পুলিশে ইয়াবা সিন্ডিকেট

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও ইউসুফ সোহেল

১৭ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ মে ২০১৮, ১৪:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বেশিরভাগ সময় সিন্ডিকেট গড়ে ইয়াবাবাণিজ্য চালিয়ে থাকেন। এবার আইনের রক্ষক পুলিশেও মরণঘাতী ইয়াবা বড়ি ব্যবসার একটি সিন্ডিকেটের হদিস পেয়েছে খোদ পুলিশই। গতকাল হাইওয়ে পুলিশের

এক এসআইসহ এই সিন্ডিকেটের দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের সদস্যরা। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেনÑ রাজবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের এসআই বিল্লাল এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার পুলিশ কনস্টেবল আসাদ। গতকালই তাদের নারায়ণগঞ্জের কোর্টে তোলা হয়। দুজনের মধ্যে এসআই বিল্লালকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কনস্টেবল আসাদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন রূপালী আবাসিক এলাকার বাসা থেকে পুলিশের এএসআই আলম সরোয়ার্দী রুবেলকে ৪৯ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশ। উদ্ধার করা হয় ইয়াবা বিক্রির ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জ সদর থানার এই এএসআই সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ইয়াবা সিন্ডিকেটের গোমর ফাঁস করে দেন। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেন। তার জবানবন্দিসহ এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ৯ আসামির মধ্যে ৭ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দিতে ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িত সব পুলিশ সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়। এর পরই সিআইডি এসআই বিল্লাল ও কনস্টেবল আসাদকে গ্রেপ্তার করে। এক পুলিশ পরিদর্শকসহ আরও বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়ে গেছেন। যাদের নাম এসেছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুল ইসলাম বলেছেন, এসআই বিল্লালকে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। এখন বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একজন এসআই ও কনস্টেবল গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, নারায়ণগঞ্জের একটি ইয়াবা ব্যবসার মামলা তদন্তকালে আমরা বেশ কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ীর নামধাম পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রয়েছে। এখানে কে পুলিশ আর কে ইয়াবা ব্যবসায়ী এটা আমরা দেখছি না।

আদালত সূত্র বলেছে, এএসআই রুবেলের দখল থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় বন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। ওই মামলায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। এর পর সিআইডি মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে ডিএমপির সিসিটিসির এএসআই হাসানও রয়েছেন।

১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃত মাদক ব্যবসায়ী রুনুর স্বামী সাইফুল ইসলাম আরিফ ওরফে বাবা আরিফ (গত ২৬ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন) মুন্সীগঞ্জের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলেন। মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত অবস্থায় এসআই বিল্লাল ও মোর্শেদ (ঘটনার সময় মুন্সীগঞ্জ ডিবিতে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে নরসিংদী জেলা পুলিশে কর্মরত) এবং এএসআই রুবেলের সঙ্গে পরিচয় হয় বাবা আরিফ ও তার স্ত্রী রুনুর। এর পর তারা ইয়াবা সেবন ছাড়াও জড়িয়ে পড়েন মাদক সিন্ডিকেটে। গত বছর অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয় বাবা আরিফ। জেলহাজতে আটক অবস্থায় অসুস্থতার অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বাবা আরিফ। ঘটনার কয়েক দিন আগে এসআই বিল্লাল ঢামেকে গিয়ে বাবা আরিফকে বলেন, ‘ইয়াবার একটি বড় পার্টি আছে, পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করো। রুনু টাকা জোগাড় করে বিল্লালকে জানালে এসআই বিল্লাল ইয়াবা বিক্রির পার্টি ঠিক করেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা আরও জানান, টেকনাফের শফি ইসলাম ওরফে শফিক দেশের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের একজন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা সরবরাহ করে তার গ্রুপের সদস্যরা। এই গ্রুপের অন্যতম সদস্য হলেনÑ লোকমান, রহিম, মান্নান, সিদ্দিক, রাজ্জাক, হুমায়ুন ও সোহাগ। গত ৬ মার্চ ইয়াবার ডিলার ছোটনকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা নেওয়ার জন্য চকরিয়া নিউমার্কেটের সামনে আসতে বলেন ইলিয়াস। সেদিন রাত ৯টার দিকে ইলিয়াসসহ আরও ৩ জন মাইক্রোবাসে করে নিউমার্কেটে আসেন। এ সময় ইলয়াস ছাড়া সবাই মাস্ক পরা ছিলেন। ইলিয়াস ছোটনকে ইয়াবা ভর্তি ব্যাগ দিয়ে কাভার্ডভ্যানে (ড্রাইভার বিল্লাল ও হেলপার আ. রহমানের) করে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে পাঠিয়ে দেন।

এএসআই রুবেল জবানবন্দিতে বলেছেন, এএসআই হাসান নারায়ণগঞ্জে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাদের দুজনের পরিচয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে রুবেল এএসআই হাসানকে আরিফের মোবাইল নম্বরের ভয়েস রেকর্ড করতে বলেন ও তার কোনো ইয়াবা চালান এলে রুবেলকে তা জানাতে বলেন। ঘটনার দিন বিকাল ২টার দিকে এএসআই হাসান এএসআই রুবেলকে ইয়াবার চালানের বিষয়ে ফোন দেন। সংযোগ করতে না পেরে ‘এমডি হাসান’ নামে একটি ম্যাসেঞ্জার আইডি থেকে রুবেলকে ফোন দিয়ে তিনি জানান, বাবা আরিফের ইয়াবার চালান ঢাকায় ঢুকছে, বিকালে তার স্ত্রী রুনু মদনপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ইয়াবা রিসিভ করবে। তথ্য পেয়ে সেদিন বিকালে বন্দর থানার মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত কনস্টেবল আসাদ ও সোর্স রিয়েলকে নিয়ে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নেন এএসআই রুবেল। মদনপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ইয়াবার এই চালান ও ৫ লাখ টাকাসহ তারা আটক করেন রুনু ও আবদুুর রহমানকে। এ সময় পালিয়ে যান রুনুর ভাবি।

পরে আটকদের নিয়ে রুবেল বন্দর থানাধীন রূপালী আবাসিক এলাকায় তার বাসায় নিয়ে যান। বাসায় আসার আগে এসআই মোর্শেদ ফোন দিয়ে এএসআই রুবেলকে বলেন রুনুকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু রুবেল তার কথা না শোনায় রুনুকে ছাড়াতে রাতেই রুবেলের বাসায় চলে আসেন এসআই মোর্শেদ। উপায়ান্তর না পেয়ে এএসআই রুবেল মোবাইল ফোনে পুরো বিষয়টি জানান একজন পুলিশ পরিদর্শককে। তিনি রুবেলকে আসামিদের ছেড়ে দিতে বলেন। শুধু তা-ই নয়, ৫০ হাজার পিস ইয়াবার মধ্যে ৪৫ হাজার ইয়াবা রেখে বাকিগুলো দিয়ে অন্য একটি আসামিকে মামলা দিতে বলেন। অবশিষ্ট ইয়াবা ও ৫ লাখ টাকা রুবেলের কাছে রাখতে বলেন তিনি। তার কথামতো একটি সাদা কাগজে সই রেখে রুনুকে ছেড়ে দেন এএসআই রুবেল। এদিকে চকরিয়ার ইলিয়াসের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আ. রহমানকে কনস্টেবল আসাদ ও সোর্স রিয়েলের মাধ্যমে বাসে করে লাকসাম পাঠিয়ে দেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে