দাফনের ৬ দিন পর নারীর লাশ সনাক্ত, জানা গেল…

  ওসমানীনগর প্রতিনিধি

১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:১৯ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতীকী ছবি
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হওয়া সুমি আক্তার তিশা এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার এবং বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের ছয় দিন পর তার পরিচয় সনাক্ত হয়।

তিশার পরিবার সূত্রে জানা যায়, তার বাবার নাম আব্দুল মান্নান। বাড়ি লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার নয়নপুর গ্রামে। তিশা এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। নারায়নগঞ্জ শহরে ভূইঘর এলাকায় বড় বোনের বাসায় থেকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকেও চাকরি করতেন। সেখানেই পুলিশ কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ জয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তিশার।

পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্কে প্রায় সাত থেকে আট বছর পূর্বে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু স্বামী জয়ের প্রথম স্ত্রীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও তিশার কাছে তিনি সে কথা গোপন রাখেন। জয়ের বাড়ি নরসিংদী জেলায়।

তিশার বড় বোনের মেয়ে বৃষ্টি আক্তার মারজান বলেন, ‘৩ নভেম্বর নানাকে দেখার জন্য তিশা খালা নারায়নগঞ্জ থেকে গ্রামের বাড়িতে যান। ৪ নভেম্বর ভোরে তিনি সেখান থেকে বের হন। ওইদিন রাত থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ দেখায়। বিভিন্ন স্থানে আমরা তার সন্ধান করে খুঁজে পাইনি। কয়েক দিন পর এক পুলিশ আমাদের ফোন করে জানান তাকে খুন করা হয়েছে।’

তিশার বড় বোন নাজমা বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর পুলিশ কর্মকর্তা জয় তিশাকে নিয়ে নারায়নগঞ্জ শহরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। বেশ কয়েকটি বাসাও পরিবর্তন করেন তারা। জয় এবং তিশা ঢাকা শহরে একখণ্ড জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয় করার জন্য তিশা গ্রামের বাড়ি থেকে গরু বিক্রি করে ও কিস্তিতে ঋণ নিয়ে টাকা দেন স্বামী জয়কে।’

এ ছাড়া তিশা জয়ের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টেও টাকা জমা রাখতেন। জয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকাবস্থায় অর্থ কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়েন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অফিসে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জয়ের সঙ্গে তিশাকে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি পুলিশ। ডিবি পুলিশের কাছে জয় টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করলেও তিশা তার স্ত্রী নয় বলে অস্বীকার করেন বলে জানান তিশার বোন নাজমা বেগম।

নাজমা বেগম আরও বলেন, ‘এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হলে তিশার কাবিনের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন জয়। এরপর কিছুদিন পরে জয় তাদের দু’জনের নামে ক্রয়করা জমি বিক্রি করে দেন। জমি বিক্রির টাকা এবং জয়ের অ্যাকাউন্টে জমা রাখা তিশার টাকাসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকা নিয়ে ২০১৭ সালে জয় লাপাত্তা হন। এরপর থেকে তার খোঁজ মেলেনি। এতে তিশা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। স্বামীর কারণেই আজ তার এমন পরিণতি হয়েছে।’

যেভাবে হত্যা করা হয়: ওসমানীনগরের তাজপুর বাজার এলাকায় দির্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিলেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বাসিন্দা রিকশা গ্যারেজ ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া। তিনি তিশাকে ফোনের মাধ্যমে ৪ নভেম্বর ওসমানীনগরে নিয়ে আসেন।

রাত ৮টার দিকে সেলিম তাকে উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের খালপাড় গ্রামের দেহ ব্যবসায়ী আব্দুল বারিকের বাড়িতে নিয়ে যায়। রাতে সেলিম তিশাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত করার প্রস্তাব দেয়। তিশা তাতে রাজি হয়নি। এতে সেলিম ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রাতে বাড়ির মালিক বারিকের সহযোগিতায় স্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। পরে অন্যান্যদের সহযোগিতায় রাতেই মাটি চাপা দিয়ে লাশ ঘুম কারার চেষ্টা করেন তারা।

পরদিন দুপুরে দয়ামীর বাজারের কনাইশা (র.) মাজারের পশ্চিমে একটি খালি জায়গা থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় এক অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

লাশ উদ্ধার ও হত্যাকারীরা আটক : ৫ নভেম্বর সকালের দিকে সেলিম ও বারিক ওসমানীনগর থানায় ফোন করে জানায় দয়ামীর এলাকায় এক নারীকে হত্যা করে মাটি দিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ তাদেরকে কৌশলে থানায় এনে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিয়ে মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সেলিম ও বারিকসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এই ঘটনায় আবদুল বারিককে প্রধান আসামি করে ৬ নভেম্বর ওসমানীনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই )সাইফুল মোল্লা বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৩।

পরিচয় সনাক্ত : এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ডের দ্বায় স্বীকার করে এই খুনের বর্ণনা দেয়। কিন্তু তারা খুনের শিকার হওয়া তিশার কোনো পরিচয় দিতে পারেনি।

উদ্ধারের পরদিন লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। লাশ উদ্ধারের পর তিশার প্যান্টের পকেটে থাকা মেমোরি কার্ডে মোবাইল নাম্বার পাওয়া যায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসমানীনগর থানার এসআই মুমিনুল ইসলাম ৯ নভেম্বর রাতে ওই নাম্বারে কল দিলে তিশার বড় বোন নাজমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিশার ছবি পাঠালে বোন নাজমা বেগম তিশার পরিচয় সনাক্ত করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসমানীনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তিশার স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বলে তার পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে আমাদের কোনো তথ্য দেননি। বিষয়টি কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই। এ সংক্রান্ত প্রমাণাদি যদি তারা আমাদের হাতে দিতে পারে, তাহলে বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব।’

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে