চীনা অ্যাক্রোবেটিং দেখাচ্ছে বাংলাদেশিরা

  ছাই ইউয়ে মুক্তা

১১ জুলাই ২০১৮, ১৭:৩৯ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ১৩:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের মানুষের একসময় ধারণা ছিল যে, উচ্চমানের অ্যাক্রোবেট কেবল চীন ও রাশিয়ায় দেখা যায়। এখন চীন সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশেও গড়ে উঠেছে অ্যাক্রোবেটিং গ্রুপ। বিগত দুই বছরে বাংলাদেশি অ্যাক্রোবেটিং গ্রুপ এ দেশের ৬৪টি জেলায় ৩৫০-এর বেশি বার পারফর্ম করেছে। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী অ্যাক্রোবেট শিল্পীদের অনেক প্রশংসা করেছেন; দর্শকরাও তাদের পারফরমেন্স অনেক পছন্দ করেন।

বাংলাদেশে অ্যাক্রোবেটিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশের জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক লিয়াকত আলী লাকি বলেন, '২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রথম অ্যাক্রোবেটিং প্রশিক্ষণ-কোর্স চালু করে। এরপর অ্যাক্রোবেটিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ-কোর্স শেষ হয়ে সবাই নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়াতে আমাদের এ সংক্রান্ত প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।'

২০১১ সালে লিয়াকত আলী লাকি ২৫ জন আগেকার শিক্ষার্থীদের ডেকে আবার অ্যাক্রোবেটিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু গ্রুপের সদস্যদের বয়স বেড়েছে এবং তারা পর্যাপ্ত সময় ধরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেনি। সেজন্য তারা মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাক্রোবেটিংয়ের কলা-কৌশল প্রদর্শন করতে পারতেন না।

তখন তিনি বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের সাহায্য নেওয়ার কথা চিন্তা করেন। চীনা দূতাবাসের সঙ্গে বরাবরই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল। লিয়াকত আলী লাকি চীনা দূতাবাসের সংস্কৃতি বিভাগকে বাংলাদেশিদের অ্যাক্রোবেট প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান। চীনা দূতাবাস ইতিবাচক সাড়া দেয়।

২০১৫ সালের মে মাসে তৎকালীন চীনা উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ ইয়ান তুং বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে চীন সরকার বাংলাদেশের ২০ জন অ্যাক্রোবেট শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে প্রথম দফায় ১০ জন শিক্ষার্থী বেইজিং আন্তর্জাতিক শিল্পকলা বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। তারা পেশাদার শিক্ষকদের কাছে অ্যাক্রোবেটিং সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করে। 

২০১৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম দলটি প্রশিক্ষণের পর বাংলাদেশে ফিরে আসে। বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসে চীনা জাতীয় দিবসের উদযাপনী অনুষ্ঠানে এসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী  চীনা শিল্পীদের সঙ্গে মিলে চমৎকার পারফর্ম করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাদের পারফর্মমেন্সের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এরপর তারা বাংলাদেশ জাতীয় থিয়েটার, জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পারফর্ম করে। 

এ সম্পর্কে লিয়াকত আলী লাকি বলেন, 'আমাদের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দুইবার তাদের পরিবেশনা দেখেছেন। প্রেসিডেন্ট তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পরিবেশনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। এরপর অ্যাক্রোবেটিং গ্রুপ সারা বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ তাদের পরিবেশনা পছন্দ করেন।'

তিনি আরও বলেন, 'চীনা দূতাবাস ও বেইজিং আন্তর্জাতিক শিল্পকলা বিদ্যালয়ের সহায়তা না-পেলে বাংলাদেশে এত চমৎকার দেশীয় শিল্পীদের অ্যাক্রোবেটিং পরিবেশনা দেখা যেত না।'

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় দফায় ১০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেইজিং আন্তর্জাতিক শিল্পকলা বিদ্যালয়ে আসেন। তাদের সবার বয়স ১১ থেকে ১৬ বছর। শুরুতে চীনে তাদের খাদ্যগ্রহণের সময়সূচি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত রাত ৮ থেকে ৯টার মধ্যে ডিনার খান। অনেকে আরও দেরিতে ডিনার সারেন। অথচ চীনারা সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে ডিনার করে। তো ছোট শিক্ষার্থীদেরকেও চীনে গিয়ে সন্ধ্যায় ডিনার করতে হতো এবং যথারীতি রাতে তাদের ক্ষুধা লাগত। অবশ্য, তারা খুব দ্রুতই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। তা ছাড়া চীনা শিক্ষকদের যত্নআত্তিতে কয়েক মাসের মধ্যে তারা কঠিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে; শেখে অ্যাক্রোবেটিংয়ের বিভিন্ন কলা-কৌশল।

এ সম্পর্কে বেইজিং আন্তর্জাতিক শিল্পকলা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছেন চেন বলেন, 'যখন তারা প্রথম আসে, তখন তারা তো চীনা ভাষা কিছুই বুঝতো না। আমরা আস্তে আস্তে তাদেরকে চীনা ভাষা ও অ্যাক্রোবেটিং কৌশল শিখিয়েছি। এসব শিক্ষার্থী ছিল খুবই বুদ্ধিমান। তারা দ্রুত সবকিছু শিখেছে, যা আমাদের জন্য ছিল আনন্দদায়ক ব্যাপার।'

দড়াবাজি একটি কঠিন বিষয়। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় গ্রুপের প্রধান ও বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমির অ্যাক্রোবেটিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক মুহাম্মাদ জালাল উদ্দিন  বলেন, 'চীন সরকার ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এখানে অ্যাক্রোবেটিং শিখেছি। আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ছিল খুবই কঠিন। কিন্তু এটি অ্যাক্রোবেটিং। পরিশ্রম না করে অ্যাক্রোবেটিং শেখা যায় না।'

বেইজিং আন্তর্জাতিক শিল্পকলা বিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক লিয়াকত আলী লাকি গত এপ্রিলে বেইজিংয়ে আসেন এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি দেখলেন, মাত্র চার মাসে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখেছে, তাদের পারফরমেন্স অনেক উন্নত হয়েছে। আসলে দ্বিতীয় দফার শিক্ষার্থীরা প্রথম দফার শিক্ষার্থীদের চেয়ে আরও দ্রুত ও ভালভাবে শিখতে পেরেছে। 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে