেন। কুমিল্লার গোলাবাড়ীর তালতলী বাজার সীমান্ত, কটক বাজার সীমান্ত, শাহপুর ও নিশ্চিন্তপুর পয়েন্ট ভারতীয় ওষুধ প্রবেশের অন্যতম সদর দরজা। সিন্ডিকেটের ভারতীয় অংশের অন্যতম নিয়ন্ত্রক দুর্গাপুরের ভুট্টো মিয়া ও সোনামুড়ার ইদ্রিস আলী। কুমিল্লা শহরে বসে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ করেন’ আলী হোসেন।

আমরাও নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ভারতীয় ওষুধ চোরাচালানের একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে এ চক্রের সদস্য বাচ্চুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু প্রথমে রাজি হননি তিনি। পরে প্রতিবেদক নিজেকে ঢাকার ওষুধ ব্যবসায়ী পরিচয় দিলে কথা বলতে রাজি হন। বাচ্চু সীমান্তে যোগাযোগ শুরু করেন আমাদের সামনেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সঙ্গে দরদাম করতে শুরু করেন। এ সময় বাচ্চুকে জানানো হয়, নমুনা হিসেবে এখন অল্পকিছু ওষুধ নিতে চাই। পরে বড় চালান নিয়ে যাব। মাথাব্যথার ট্যাবলেট সেরিডিন প্রতিপাতা ২৫ টাকা হারে ২০ পাতা ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট টার্গেট প্রতিপাতা ৪৫ টাকা দাম নির্ধারণ করেন। আর একই ওষুধের নকল অথবা মেয়াদোত্তীর্ণটা নিলে অর্ধেকের চেয়ে কম দামে দেবেন বলে জানান। প্রতিবেদক নকল ওষুধ কিনতে চাইলে বাচ্চু বলতে থাকেন, ‘আরে ভাই, ব্যবসা যদি দীর্ঘদিন করার ইচ্ছা থাকে, তা হলে আসলটা নেন। আর যদি কয়েক চালান নিয়ে আর ব্যবসা না করতে চান, তা হলে কম দামিটা (নকল) নেন। এইটাতে বেশি লাভ হলেও কাস্টমার দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারবেন না। কারণ এটাতে (নকল ওষুধ) অসুখ সারবে না।’

অনুসন্ধান বলছে, সীমান্তে ওষুধ চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনেকেরই আবার বাংলাদেশ-ভারতের দুই দেশেরই নাগরিক পরিচয়পত্র রয়েছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে তারা। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একশ্রেণির অসাধু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে এই চক্রে। গোলাবাড়ী সীমান্তের বড়বাড়ী এলাকার মিজানুর রহমান মিছিল বিজিবির লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন। তিনি নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলে বিজিবির অসাধু সদস্যদের হাতে পৌঁছে দেন।

২০ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার গোলাবাড়ী সীমান্ত এলাকায় পৌঁছেন প্রতিবেদক। সঙ্গে স্থানীয় এক সোর্স। মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে যান। তার মাধ্যমে ওষুধ কিনতে চান তিনি। ফারুক নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ ফারুকের মাধ্যমেই ভারত থেকে ওষুধ আনা (স্থানীয় ভাষায় নামানো) হবে। এখানেও সেই একই ব্যাপার। একই ওষুধের দাম দুই ধরনের। তার মানে একটি আসল, আরেকটি নকল। ওইদিন রাতেই ভারতের সোনামুড়া থেকে কমদামি (নকল) ওষুধ নামানো হলো। তাদের হাত থেকে পাওয়া ওষুধের মধ্যে উৎপাদনের তারিখ ঘষামাজা করা দেখা গেল। এসব ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ বলে জানালেন একজন।

ওষুধের সিরাপের বোতল ও ট্যাবলেটের পাতায় ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষায় ওষুধের বর্ণনা রয়েছে। ওষুধগুলোর উৎপাদন তারিখ ঘষামাজা ছিল। ওষুধের প্যাকেটের গায়ে কেন এমন ঘষামাজাÑ জানতে চাইলে ছগির বললেন, সীমান্তের ওপারেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের গায়ে নতুন করে উৎপাদন তারিখ বসানো হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোলাবাড়ী সীমান্তের আলমগীর হোসেন ও তার ছেলে মো. ফারুক নিয়মিত নকল ওষুধের কারবার করেন। কটকপুর সীমান্তে কাশেম আলী, ইলিয়াস, আবুল, লিটন, ইকবাল হোসেন, ইউনুস, জহির, ইদ্রিস, জসিম এই চক্রের অন্যতম সদস্য। এদের মধ্যে আবুল ও লিটন দুই ভাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম সারোয়ার আমাদের সময়কে বলেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি রয়েছে। কোন তারিখে ওষুধ ঢুকেছে, নির্দিষ্টভাবে জানতে পারলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সীমান্ত থেকে ঢাকা পর্যন্ত ভারতীয় ওষুধ পৌঁছে দিতে পথে পথে ৩২ স্থানে লাইনম্যান মোতায়েন করা রয়েছে। স্থানীয় চোরাকারবারিরা এদের ‘টাওয়ার’ নামে ডাকেন। কারণ এরাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব খবর পৌঁছে দেন আগেভাগে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিন আমাদের সময়কে বলেন, নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। সব সময় নজর রাখা হয়।

ভারতীয় ওষুধের মধ্যে শরীর মোটা করা, ব্যথানাশক, ক্যানসার, যৌন উত্তেজক ওষুধ সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হচ্ছে। এর মধ্যে ইউনিপাম ইনজেকশন, আমানটুরেল ক্যাপসুল, সেনেগ্রা, সিপ্রোহিটান, প্যারাকটিম, সিটম্যাক্স, ট্রভিক্স, এভিল, মিরাক, টার্গেট ও টিটেনাস ইনজেকশন অন্যতম। কুমিল্লার অনেক দোকানে অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে এসব ওষুধ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ভ্যাকসিনসহ কিছু কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা না হলে সেটির মান নষ্ট হয়ে যায়। মান নষ্ট হওয়া এসব ওষুধ একসময় বিষে পরিণত হয়। চোরাচালানের সঙ্গে আসা অনেক আসল ওষুধেরও তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এ কারণে এ ধরনের ওষুধের মান নষ্ট হয়ে যায়।

নকল ও ভেজাল ওষুধবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম আমাদের সময়কে বলেন, ভারতীয় ওষুধ বিক্রিকারী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে র্যাব।

নকল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের দায়ে ভারতের হাতি কমিশন সাড়ে চারশর বেশি ওষুধ কোম্পানি বন্ধ করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি থেকেই বোঝা যায় ভারতে নকল ওষুধের আধিক্য কতটা।

বিদেশ থেকে নকল ওষুধ আনা একাধিক চক্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর চীন থেকে নকল ওষুধ আমদানি করার অভিযোগে প্রথমবারের মতো তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডি জানিয়েছিল, দেশের বিভিন্ন নামি কোম্পানির ওষুধ চীনে নকল করে বানানো হয়। দেশের একটি অসাধু চক্র চীনে এসব ওষুধ প্রস্তুত করায়। এর পর তারা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কথা বলে আমদানি করে। ক্যানসার প্রতিষেধকসহ জীবনরক্ষাকারী দামি এসব ওষুধ চীন থেকে এনে দেশের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওই চক্রের কাছ থেকে ২১ হাজার পাতা ওষুধ এবং ৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে