আপত্তি উপেক্ষা করেই ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:০২ | আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

বিভিন্ন পক্ষের মতামত উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল- ২০১৮’  পাস করা হয়েছে। আজ বুধবার সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। এরপরই বিলটির ওপর জনমত যাচাই,বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও সংশোধনীর প্রস্তাব দেন জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র এমপিরা। কন্ঠভোটে তাদের প্রস্তাব নাকচ হয়।

বিলের ৩২ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের আওতাভূক্ত অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওযার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করতে সহায়তা করেন তাহলে তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৩২ (২) ধরায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি উপধারা-১ এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন,তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলে ১৩টি দফার ওপর সংশোধনীর প্রস্তাব দেন জাতীয় পার্টির তিন সাংসদ। তাদের প্রস্তাবে শব্দাবলী বর্জন, প্যারা, সংখ্যা ও বন্ধনী প্রতিস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। কণ্ঠভোটে তাদের প্রস্তাব নাকচ হয়। বিলে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্রর ১২ এমপি। তারা ৩০ অক্টোবরের মধ্যে জনমত যাচাইয়ের জন্য বিলটি প্রচারের দাবি জানান। স্পিকার বিষয়টি কন্ঠভোটে দিলে তা নাকচ হয়। এরপর বিলটি বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্রর ৮ এমপি।
বিলটি পাসের আগে আপত্তি তুলে জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বিলে স্টেকহোল্ডারদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। বাক স্বাধীনতার জন্য এটা উদ্বেগজনক। এটা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিল। গণমাধ্যমের উদ্বেগ ও মতামত উপেক্ষা করাই স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধার সৃষ্টি করবে। দেশে সুশাসনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল এই বিলের কারণে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।’

জাতীয় পার্টির অপর সাংসদ নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, ‘বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। বিলে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।’
নূরে হাসনা লিলি চৌধুরী বলেন, ‘বিলটি অনেক গুরুত্বপুর্ণ হওয়ায় যাচাই বাছাই হওয়া প্রয়োজন। কন্ঠভোটে তাদের সে প্রস্তাবও নাকচ হয়।’

বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাই-বাছাই প্রসঙ্গে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এই বিলটি পাসের জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ রক্ষার জন্য ডিজিটাল আইন আমরা সবার আগে তৈরি করছি। পৃথিবীর বহু দেশকে এই আইনটি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এটা ঐতিহাসিক আইন। ভবিষতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। তাই কোনভাবে আমরা রাষ্ট্রকে বিপন্ন হতে দিতে পারি না।’

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য এই আইন নয়। মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা যেনো না থাকে তাই এই আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিলটি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কি পরিমাণ আলোচনা করেছি, তাদের কথা শুনেছি তা এই বিলের রিপোর্ট দেখলেই বোঝা যাবে। আমরা তাদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। তারা যেসব জায়গায় যে ধরণের সংশোধনী দেয়া দরকার বলে মনে করেছেন সেই অনুসারে সবকিছু আমরা করেছি। সাংবাদিকরা আইনমন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির কাছে যেসব কথা বলেছেন তা হয়তো তারা ভুলে গেছেন। যদি তারা ভুলে না গিয়ে থাকেন তাহলে তাদের সমালোচনার অবস্থা থাকে না। আইনটিকে বিতর্কিত করার কোন সুযোগ নেই। ২০১৫ সাল  থেকে বিলটি সর্বস্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। ফখরুল ইমামের ৪৩ ধারার সংশোধনী প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘মহাপরিচালকের অনুমোদন নেয়ার বিষয়টি বাদ দেয়া যেতে পারে।’

বহুল আলোচিত বিলটির কয়েকটি ধারা বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোরসহ অংশীজনেরা।

তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) এর ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা সম্পর্কে তাদের আপত্তি রয়েছে। বিলের ওই ছয়টি ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত শব্দগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া তাদের প্রস্তাব আমলে নেওয়া হয়নি।

বিলের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্তক, মিথ্যা ও ভীতি প্রদর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি বিষয়ে (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলে জেনেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন,বা খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করা, বা বিভ্রান্তি ছড়ানো, বা অনুরুপ উদ্দেশে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জেনেও, কোনো তথ্য সম্পুর্ণ আ আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন,তাহলে ওই ব্যক্তির অনুরুপ কাজ হবে একটি অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন অপরাধের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের ২১ ধারায় নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রপাগন্ডা ও প্রচার চালানো বা তাতে মদদ দেন,তাহলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরুপ কাজ একটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধের শাস্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রুপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মিাণের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও নিরাপদ ব্যববহার আবশ্যক বর্তমান বিশ্বে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যপক ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফল ভোগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও উল্ল্যেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে সাইবার অপরাদের মাত্রাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এতে বলা হয়েছে, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল অপরাধসমূহের প্রতিকার, প্রতিরোধ,দমন, সনাক্তকরণ,তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাইবার তথা ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র এবং জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

গত ২৯ শে জানুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রীসভা। তখন থেকেই আইনটি নিয়ে আপত্তি ওঠে। ১০টি পশ্চিমা দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা আইনের ২১,২৮,৩২ ও ২৫ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।

উল্লেখ্য, বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও গত ৯ এপ্রিল বহুল আলোচিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে