নির্বাচনী রাজনীতি চট্টগ্রাম-১১

লতিফকে ঠেকাতে একাট্টা আ.লীগ

  হামিদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম

১৭ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ মে ২০১৮, ০৪:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

এ মুহূর্তে চট্টগ্রামে একজনের মনোনয়ন ঠেকাতে একাট্টা পুরো আওয়ামী লীগ। তিনি হলেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য এমএ লতিফ। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক এ সভাপতির বিরুদ্ধে আছে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করার অভিযোগ। তিনি বঙ্গবন্ধুর মাথার সঙ্গে নিজের শরীর জুড়ে দিয়ে তৈরি বড় বড় পোস্টার সারা শহরে প্রচার করেন। জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন চাষী কল্যাণ সমিতির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে সেখানে নিজের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি চট্টগ্রাম-১১ আসনে সংসদ সদস্য। অথচ দলের নেতাকর্মী ও দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। ফলে নগর আওয়ামী লীগের সব নেতাই একাট্টা হয়েছেন, আগামী নির্বাচনে যেন তাকে দলের মনোনয়ন দেওয়া না হয়।

আওয়ামী লীগের এমন অবস্থানের কারণে এমএ লতিফ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় লোকজনের ধারণা। এমএ লতিফ যে জনবিচ্ছিন্ন তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। নিজ নির্বাচনী এলাকায় গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে লতিফের মনোনীত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী চতুর্থ হন। সে সঙ্গে জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন মনোনয়ন পান। কিন্তু পরে সেটি পরিবর্তন করে ব্যবসায়ী এমএ লতিফকে দেওয়া হয়। জানা যায়, এমএ লতিফ সে সময় ঢাকা গিয়েছিলেন বিএনপি থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করতে। কিন্তু ওই আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আমীর খসরু এ আসনে টানা চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য। তাই বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে হতাশ লতিফ আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেন এবং সফলও হন। আওয়ামী লীগ নিজেদের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের নেতা খোরশেদ আলম সুজনকে বাদ দিয়ে লতিফকেই শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রার্থী করে। নির্বাচনে এমএ লতিফ আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পরাজিত করে আলোচিত হন।

২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন তিনি। তবে এবার এক অখ্যাত স্বতন্ত্র প্রার্থীকে পরাজিত করেন তিনি। লতিফ মোট ভোটারদের মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পান।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন আমাদের সময়কে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি দলের মনোনয়ন পাই। পরে ব্যবসায়ীদের কল্যাণ হবে, এমন ভেবে লতিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুই করেননি। নিজের আখের গুছিয়েছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনের একটি হচ্ছে বন্দর-পতেঙ্গা আসন। অথচ এ এলাকার উন্নয়ন কাজে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। এলাকায় দলের জন্য নয়, জামায়াতের পক্ষে কাজ করেন তিনি। খোরশেদ আলম বলেন, লতিফ আওয়ামী লীগে একজন আগন্তুক, চট্টগ্রামের ভাষায় গরবা। দলে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

একই অভিযোগ করেছেন গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, এমএ লতিফ আওয়ামী লীগ নয়, জামায়াতের লোক।

এমএ লতিফ বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করায় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ক্ষিপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে লালদীঘি মাঠে সমাবেশ করে লতিফকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কেউ লতিফকে খুন করলে হুকুমদাতা হিসেবে সেই হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি আমি হব। এর পর লতিফ অনেক দিন চট্টগ্রামে আসেননি।

নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও তার ওপর ক্ষুব্ধ। মেয়র বলেন, দলীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বর্তমান সরকারের সময়ে তার নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নকাজ সম্পর্কে জানাতে বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি এমএ লতিফকে চিঠি দিই। কিন্তু তিনি সেই চিঠির উত্তর দেননি। এ নিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এসব আমি দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েছি।

সর্বশেষ গত ৫ মে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত নগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায়ও অনুপস্থিত ছিলেন এমএ লতিফ। ওই সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতারা লতিফের সমালোচনায় সরব হন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এমএ লতিফ আমাদের সময়কে বলেন, কে বা কারা আমার সমালোচনা করল তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। আমি তাদের সমালোচনা করব না। নিজের অতীত কর্মকা-ের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাজের হয়তো ভুলত্রুটি হয়েছে। তবে এসব মূল্যায়ন করার দায়িত্ব ভোটারদের। আর শেখ হাসিনা যদি মনোনয়ন দেন তা হলে আর কারো সমালোচনার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকা এটি। এখানে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও দ্বিতীয় বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। এ ছাড়া একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি, রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার প্রধান ডিপো ও সরবরাহ লাইন এখানে। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত কাস্টমস হাউসও এখানেই। এ ছাড়াও রয়েছে নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা স্থাপনা ও সাবমেরিন স্টেশন। ২০১৪ সালে ছাত্রশিবির সরকারি তেলের ডিপোগুলোয় একযোগে এবং পরে জেএমবি কর্মীরা নৌবাহিনীর ঘাঁটির ভেতরে বড় ধরনের হামলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, এ আসনে কোনোভাবেই যেন দলীয় নেতার বাইরে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া না হয়।

আগামী নির্বাচনে এ আসনে আবারও মনোনয়ন চান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নাম আলোচনায় আসছে। নওফেল চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, সাবেক তিনবারের মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র। মহিউদ্দিন চৌধুরী সারাজীবনই বন্দরের শ্রমিকদের স্বার্থে আন্দোলন করেছেন। তাই শ্রমিকদেরও দাবি, তার উত্তরসূরিকে যেন এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক মন্ত্রী এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি। ফলে চট্টগ্রামে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রভাব প্রতিপত্তি খুব বেশি।

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে আমীর খসরু বলেন, আরও তো সময় আছে। কোন আসন থেকে নির্বাচন করব তা দলের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে