প্রতারণা করাই যার পেশা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৯ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতারক খন্দকার ফারুক ওরফে ওমর মবিন।

খন্দকার মো. ফারুক ওরফে ওমর মবিন (৫২)। গায়ে দামি স্যুট-কোট পরে চলেন নতুন মডেলের গাড়িতে। কথা-বর্তায় অমায়িক; চালচলনেও তার আভিজাত্যের ছাপ। বেশির ভাগ কথাই বলে ইংরেজিতে। অভিজাত পাড়ায় গড়ে তোলা আলিশান অফিসে মোবাইল রিসিভ করার জন্য রয়েছে পরিপাটি একাধিক পিএস।

শুধু তাই নয়, তার খাবার আসে পাঁচ তারকা হোটেল থেকে। দামি স্যুট-কোট পরে প্রাডো গাড়িতে চড়ে নামি-দামি অভিজাত হোটেলে বসে ভোজন এবং ক্লায়েন্টদের সঙ্গে করেন আলোচনা। ধোপ-দুরন্ত চলন-বলন দেখে এতদিন বোঝার উপায় নেই তার আসল পরিচয়।

ওমর মবিন পাঁচ বছর আগেও ছিলেন জামালপুরের এক এমপির পিএস। সেই চাকরি ছেড়ে এখন তিনি প্রতারণাকেই বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। নিজেকে কখনো কাস্টমস কমিশনার, আবার কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে কাস্টমস হাউজের জব্দকৃত স্বর্ণের বার নিলামের মাধম্যে কম টাকায় কিনে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। অবশেষে শেষ রক্ষা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মবিন ও তার দুই প্রতারক পিএস ধরা পড়েছেন ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) জালে।

গত বুধবার রাতে রাজধানীর রমনা থানার বেইলি রোডের নবাবী ভোজ রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে মোবিনসহ এই প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সিরিয়াস অ্যান্ড হোমিসাইডাল স্কোয়াড। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন- মোহাম্মদ ইলিয়াস ওরফে নূর ইসলাম সরকার (৩৮) ও মো. সাইফুল ইসলাম (৩০)। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় ওমর মবিনের নামে ছাপানো ভুয়া পরিচয়দানকারী কাস্টমস সহকারী কমিশনারের ১৮টি ভিজিটিং কার্ড, চারটি ব্যাংকের চেকের পাতা, সাতটি মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অপারেটরের ১৩টি সিম কার্ড।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তদন্তকারী সংস্থাটির সিরিয়াস অ্যান্ড হোমিসাইডাল স্কোয়াডের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) সৈয়দা জান্নাত আরা। তিনি বলেন, ‘প্রতারকদের মধ্যে ওমর মবিন নিজেকে কাস্টমস কমিশনার বলে পরিচয় দিতেন। আর তার দুই সহযোগী ইলিয়াস ও সাইফুল কমিশনারের পিএস হিসেবে পরিচয় দিতেন। প্রতারক ওমর মবিন ভুক্তভোগীদের বলতেন আমরা কাস্টমসের লোক। সোনার বার জব্দ করেছি। আমরা সব পারি। আমাদের অনেক ক্ষমতা। কোনো সমস্যা নেই। এরপর ভুক্তভোগীদেরকে নিজের ভিজিটিং কার্ড দিতেন, ওই কার্ডে কাস্টমস কমিশনার হিসেবে মুবিনের পরিচয় লেখা থাকত। এছাড়া তার পাসপোর্টে খন্দকার মো. ফারুক নামও লেখা আছে। তারা বিভিন্ন মানুষকে টার্গেট করে প্রথমে পিএসদের পাঠাতো এবং কাস্টমস হাউজের জব্দ করা সোনার বার নিলামে দেওয়ার কথা বলে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সংঘবদ্ধ এই চক্রের সবারই কাস্টমস হাউজ সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফের বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

সিআইডির এই বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর ওমর মবিনের মোবাইলে মৃণাল নামে এক ভুক্তভোগীর ফোন আসে। তিনিও সিআইডি কার্যালয়ে এসে প্রতারকদের শনাক্ত করেছেন। ভুক্তভোগী মৃণালের কাছ থেকেও প্রতারক ওমর মবিন কাস্টমস হাউজের সোনা কম দামে নিলামের মাধ্যমে দেওয়ার কথা বলে ২৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’

ভুক্তভোগী মৃণাল বলেন, ‘প্রতারক ওমর মবিনের দুই পিএস আমার কাছে আসে এবং কাস্টমস হাউজের জব্দকৃত সোনার বার নিলামের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে দেওয়ার কথা বলে। এরপর গত ৬ জানুয়ারি মবিন আমার কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা নেয়। সে আমাকে কাস্টমসের বেশ কিছু কাগজও দিয়েছিলেন। পরে সিআইডি তাদের গ্রেপ্তার করায় সেখানে গিয়ে আমি প্রতারকদের শনাক্ত করি।’

জান্নাত আরা বলেন, ‘আমরা আসামির কাছে ৪০ কোটি টাকার ব্ল্যাঙ্ক চেক পেয়েছি। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ওমর মবিন জানায়, পাঁচ বছর আগে তিনি এক সংসদ সদস্যের পিএস হিসেবে কাজ করতেন। সেখান থেকে চাকরি ছাড়ার পর প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। তবে নিশ্চিত হওয়ার আগে মবিন কোন এমপির পিএস ছিলেন তার নাম জানাননি। আসামিদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে (নম্বর-১৮)। তাদেরকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’ এই প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের আইনের আওতায় আনার জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এসএসপি জান্নাত আরা। 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে