• অারও

জিয়া পরিবারেই চোখ বিএনপির আওয়ামী লীগের আপত্তি জাপায়

  প্রদীপ মোহন্ত, বগুড়া

২১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৮, ০০:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

বিএনপির ‘দুর্গ’ বলে যে আসনগুলো পরিচিত, সেগুলোর অন্যতম বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর)। আর এটিই বগুড়ায় বিএনপির দুর্গের মূল কেন্দ্র। কারণ এটি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান। নেতাকর্মীরা মনে করেন গাবতলী জিয়া পরিবারের জন্য ‘সংরক্ষিত’ আসন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পাঁচবার এখান থেকে নির্বাচন করলেও আগামী নির্বাচনে তার বড় ছেলে বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে প্রার্থী চান স্থানীয় নেতাকর্মীরা। আর কোনো কারণে তিনি নির্বাচন না করতে পারলে সেখানে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে প্রার্থী হিসেবে চান তারা। তবে এরই মধ্যে বিএনপির এ ‘দুর্গে’ আঘাত হানার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এদিকে আগামী নির্বাচনে আসনটি নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চায় মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি। তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের আপত্তি রয়েছে তাতে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চান নিজেদের প্রার্থী। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রথমত, ২০০৮ সাল থেকে এ আসনে দলের কোনো প্রার্থী নেই। ফলে এখানে নৌকা সাংগঠনিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পার্টির এমপি অ্যাডভোকেট আলতাফ আলী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাত্তা দেন না। ফলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তা ছাড়া আগের অবস্থায় এখন আর নেই বিএনপি। মানুষ চোখ বুজে ধানের শীষ প্রতীকে আর ভোট দেবে না। এ কারণে প্রতিপক্ষ যেই হোন না কেন সহজে ছাড় দেবে না আওয়ামী লীগ।

বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত শাজাহানপুর উপজেলায় আছে ৯ ইউনিয়ন, বগুড়া পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ড, ১৪ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডের আংশিক ও বগুড়া সেনানিবাস। এখানকার বর্তমান ভোটার দুই লাখ ১৫ হাজার ৮২৫। আর গাবতলী উপজেলা ১১ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা নিয়ে গঠিত। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে গাবতলী উপজেলায় ভোটার ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার ৯২৬।

বর্তমানে শাজাহানপুর ও গাবতলীর সাংসদ জাতীয় পার্টির (এরশাদ) আলতাফ আলী। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টুকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন আলতাফ আলী।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে এ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজার রহমান পটল। এর পর ১৯৭৯ সালে বিএনপির সিরাজুল ইসলাম তালুকদার, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টু সাংসদ নির্বাচিত হন। এর পর ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১২ জুন, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে টানা সাংসদ নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া।

১৯৯১ সালে এ আসনে প্রথম প্রার্থী হন খালেদা জিয়া। সেই নির্বাচনে তিনি ভোট পান ৮৩ হাজার ৮৫৪। সে সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী টিএম মুসা পেস্তা ভোট পান ২৪ হাজার ৭৬০। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া ভোট পান এক লাখ সাত হাজার ৪১৪ এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওয়ালিউল হক বিলু মাস্টার ভোট পান ২৫ হাজার ২৭৬। একইভাবে ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া ভোট পান এক লাখ ৪৭ হাজার ৫২২। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন কামরুন্নাহার পুতুল। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৫ হাজার ৬২৬।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নবম সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে চারজন প্রার্থী অংশ নেন। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী খালেদা জিয়া দুই লাখ ৩২ হাজার ৭৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোটের প্রার্থী জাপা (এরশাদ) নেতা মুহম্মাদ আলতাফ আলী পান ৯২ হাজার ৮৩৩ ভোট। ওই নির্বাচনে ‘না’ ভোট পড়েছিল এক হাজার ৫৮৭টি। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সে নির্বাচনে মুহম্মাদ আলতাফ আলীর কাছে কমপক্ষে ১০টি কেন্দ্রে খালেদা জিয়া পরাজিত হন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মুহম্মাদ আলতাফ আলীকে আসনটি ছেড়ে দেয়। কিন্তু জেপির (মঞ্জু) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আমিনুল ইসলাম সরকার। ভোটে তিনি পরাজয় বরণ করেন।

একাদশ নির্বাচনে ‘বেহাত’ হওয়া আসন পুনরুদ্ধারে জিয়া পরিবারের বাইরে কাউকেই চিন্তা করছেন না স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শেষ মুহূর্তে জিয়া পরিবারের কেউ প্রার্থী না হলে সে ক্ষেত্রে প্রার্থী হতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, গাবতলী উপজেলার চেয়ারম্যান মোর্শেদ মিলটন ও জেলা বিএনপির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও শাজাহানপুর উপজেলার বিএনপির আহ্বায়ক আবুল বাশার।

আবুল বাশার তরুণ নেতা। দলকে গোছানো থেকে শুরু করে নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সুখে-দুখে পাশে থাকেন তিনি। বারবার কারাবরণ করা এ নেতা সাধারণ কর্মীদের রাজনৈতিক মামলা পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা করেন।

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, কোনো কারণে খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমান বা তার স্ত্রী জোবায়দা কেউ প্রার্থী না হলে বিকল্প হিসেবে আবুল বাশারকে চান তারা।

হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু বলেন, নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানকেই প্রার্থী চান। কোনো কারণে তারা প্রার্থী হতে না চাইলে দলীয় সিদ্ধান্ত যেটা হবে, সেটাই মেনে নেবেন নেতাকর্মীরা।

মহাজোটের প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির ঠা-া লড়াই চলছে। নবম সংসদ নির্বাচনের পর এ আসনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন পেতে লবিং শুরু করেছেন অনেকেই। এ আসনে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের জেলা উপদেষ্টা ও বিএমএ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু, সাবেক এমপি কামরুন নাহার পুতুল, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও জেলা সাংগঠনিক এ কে এম সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলু, জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টি. জামান নিকেতা, গাবতলী উপজেলা সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য এএইচ আযম খান। তাদের মধ্যে ডা. মোস্তফা আলম নান্নু ও আসাদুর রহমান দুলুই মাঠে বেশি সক্রিয়।

দুলু প্রায়ই গাবতলী ও শাজাহানপুরে গিয়ে নানা কৌশলে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। অনেক আগে থেকেই তিনি নির্বাচনী এলাকার অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন। দুলু বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা- বিবেচনায় এনে দল একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেবে বলে তিনি আশা করছেন।

ডা. মোস্তফা আলম নান্নুও নিজেকে যোগ্য প্রার্থী মনে করেন। তিনিও নৌকার মাঝি হতে মাঠে রয়েছেন।

জাতীয় পার্টি থেকে সাংসদ আলতাফ আলী, বগুড়া জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, গাবতলী উপজেলা সভাপতি লিয়াকত আলী সরকার, শাজাহানপুর উপজেলা সভাপতি সার্জেন্ট (অব) আবদুল হান্নান মনোনয়ন চাইতে পারেন।

আলতাফ আলী জানান, তিনি সাধ্যমতো কাজ করেছেন। কিন্তু সবার মন জোগানো সম্ভব নয়। এখন দল চাইলে আবারও নির্বাচন করবেন তিনি।

এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপির সাবেক সাংসদ আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টু প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মেজবাউল আলমও নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

তবে জামায়াত অধ্যুষিত বলে পরিচিত এই এলাকায় আগামী নির্বাচন নিয়ে দলটির এখন পর্যন্ত কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে