সড়কে প্রাণ গেল ‘ইতিহাসের সাক্ষী’ হেলালের

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

১৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৮, ০৯:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন চট্টগ্রামের আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী পুলিশের পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া (৫০)। গত রবিবার দুপুরে ফেনীর রামপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা হেলালকে মৃত ঘোষণা করেন।

হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া ২০০৪ সালে ১ এপ্রিল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের সময় ছিলেন চট্টগ্রামের বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ। ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসের সময় তিনি এবং অপর সার্জেট আলাউদ্দিন বাধা দেন। খবর দেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) আবদুল্লাহেল বাকীকে। এতে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার অস্ত্র পাচারের পুরো প্রচেষ্টাই ভেস্তে যায়। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় অস্ত্র পাচারের ওই কার্যক্রমটি বিফলে যায় যে হেলালের কারণে, পরবর্তীতে তাকে এর কড়া মূল্যও দিতে হয়েছিল। র্যাব-৭ তৎকালীন সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন ও সার্জেন্ট আলাউদ্দিনকে একটি একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার করে দাবি করেছিল, ১০ ট্রাক থেকে একটি অস্ত্র তারা চুরি করে বিক্রি করেছিলেন। ২৭ মাস জেল খেটে পরে আদালতে প্রমাণ হয়, ওই একে-৪৭ এর সঙ্গে ১০ ট্রাক অস্ত্রের কোনো

মিল নেই। ওই সময় বার বার রিমান্ডে আনার পর র্যাবের হেফাজতে হেলালের পা ভেঙে যায়। পরবর্তীতে তিনি আর স্বাভাবিক সুস্থ হননি।

বাংলাদেশ পুলিশের ১৯৯৫ ব্যাচের সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া সর্বশেষ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বন্দর থানার পেট্রোল ইন্সেপেক্টর (পিআই) ছিলেন। দুই ছেলে এক মেয়ের জনক হেলালের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। তবে পরিবারের সদস্যরা থাকতেন কুমিল্লা শহরের ভাড়া বাসায়।

হাইওয়ে পুলিশ মহিপাল থানার এসআই আশিকুর রহমান জানান, রবিবার কুমিল্লার বাসা থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন হেলাল উদ্দিন। রামপুর এলাকায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হন।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (বন্দর) কামরুল হাসান জানান, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে হেলাল উদ্দিন কুমিল্লায় নিজ বাসায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কর্মস্থল চট্টগ্রাম ফেরার পথে ফেনীর রামপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা সিইউএফএল ঘাটে অস্ত্র খালাসের ঘটনা শুনে প্রথমে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ সার্জেন্ট আলাউদ্দিন। আর ওয়্যারলেস সেটে বার্তা পেয়ে নৌকা নিয়ে কর্ণফুলী নদী হয়ে সেখানে হাজির হন কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সার্জেন্ট হেলাল উদ্দিন। তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার করে।

অস্ত্র উদ্ধারের পর ট্রলারে থাকা একে-৪৭ রাইফেল চুরি করে বিক্রির অভিযোগে আলাউদ্দিন ও হেলাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। নোয়াখালীর সুধারাম থানার একটি অস্ত্র আইনে তারা আসামি হন। প্রায় ২৭ মাস কারাভোগ করে দুজনে জামিন পান। ২০১০ সালে সুধারাম থানা অস্ত্র মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেন। ২০১১ সালে চাকরিতে বহাল হন সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও হেলাল উদ্দিন। ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল (পিপিএম) পান আলাউদ্দিন ও হেলাল উদ্দিন। ২০১৫ সালে দুজনই পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ২২ ও ২৩ মে তাদের ডান্ডা বেরি পড়িয়ে সাক্ষ্য দিতে আনা হয় চট্টগ্রাম আদালতে।

হেলালের সহকর্মী ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার অন্যতম সাক্ষি মো. আলাউদ্দিন বর্তমানে ফেনী জেলা পুলিশের ওসি রেশন স্টোর হিসেবে দায়িত্বে আছেন। তিনি বলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের পরের বছর ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে নোয়াখালীর সুধারাম থানার একটি অস্ত্র মামলায় আমাদের গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তারের পর র্যাবের নির্যাতনে হেলালের একটি পা ভেঙে যায়। সেটি আর ভালো হয়নি।

পদোন্নতি পেয়ে হেলাল চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কোতোয়ালি ও সদরঘাট থানার পিআই হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সর্বশেষ ছিলেন বন্দর থানার পিআই হিসেবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে