মুক্তচিন্তার সংকটে সাহসী সংবাদপত্রের ভূমিকা

  আবুল মোমেন

৩০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৮, ০৫:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

তরুণ সমাজের ওপরই উন্নততর নতুন ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। মানবজীবনের বিরাট-বিপুল-অন্তহীন সম্ভাবনার উপলব্ধি নিয়ে তরুণ সমাজ যদি জেগে ওঠেÑ সৃষ্টির ও প্রগতির লক্ষ্যে তৎপর হয়, তা হলে অপশক্তি যত প্রবলই হোক, টিকতে পারবে না। বাংলাদেশে নতুন সৃষ্টির প্রয়োজনে সত্যসন্ধ মন নিয়ে উত্তরাধুনিকতাবাদ, আধুনিকতাবাদ ও রেনেসাঁসের স্বরূপ জানা আজ একান্ত দরকার। তবে মনে রাখতে হবেÑ সৃষ্টির পথ তৈরি থাকে না, তৈরি করে নিতে হয়। বদ্ধ বিশ্বাস নয়, চাই স্বাধীন চিন্তাশীলতা

সংবাদপত্রের প্রভাবশালী ভূমিকার কথা ভাবতে গেলে সবার আগে মনে আসে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তান আমলের তিনটি পত্রিকার নাম। এই তিনটি পত্রিকা হলোÑ ইত্তেফাক, সংবাদ ও দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার। ষাটের দশকজুড়ে এ পত্রিকাগুলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পুষ্টি দিয়ে গেছে। এটা শুরু হয়েছিল দশকের গোড়ায় ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর সময়। তখন সামরিক শাসক আইয়ুব খান এটা উদযাপন বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের রবীন্দ্রভক্ত সংস্কৃতিকর্মীরা তার খায়েশ মানবেন কেন। তারা উদ্যোগ নিয়ে ঢাকায় ১১ দিন ও চট্টগ্রামে ৭ দিনের অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করেছিলেন। বলা বাহুল্য তারা সমর্থন পেয়েছিলেন ইত্তেফাক, সংবাদ ও অবজারভারের। যে দৈনিক আজাদ পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের ঘরে ঘরে আদৃত হয়েছিল এবার সেটি জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। পাকিস্তানের আদর্শ প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার এ বিশাল কাজে এ তিনটি পত্রিকার ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

ষাটের দশকজুড়েই আন্দোলন হয়েছে। ১৯৬২-তে ছাত্ররা প্রথম মাঠে নামে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে। এটি যদিও গণবিরোধী শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল কিন্তু কার্যত আন্দোলনটি হয়ে ওঠে স্বৈরশাসকবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রথম পদক্ষেপ। এর পর সারাদেশে ছোট-বড় নানা আন্দোলন সংগঠিত করে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণ। আর ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা দেওয়ার পর আন্দোলন তীব্রতা পেতে থাকে। এ সময় বরাবর সমর্থন জুগিয়ে গেছে ইত্তেফাক, সংবাদ ও অবজারভার। এই তিন পত্রিকার তিন সম্পাদক যথাক্রমে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আবদুস সালাম সাংবাদিকতা জগতের মহীরুহ হিসেবে আজও সমাদৃত ও সম্মানিত হন।

পরবর্তীকালের বিখ্যাত সব সাংবাদিকের অনেকেই পঞ্চাশের দশকে যাত্রা শুরু করলেও নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রমাণ দিতে শুরু করেন এই আন্দোলনের দশকটিতে। সিরাজউদ্দিন হোসেন, আসাফ উদ্দৌলা রেজা, আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, এমআর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ, এদের মধ্যে কয়েকজন মাত্র। এই দশকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন রাহাত খান, বজলুর রহমান, আবেদ খান এবং আরও অনেকেই। ১৯৬৬-এর পর আন্দোলন কেবল বেগবান হয়েছে এবং পত্রিকাগুলোর ভূমিকা প্রখর থেকে প্রখরতর হয়েছে। তবে এ কথা মানতে হবে, এই তিন পত্রিকার মধ্যে ইত্তেফাক তার রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য আলাদাভাবে চিহ্নিত হতে পারে। আর সংবাদ তার সমাজতান্ত্রিক প্রগতিশীল ভূমিকার জন্য হয়ে উঠেছিল বিশিষ্ট।

পূর্ববাংলার পত্রিকা আর সাংবাদিকদের ওপর যে পাকিস্তানি জান্তা প্রবল বিরূপ ছিল তা বোঝা যায় ১৯৭১-এ অপারেশন সার্চলাইটের শুরুতেই তারা ইত্তেফাক ও সংবাদ অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। আর পাকিস্তানি দখলদাররা পুরো ৯ মাস সাংবাদিকদের পেছনে লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তালিকা করে বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্যে একটি বড় অংশ ছিলেন সাংবাদিকরা। সম্ভবত বাংলাদেশের জন্মের পেছনে সংবাদপত্রের বিশাল কার্যকর ভূমিকার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশ ও সাংবাদিকতার দিকে অনেকেরই ঝোঁক রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকা এবং প্রত্যেক জেলা শহর থেকে প্রতিদিন সকালে শত শত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ পত্রিকার পাঠক কম, আর্থিকভাবে সফল নয় এবং কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালনে অক্ষম। এ রকম অবস্থায় পেশাদারী দক্ষতা এবং মনোভাব ছাড়া অসংখ্য তরুণ সাংবাদিকতা পেশায় আসছেন। আর শিল্প হিসেবে না ভেবে অন্যান্য বিবেচনা থেকে অনেকেই পত্রিকা প্রকাশে নেমে পড়ছেন। তাতে সাংবাদিকতা মান হারাচ্ছে, পত্রিকার মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। যে উচ্চমানের ঐতিহ্যের কথা লেখার গোড়ায় বলা হয়েছে তা থেকে আমরা এখন সরে আসছি। গত কুড়ি বছরে মুদ্রণ, গণযোগাযোগ ও প্রচারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে। এর প্রভাব গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পড়েছে। মুদ্রিত পত্রিকার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে টেলিভিশনের সংবাদ ও সাংবাদিকতা, তাকেও টেক্কা দিতে পারে অনলাইন পত্রিকা, ই-পেপার, নিউজপোর্টাল ইত্যাদি। পুবে-পশ্চিমে সর্বত্র আলোচিত বিষয় হলো আগামী দিন হলো অনলাইন পত্রিকার যুগ, মুদ্রণমাধ্যমের অবসান হতে চলেছে। পশ্চিমে সত্যিই কোনো কোনো বড় পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেছে, সাপ্তাহিক সাময়িকীও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আলামতটা স্পষ্ট। বাংলাদেশেও সব কটি পত্রিকার রয়েছে অনলাইন সংস্করণ। তরুণ পাঠকরা এগুলোই পড়ছেন, দেখছেন। জরিপেও দেখা যাচ্ছে, তরুণদের মধ্যে মুদ্রিত পত্রিকার পাঠক কম, গ্রাহক প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক পত্রিকা তাই সংবাদ, সংবাদভাষ্য প্রকাশেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ না রেখে তরুণদের নিয়ে ও তাদের আকৃষ্ট করে নানারকম প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাজকর্মের সূচনা করেছে। এভাবে হলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা পেতে চাইছে সংবাদপত্র।

তবে এটা মানতে হবে সেই গত শতকের ষাটের দশকে হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা সমগ্র জাতির ওপর যেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল, জাতিকে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ায় ভূমিকা রাখতে পেরেছিল তার সম্ভাবনা আজকে আর দেখা যাচ্ছে না। সেকালে খবর জানার উৎস ছিল দুটিÑ পত্রিকা ও বেতার। তার ওপর সবার বাড়িতে রেডিও ছিল না, আর পাকিস্তান রেডিও ছিল সরকারের প্রচারযন্ত্র, মানুষ তাকে বিশ্বাস করত না। এ কারণে ১৯৭১-এ অবরুদ্ধ দেশে মানুষ দেশের পত্রিকা ও রেডিও পাকিস্তান ছেড়ে বিবিসি ও আকাশবাণীর খবর শুনত, এগুলো শুনে নিজেদের মনোবল চাঙ্গা রাখত। আজকের দিনে অনেক পত্রিকা, অসংখ্য চ্যানেল, মোবাইলে তাৎক্ষণিক খবর, অনলাইন ও ই-পেপারে ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপডেটÑ কারো পক্ষেই আর খবর না জেনে থাকা সম্ভব নয়। ফলে আজ মানুষ এককভাবে কোনো পত্রিকার মুখাপেক্ষী নয়। কোনো একক পত্রিকার পক্ষে আগের মতো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করাও অসম্ভব। তবু এর মধ্যে পত্রিকাই একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সংবাদমাধ্যম। অনলাইন, ই-পেপার বা মোবাইলের খবর অনবরত পরিবর্তিত হয়, তার সাহচর্য পায় না পাঠক। পাঠকের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের মধ্যে একসঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পত্রিকা হাতে পাওয়া, তা সঙ্গে রাখতে পারা, প্রয়োজনে পুনরায় দেখে নেওয়ার সুযোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটা কাগজ পৌঁছে দেওয়া বা সংগ্রহ করা এবং বয়ে বেড়ানোর অসুবিধার মধ্যেও সংরক্ষণ সুবিধা ও পুরনো অভ্যাসের কারণে পত্রিকার এই গ্রহণযোগ্যতা এখনো যায়নি। সম্ভবত আরো বেশ কিছুকাল থাকবে।

কিন্তু এ অবস্থায় সংবাদপত্রের জন্য টিকে থাকা এবং শিল্প হিসেবে বিকশিত হয়ে সফল থাকার চ্যালেঞ্জটা বেশ বড় এবং অত্যন্ত জটিল। সারা বিশ্ব এখন সবার ভাবনার ক্ষেত্র, নানা বিচিত্র বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, নতুন নতুন অনেক ইস্যু যুক্ত হচ্ছে ভাবনার জগতে, মানবজাতির জন্য সংকটও বাড়ছে। মানুষের জন্য চিন্তার ক্ষেত্র বেড়েছে, যথার্থ চিন্তার গুরুত্ব বেড়েছে নতুন প্রযুক্তি আর নানা ভাবনা-চিন্তার মধ্যে সবাইকে যুক্ত করাও দরকার। এ কাজ কে করবে? কে জানাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিশাল প্রভাব এবং তা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে? বিশ্বের নানা প্রান্তে হঠাৎ করে অস্থিরতা কেন বাড়ছে, যুদ্ধই বা বাড়ছে কেন? কে ব্যাখ্যা করবে সারা বিশ্বে উদার মানবতার ও গণতন্ত্রের সংকট বাড়ছে কেন? না, এখনো সংবাদপত্রের প্রয়োজন ফুরায়নি। প্রয়োজন হলো চাহিদা বুঝে পুরোদস্তুর পেশাদারি যোগ্যতা নিয়ে প্রতিদিনের কাগজটা প্রকাশ করা। এর জন্য যেমন চাই ভালো প্রতিবেদক, সম্পাদনায় দক্ষ অভিজ্ঞ সাংবাদিক, তেমনি প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানতুল্য সম্পাদকÑ যাদের কথা আমরা গোড়ায় বলেছি। আর আজকের দিনে এ খাতে বিনিয়োগ হতে হবে শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার মানসিকতা নিয়ে। আমাদের দেশে ব্যক্তির খেয়াল থেকে কুটির শিল্পের মতো সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়ে আজ রীতিমতো শিল্পের দাবি তারÑ এটা যেন না ভুলি। বর্তমান বাস্তবতায় আগের মতো প্রভাব বিস্তারকারী সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে পারে। আর মুক্তচিন্তা ও সত্যের সংকটকালে সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সংবাদপত্রের কোনো বিকল্প নেই।

আবুল মোমেন : কবি ও প্রাবন্ধিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে