ফুলবাড়ীয়ার ঐতিহ্যবাহী হুমগুটি খেলা কাল

  ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

১২ জানুয়ারি ২০১৭, ১০:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

ফুলবাড়ীয়া ঐতিহ্যবাহী হুমগুটি হাতে শিক্ষক মুন্নাফ হোসাইন।

পৌষ সংক্রান্তির শেষ বিকেলে আগামীকাল শুক্রবার জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুরের বড়ই আটায় তালুক-পরগনার সীমানায় হবে হুমগুটি খেলা। পৌষ মাসের শেষ দিনকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় পহুরা। প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্যবাহী এই খেলা বছরে একবার একই স্থানে হয়।
 
পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এই খেলা। আর এই খেলাকে কেন্দ্র করে  ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গ্রামে চলে অন্যরকম উত্সাহ উদ্দীপনা। গোটা পরিবেশ হয়ে উঠে উত্সবমুখর। ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুর ও দশ মাইলের মাঝা মাঝি বড়ই আটা বন্ধে (মাঠে) খেলার কেন্দ্রস্থল। বিকেল চারটার দিকে খেলা শুরু হয়। সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পাশ্ববর্তী ত্রিশাল, মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা বন্ধে।
 
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষ্মীপুরের বড়ই আটা বন্ধ। খেলা শুরুর আগে ময়মনসিংহ-ফুলবাড়ীয়া সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগস্থল নতুন সড়কে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
 
মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের  ভূখন্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে (যেখানে শুরু তালুক পরগনার সীমানা) সেখানে এই গুটি খেলার আয়োজন করে।
 
গুটি খেলার শর্ত ছিল, গুটিটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা। জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। আজও তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি  খেলার গোরাপত্তন। আমন ধান কাটা শেষ, বোরো ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

আগামীকাল শুক্রবার ১৩ জানুয়ারী বাংলা ৩০ শে পৌষ জমজমাট হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্রকরে ফুলবাড়ীয়ায় মেতে উঠবে লক্ষাধিক মানুষের মিলন মেলা। হুমগুটি স্মৃতি সংসদের সভাপতির উপস্থিতিতে খেলা উদ্বোধন করা হবে।

এক মণ ওজনের পিতলের গুটি ঢাক ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে তালুক পরগনার সীমানায় নিয়ে আসে এলাকাবাসী।

প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকেলের এ খেলাকে ঘিরে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষীপুর, বড়ই আটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, ফুলবাড়ীয়া পৌর সদর, আন্ধারিয়া পাড়া, জোরবাড়ীয়া, চৌদার, দাসবাড়ী, কাতলাসেন সহ আশে পাশের ১৪/১৫টি গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পড়ে নতুন জামা কাপড়, শতাধিক গরু-ছাগল জবাই হয় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। গুটি খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরদূরান্তের আত্মীয় স্বজনরাও ভীড় জমায় এ গ্রামে।

এ খেলায় থাকে না কোন রেফারী বা আমপিয়ার। আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন প্রকার বাহিনীর প্রয়োজন হয় না। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কোন কোন বছর পরদিন পর্যন্ত খেলা চলার রেকর্ডও আছে। একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ঐ নিশানা দেখে বুঝা যায় কারা কার পক্ষের লোক। গুটিটি কোন দিকে যাচ্ছে তা মুলত চিহিৃত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটিটি গুম না হওয়া পর্যন্ত চলে এ খেলা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে