গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনে আইন প্রণয়ণ জরুরি: সুজন

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১২ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:২৭ | আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৭, ১৯:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের পরিচয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি কোনো রাজনৈতিক দলের লোক হয়ে থাকেন বা রাজনৈতিক দল থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তাদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত হবে না।

বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা শীর্ষক গোলটেবিলে শামসুল হুদা এসব কথা বলেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন ওই গোলটেবিলের আয়োজন করে। তাতে অংশ নিয়ে বেশির ভাগ বক্তা সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন করার দাবি জানান।

শামসুল হুদা বলেন, তারা আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করেছিলেন। সে সময় যেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা আলাপ করেছিলেন, তারা সবাই এ ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। তবে তারা চিন্তাও করেনি যে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা এ রকম হয়ে যাবে, দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল সংসদে থাকবে না।

সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, সংবিধানে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের বিষয়ে আইন প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি যে ২২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন, তাদের মধ্যে বিএনপি ছাড়া সবাই আইন প্রণয়নের কথা বলেছে। এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত কমিশন এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই আইনকে কাজে লাগানো হয়নি।

সংবিধানের বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনে এখনই আইন করার পক্ষে মত দিয়েছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এটিএম শামসুল হুদা। তিনি বলেন, এখন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ডায়ালগ (গোলটেবিল আলোচনা) করার সময় নেই। একটা (আইন) করতে হবে, পরে দেখা যাবে সেখানে কী নেই। আগে একটা আসুক। তার পর সময় হবে... দেখা যাবে।

বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে ইসি গঠন নিয়ে সংলাপে আওয়ামী লীগ জানিয়েছে তারা এখনই এ বিষয়ে আইন করতে রাজি। ক্ষমতাসীন দলটির প্রস্তাবে বলা হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সম্ভব হলে এখনই একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন অথবা অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে।সময় স্বল্পতার কারণে আগামী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সময় যাতে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে এখন থেকেই সে উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদী নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে: প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।

কিন্তু সংবিধানের আলোকে ওই আইন সাড়ে চার দশকেও না হওয়ায় প্রতিবারই নির্বাচন কমিশন গঠনে জটিলতা দেখা দেয়। গতবার নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠনের একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান।সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান করে গঠিত সার্চ কমিটি ১০ জনের নাম প্রস্তাব করে এবং তার মধ্য থেকে দুজনের নাম সিইসি হিসেবে প্রস্তাব করে।ওই সুপারিশের মধ্য থেকে সাবেক সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আরও চারজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন জিল্লুর রহমান। ওই কমিশনের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এবারও একইভাবে সংলাপের আয়োজন করে ইসি গঠন করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

এর আগে বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি এম এ আজিজ নেতৃত্বাধীন ইসি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ২০০৭ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।পরে ওই নির্বাচন আর হয়নি; রাজনৈতিক সংঘাতের মুখে দেশে আসে জরুরি অবস্থা; সেনা নিয়ন্ত্রণে দুই বছর দায়িত্ব পালন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।ওই সময় গঠিত হন এ টি এম শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ইসি, যাকে বাংলাদেশের সফলতম কমিশন হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে।

২০০৭ সালে বিদায়ের আগে ইসি নিয়োগ সংক্রান্ত আইনের আলাদা খসড়া’সহ নির্বাচনী আইন সংস্কারে বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল শামসুল হুদার কমিশন। তার মধ্যে থেকে কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন হলেও আইন আর হয়নি।   একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি দল প্রস্তাব দিয়েছে, নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশনকে সরকারি এজেন্সির সুপারভাইজরি অথরিটি দিতে চাচ্ছে। এটাতো... কমিশনাররা ঠিক না থাকলে অপাত্রে দান... নিজেরাই ঠিক নেই, কী সুপারভিশন করবে!সিইসিসহ পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের সংখ্যা নিয়েও আপত্তি করেন সাবেক সচিব শামসুল হুদা।কমিশনার এতগুলা... তখন বলেছিলাম, এটা ভালো হবে না। ভারত এতবড় দেশ, মাত্র তিনজন কমিশনার। আগেতো একজন ছিল।

রাষ্ট্রপতির সংলাপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি খুবই ভালো কাজ করছেন। অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে যদি উনি ভালো কমিশন দিতে পারেন।কমিশনের বদলে কমিশন গঠনের সার্চ কমিটির আকার বড় করার ওপর জোর দেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন।আলোচনায় তিনি বলেন, সার্চ কমিটি এনলার্জ করা উচিত, ৩-৪ জন নয়। তাহলে এটা আরও ট্রাসপারেন্ট হবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনের অংশীদার সরকার এবং রাজনৈতিক দল। এ ছাড়া নির্বাচনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নির্বাচনের সময়ে নির্বাচন কমিশনই মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করে থাকে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিষয়ে একটি আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন স্তরের জনগণকে নিয়ে সার্চ কমিটি বড় করা প্রয়োজন। বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনো কমিশনারকেও সার্চ কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা যেতে পারে।

মূল প্রবন্ধে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের এখতিয়ার মহামান্য রাষ্ট্রপতির। তবে এই নিয়োগ হতে হবে ‘উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে’। তবে দুর্ভাগ্যবশত সংবিধান রচনার ৪৬ বছর পরেও এমন একটি আইন কোনো সরকারই প্রণয়ন করেনি। তাই সংবিধান নির্দেশিত এ আইনটি প্রণয়ন করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, আইন প্রণয়ন না করে আবারও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে এবং জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া যেহেতু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে আগামী সাধারণ নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনে হবে বলেই মনে হয়, তাই যথাযথ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও মেরুদ-সম্পন্ন নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করা আজ আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

সুজনের নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন কমিশন কেমন হবে তার ওপর। এই নির্বাচন কমিশন যদি গ্রহণযোগ্য ও দক্ষ না হয়, তাহলে আগামী নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে এবং তা জাতির জন্য বিপর্যয় বয়ে আনবে।বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সার্চ কমিটি নিরপেক্ষ হলেও তারা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারে, তাহলে তা কোনো সুফল বয়ে আনবে না। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ইস্যুসহ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়া অত্যন্ত জরুরি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল বলেন, আগামী নির্বাচনে ইভিএম চালু করা ঠিক হবে না। কেননা ইভিএম অযোগ্য ও অদক্ষ লোকদের কাছে গেলে এর অপব্যবহার হতে পারে। তাই আরও ভেবেচিন্তে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল বক্তব্য দেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে