সরেজমিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২

শায়েস্তা খানের হাট!

সিন্ডিকেটে ত্রাণ বিক্রি

  হাসান আল জাভেদ, উখিয়া কক্সবাজার থেকে ফিরে

২৫ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৮, ০১:০১ | অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মতো ছোট দানার আতপচালের ভাতেই অভ্যস্ত মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। তাই ক্যাম্পগুলোয় সেরা জাতের আতপচালই ত্রাণ হিসেবে দিচ্ছে বিদেশি সংস্থাগুলো। কিন্তু ৬ এপ্রিল বিকালে উখিয়ায় সরজমিন গিয়ে দেখা গেল অন্যরকম এক চিত্র। স্থানীয় কোর্টবাজার সড়কের ধারে রোহিঙ্গাদের দেওয়া জাতিসংঘ খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) ত্রাণের চালের বস্তাগুলো ‘দিনাজপুরের বিখ্যাত চাউলের’ বড় বস্তায় ভরছিলেন দুজন। পাশেই চলছে বস্তা সেলাই। জানতে চাওয়া হয় এ চাল কোথায় যাবে? পেছনের মেসার্স আরজে বাণিজ্যালয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন এক শ্রমিক।

কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশের এই প্রতিষ্ঠানটির সামনে পরদিন গিয়ে দেখা গেল ত্রিপলে ঢাকা অনেকগুলো ডালের বস্তা। গায়ে লেখা ‘নট ফর সেল’। প্রতিষ্ঠানের মালিক জাফর সওদাগর বলেন, ‘উখিয়ায় চাল-ডালের চাহিদা কম। এগুলো চট্টগ্রাম যাবে।’ রোহিঙ্গাদের চাল তো বিক্রি নিষেধ, এ কথা বলতেই ঠোঁটের কোনায় হাসি এনে জাফর সওদাগর বলেন, ‘কোর্টবাজার, কোর্টবাজারের সোনারপাড়া রোড, উখিয়া, কুতুপালংয়ে সবাই এভাবে ব্যবসা করছে। আসলে রোহিঙ্গাদের এত ত্রাণ লাগে না! ওরাই স্থানীয় লোকজনের কাছে এগুলো বিক্রি করে। আর স্থানীয়রা আমাদের দেয়।’

কোর্টবাজার বা কুতুপালংয়ে শুধু আরজে বাণিজ্যালয়েই রোহিঙ্গাদের পণ্য কেনা-বেচা হয় তা নয়, এলাকার প্রায় সব দোকানেই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ডব্লিউএফপি, ইউএনএইচসিআরসহ দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর দেওয়া সব পণ্য। উখিয়ার বাজারে টুথপেস্ট, প্রসাধনী থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য, বিস্কুট, তেল, ডাল, মশারি, বালতি, ত্রিপল, কম্বল, বিছানা, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু এখানে কিনতে পাওয়া যায়।

প্রতিদিন কোর্টবাজারে আবুল হোসেনের প্লটে বসে রোহিঙ্গা বাজার। দোকান রয়েছে অর্ধশত, ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন রঞ্জন আলী নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি শায়েস্তা খাঁর হাট। কারণ নামমাত্র টাকায় মেলে এসব পণ্য। ইউনিলিভারের একটি ৪০০ মিলি ‘ভ্যাসলিন’ বডি লোশনের দাম ৪৪৫ টাকা হলেও এখানে পাওয়া যায় ৮০ টাকায়। ৭০ টাকার পেপসোডেন্ট টুথপেস্ট ৩০ টাকা, ২৮ টাকার লাইফবয় সাবান ২০ টাকা, ১০৫ টাকার এক লিটার সয়াবিন তেল ৪০ টাকা, ৭৫ টাকার এপেক্স সেন্ডেল ৪০ টাকা। স্থানীয়ররা ছাড়াও এসব পণ্য কিনছেন ব্যবসায়ীরা।

ওই বাজার থেকে ১৪ এপ্রিল চার বোতল সয়াবিন তেল কেনেন সোনারপাড়া বাজারের দোকানি রহমত উল্লাহ। তিনি জানান, বাড়তি লাভের আশায় এসব পণ্য কেনা। তবে বাধাহীন রোহিঙ্গা পণ্য বিক্রিতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী। কোর্টবাজারের দোকানদার জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘সৎভাবে ব্যবসা করতে হলে লোকসানে বিক্রি করতে হবে। আবার রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিক্রি করে রাতারাতি ধনী হওয়ারও উপায় আছে।’

রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা জানান, চাহিদার তুলনায় বেশি বা সব পণ্য ব্যবহারে রোহিঙ্গারা অভ্যস্ত নয়। তাই কিছু বিক্রি করে দেওয়া হয়। আবার অনেকেই কম খেয়ে একটা অংশ বিক্রির অর্থে কেনেন মাছ-তরকারি। কিন্তু ক্যাম্প থেকে শুরু করে তিন-চারবার হাত বদলে ন্যায্য দর থেকে বঞ্চিত তারা। এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়ায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। কারণ অর্থের আশায় অনেকেই তা না খেয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার না বুঝে শিশু খাবার বিক্রি করে দেওয়ায় অপুষ্টি বাড়বে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, ‘অন্যান্য উপকরণ কিনতে রোহিঙ্গারা ত্রাণ বিক্রি করবেই। তবে এটার ন্যায্যমূল্য না পেলে তারা আরও সমস্যায় পড়বে। এ জন্য প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।’

১৫ এপ্রিল সকালে বালুখালী পানবাজারে রোহিঙ্গাপ্রতি ৭৫৩ টাকার ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট কার্ড’ বণ্টন করছিল ডব্লিউএফপি, যাতে প্রয়োজনীয় পণ্য নিজেরাই কিনতে পারে। কিন্তু স্থানীয় কয়েক বাংলাদেশি যুবক সেসব কার্ডের পণ্য জোর করে কিনে নেন। স্থানীয়রা জানান, এরা পালংখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আফসার উদ্দিন এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ফজল কাদের ভুট্টোর লোকজন। মূলত তাদের নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের ত্রাণ পাইকারি বাজারে বিক্রি করে। এসব সিন্ডিকেটের কাছে এক-চতুর্থাংশ দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আফসার উদ্দিন বলেন, ‘আমি অসুস্থ। এ অভিযোগ মিথ্যা।’

ডব্লিউএফপির তথ্যমতে, ২৫ আগস্ট থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ক্যাম্পে ২ লাখ ৯ হাজার ২৭ জন রোহিঙ্গা ই-কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যসহায়তা নিয়েছে। এ ছাড়া গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৬৬ পরিবারের ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৭ রোহিঙ্গার মধ্যে ৫১ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন খাদ্য বণ্টন করেছে জাতিসংঘের এ সংস্থাটি। উখিয়া-টেকনাফের পাঁচটি পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে ১১ লাখ ১ হাজার ১০৭ জনের বায়েমেট্রিক নেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, এক থেকে তিনজনের পরিবারে মাসে ৩০ কেজি চাল, ৩ লিটার সয়াবিন তেল, ৩ কেজি ডাল দেওয়া হয়। চার থেকে সাতজনের পরিবারে দ্বিগুণ। আর আটজনের বেশি সদস্যের পরিবারে মাসে ১২০ কেজি চাল, ৫২ কেজি ডাল, ৩৬ লিটার সয়াবিন তেল বণ্টন করা হয়।

শরণার্থী ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্য দিতে না পারায় তারা কিছু বিক্রি করে অন্যান্য চাহিদা মেটাচ্ছে। এতে সুযোগসন্ধানীরা ঠকানোর কৌশল নিয়েছে। সে জন্য কার্ড দেওয়া হচ্ছে।’

জেলা পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর উখিয়া-টেকনাফে জিনিসের দাম বৃদ্ধি পায়। এনজিওর ত্রাণ বিরতণে অনিয়ম, বহিরাগতদের সঙ্গে আঁতাত করে রোহিঙ্গাদেরই একটি গ্রুপ ত্রাণবাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ করায় ক্যাম্পে কোন্দল ও দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে