নতুন চ্যালেঞ্জে ইসি

  হাসান আল জাভেদ

১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ মে ২০১৮, ০৮:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি শাসনামলে দুবার আর আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুবার করে চার সংসদের এমপি নির্বাচিত হন তালুকদার আবদুল খালেক। আওয়ামী লীগের টিকিটে ২০০৮ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবেও জয়ী হন। সে হিসেবে তালুকদার খালেক খুলনায় বেশ জনপ্রিয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভোটকেন্দ্রে ভোটার-পর্যবেক্ষককে বাধা, বিএনপিদলীয় এজেন্ট বের করে দেওয়া, কয়েকটি কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে সহিংসতার ঘটনায় কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচন।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক-বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন কড়া নাড়ছে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এতগুলো বিষয় সামনে রেখে মানুষের আস্থা অর্জনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) খুলনায় কী করেছে, কী করার দরকার ছিল এবং সামনে করণীয় বিষয়ই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে খুলনার নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতা না হলেও অনিয়মের অভিযোগ

এসেছে। বরাবরই এ নিয়ে শুধু বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে বিএনপি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি মাঠে ছিল। এর মাধ্যমে অবশ্য নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। বিএনপির বড় জনসমর্থন থাকলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের পর সার্বিক অবস্থা সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি। অনিয়মের অভিযোগ আনলেও আইনি লড়াইয়ের পথে যায়নি। মূলত সরকারি দলের কৌশলের কাছে মার খেয়েছে বা পাল্টাব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ নির্বাচনগুলো বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ। দলটি খুলনায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মাঠে জয় পেলেও মানুষের কতটা আস্থা অর্জন করতে পেরেছে তা সময়ই বলবে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তালুকদার খালেক বেশ কয়েকবারের এমপি। মেয়র হয়েছেন। তাই তিনি জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু কাগজে দেখেছি কোনো কোনো কেন্দ্রে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়েছে। ৪০টির মতো ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এতেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভোটার উপস্থিতি কম ছিল আবার ১২টার মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ। সহিংসতাও হয়নি। এটা এক ধরনের নতুন অনিয়ম। সরকারি দলের এটা করার প্রয়োজন ছিল না। এখানে ইসির ভূমিকা খুব একটি ভালো ছিল না। সবকিছু পর্যালোচনা না করেই ইসি বলে দিয়েছে আশাতীত ভালো হয়েছে। ইসির হাতে সবকিছুর ক্ষমতা রয়েছে। তাদের দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকা দরকার। এসব বিষয়ে ইসির একটা তদন্ত হওয়া দরকার। নয়তো আগামীর নির্বাচনে কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না। এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইসির শিক্ষা গ্রহণ দরকার। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে ইসির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি বিএনপির জন্যও চ্যালেঞ্জ। অনিয়ম হলে শুধু বয়কট নয়, তারা ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, এই নির্বাচনে ব্যক্তি হিসেবে কার জয় হলো আর কার পরাজয় হলো সেটা বিষয় নয়। তবে বলতে হবে এখানে গণতন্ত্রের পরাজয় হয়েছে। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকেই বিভিন্নভাবে চেষ্টা হয়েছে যাতে বিএনপি অংশ না নেয়। তাদের ওপর হামলা, পুলিশি ভয় দেখানো হয়েছে। এই সরকারের ক্ষমতাকালে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে তাতে নিরপেক্ষতা থাকবে না।

এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচন চলকালে কমিশনের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকার কথা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা রাজনৈতিক দলের কর্মীদের কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। প্রতিটি কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশনের একটা করে ক্যাম্প বসানো হয়েছিল। এসব ক্যাম্পে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা বসে থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলে। দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র ভোট দিয়েছে। তা হলে নির্বাচন কমিশন করেছেটা কী প্রশ্ন তার। তিনি বলেন, আগামীতে নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে হলে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে সামরিক বাহিনীকে নামাতে হবে। কারণ তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস আছে। নিরপেক্ষতা দেখানোর জন্য এটা ইসির জন্য চ্যালেঞ্জ।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, খুলনায় দু-একটি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। এতে পুরো নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার মতো ছিল না। ইসি দিন দিন সুষ্ঠুভাবেই নির্বাচন দিচ্ছে। তাদের সমালোচনা করলেই হবে না। তবে খুলনায় যেসব ত্রুটি ছিল আগামী নির্বাচনগুলোয় তা কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ নিলেই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক আব্দুল আলীম বলেন, একটি নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করার জন্য যা যা দরকার তার সবই করার ক্ষমতা রয়েছে ইসি। নির্বাচনকালে ইসি নিজেই ওই সময় এলাকার সরকার। তাদের সে ধরনের সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু খুলনায় দেখা গেছে শেষের দিকে কাউকে কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কিছু প্রিসাইডিং অফিসারের বাসায় পুলিশ গিয়েছে। একজন প্রিসাইডিং অফিসারকে নিয়োগ দেওয়ার পর পুলিশ তার বাসায় যেতে পারে না। এটাও এক ধরনের অনিয়মের সহযোগী। তিনি বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানকার নির্বাচন কমিশন শতভাগ স্বাধীন হয়ে কাজ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসিকে সরকারের সহায়তা করতে হবে। খুলনায় তেমনটি হয়নি। অপরদিকে ইসির ১৯৯১ সালের আইনে তাদের কাছে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। আগামী সব নির্বাচনের আগে এসব বিষয় কাটিয়ে উঠতে ইসিকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগ বা পেশিশক্তির ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ কারো জন্যই সুখকর নয় বলে মনে করেন তিনি।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তার মতে, দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাটাই ত্রুটিপূর্ণ। যে ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১ লাখের বেশি ভোট পেল তিনি ফেল করবেন কেন। সিটি করপোরেশনে তারও অংশীদারিত্ব থাকার কথা। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ নির্বাচনগুলো একই দিনে আয়োজন এবং এতে সরাসরি মেয়র/চেয়ারম্যান পদে জনগণের ভোটাধিকার তুলে কাউন্সিলর নির্বাচন করা দরকার। পরে কাউন্সিলররাই চেয়ারম্যান/মেয়র নির্বাচিত করবে। এতে ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং দীর্ঘ সময় নষ্ট করে ডামাঢোল পেটানো লাগবে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেরালা, কলকাতা, ত্রিপুরায় এই আদলে স্থানীয় সরকার অনেক শক্তিশালী বলেন তিনি।

ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩২ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে। অবৈধভাবে ব্যালট পেপারে সিল মারা, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে এবং বাইরে সংগঠিত সামান্য সহিংসতা, ভোটকেন্দ্রে পেশিশক্তির উপস্থিতি, ভোটারকে ভোট প্রদানে বাধা দেওয়া, বিএনপির প্রার্থীদের প্রচার ক্যাম্পে ভাঙচুর হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে