খালেদার চিকিৎসা নিয়ে কী হচ্ছে

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৮, ১৩:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

কিছুদিন ধরে বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি জোর আলোচনায় রয়েছে। তাকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে যুক্তি-পাল্টাযুক্তি। অবশ্য তার চিকিৎসা কোথায় হবে তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

গত ৮ জুন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছে ধারণা দিয়ে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেন। খলেদা জিয়ার ব্যক্তিগত পচ্ছন্দও ইউনাইটেড হাসপাতাল। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল এবং পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তির প্রস্তাব দিলেও খালেদা জিয়ার পরিবার ও তার দল বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালেই চিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছে।

গতকাল সন্ধ্যায় জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি তিনি সিএমএইচেও যেতে চান না। এখন আর নতুন কোনো তথ্য নেই।’ এদিকে পরিবারের সদস্য যারা ঈদের দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন তাদের বরাত দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রবিবার বলেন, ‘ওনার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে। উনি কারো সাহায্য ছাড়া হাঁটতে

পারছেন না। যে চোখের অপারেশন হয়েছে সেই চোখ লাল হচ্ছে এবং আরও ব্যথা বেড়েছে। ঘাড়ের ব্যথা বাম দিকে এতই বেড়েছে যে, হাতের আঙুলগুলো সবসময় ব্যথা করছে। এ কারণে হাত দিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম করতে পারছেন না। কোমরের ব্যথা বাম পায়ের তলা পর্যন্ত এখন ছড়িয়ে পড়েছে। এটা খুবই মারাত্মক। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দেওয়া রিপোর্ট নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ এতটুকু কাজ করেনি। এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। শুধু জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য সরকার বলছে পিজিতে পাঠাব অথবা সিএমএইচে পাঠাব।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিএনপি রাজনীতি করছে বলে মন্তব্য করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপি নেতারা তাদের নেত্রীর চিকিৎসাসেবা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। তার চিকিৎসার জন্য সতর্ক ও সজাগ আছি। অন্যদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আওয়ামী সরকার দেশনেত্রীর চিকিৎসা নিয়ে পানি ঘোলা করছে। এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে-ধুঁকে নিঃশেষ করে দেওয়া। দেশনেত্রীকে চিকিৎসা না দেওয়ার জন্যই ওবায়দুল কাদের সাহেবরা নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘আমাদের রাজনীতি এখন অযৌক্তিক রেষারেষি ও শত্রু ঘায়েল করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অতএব এই রাজনীতিতে যা হচ্ছে তার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা বাতুলতা। এ কারণেই চিকিৎসা নিয়ে এ টানাহেঁচড়া এবং স্বভাবতই এর কোনো যৌক্তিক সমাধান প্রায় অসম্ভব।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের দ-প্রাপ্ত হওয়ার পর থেকেই পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে আছেন ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়া। কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই দলীয় চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিএনপি। একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে গত এপ্রিলের শুরুতে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে নিয়ে এক্স-রে করানো হয়েছিল। এরপর গত ৫ জুন তিনি হঠাৎ করে কারাগারে ‘মাথা ঘুরে’ পড়ে গেলে তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে দলটি। এরপর ৮ জুন ব্যক্তিগত চার চিকিৎসক তার সঙ্গে দেখা করে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার দাবির বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, ‘কারাবিধি অনুযায়ী বন্দিদের বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকার অনুমতি দিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন।’ এর পর খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত খরচে ইউনাইটেডে ভর্তির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদনও জানায়।

রবিবার নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার যৌক্তিকতা তুলে মির্জা ফখরুল বলেন, আস্থা আছে বলেই ইউনাইটেড হাসপাতালের কথা বলছি। আমরা কি সব ডাক্তারের কাছে যাই? না, যে ডাক্তারের কাছে আমাদের আস্থা থাকে তার কাছে যাই। ১/১১ সময়ে শেখ হাসিনা স্কয়ার হাসপাতালে, আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল জলিল (প্রয়াত) ও মোহাম্মদ নাসিম ল্যাবএইডে চিকিৎসা পেয়েছেন। তিনি বলেন, জেল কোডের কোথাও বলা নেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবে না। বলেই দেওয়া হয়েছেÑ আমরা চিকিৎসার খরচ বহন করব। সেই কারণে ওই হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। তাহলে দেশনেত্রীকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেবেন না কেন? কী কারণ? তা হচ্ছে সরকার তার ক্ষতি করতে চায়, তার জীবন বিপন্ন করতে চায় এবং সেই কারণে তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। দেশনেত্রীকে ও বিএনপিকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার এসব করছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, একটা পরিত্যক্ত, জরাজীর্ণ দেড়শ-দুইশ বছরের পুরনো কারাগারে দেশনেত্রীকে রাখা হয়েছে। কোনো সভ্য সমাজে এটা হয় না। উনি ছাড়া কোনো বন্দি সেখানে নেই। এখানে এত বড় বড় ইঁদুর দৌড়ায়, এতগুলো বেড়াল ওখানে, যারা ইঁদুর ধরে। আপনারা শুনলে হতবাক হবেন, ম্যাডামের ঘরের মধ্যে ওই বেড়াল বড় ইঁদুর ধরেছে। তার পর ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মানসিক দিক দিয়ে। উনি তো এসব দেখতে অভ্যস্ত নন। তেলাপোকা, ছারপোকাÑ এটা কমন ব্যাপার। আরও আছে বড় বড় বিছা।

সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সোমবার খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার চেয়ে বিএনপি আন্দোলনের ইস্যু খোঁজার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিএনপি বেগম জিয়াকে কেন্দ্র করে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে রাজনীতি করছে এবং তার (খালেদা জিয়া) যেখানে সিএমএইচে সরকার তার সুচিকিৎসার কথা বলেছে সেটাকে তারা ডিনাই (অস্বীকার) করার অর্থ হচ্ছে তারা তার চিকিৎসার ব্যাপারে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি ঈদের পরে সর্বাত্মক আন্দোলন করবে তার ইস্যু খোঁজায়। এ কারণেই তাদের বেশি মাথাব্যথা এবং তারা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সামরিক পরিবারের একজন হিসেবে সিএমএইচে চিকিৎসা নিতে খালেদা জিয়া কেন শঙ্কায় আছেন, তা বোধগম্য নয় বলেও জানান ওবায়দুল কাদের।

বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, সিএমএইচ মূলত আর্মি পারসনদের জায়গা। সেখানে কেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসা নিতে যেতে হবে? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী অসুস্থ হলে কেন সিএমএইচে যান না? আসলে সরকার তার চিকিৎসা দিতে চাচ্ছে না। তা না হলে এত সময়ক্ষেপণ কেন? সরকারি ডাক্তারদের নিয়ে গঠিত বোর্ডই বলেছে, তিনি অসুস্থ। এখন তার অবস্থার আরও অবনতি ঘটেছে। আর কত অবনতি হলে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হবে? তিনি বলেন, তার চিকিৎসা দেওয়া সরকারের দ্বৈত দায়িত্ব। এক সাধারণ নাগরিক হিসেবে এবং অন্যটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম দলের চেয়ারপারসন হিসেবে; কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে সরকারের একেকজন একেক রকম ভাষায় কথা বলছেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে