বেসরকারি ব্যাংকে আমানত সংকটের আশঙ্কা

  হারুন-অর-রশিদ

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো সামনের দিনগুলোয় আমানত সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর নির্বাহীরা এখন থেকেই সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তারা আমানত সংগ্রহ বাড়াতে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে সদ্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকও ঋণের লাগাম টেনে ধরার ব্যবস্থা করেছে; বৈদেশিক সম্পদের প্রবাহও কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ব্যাংকগুলোও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চেয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেক কমে গেছে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশন খাতে ব্যাংকের তহবিল আটকে যাচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলো আগে থেকেই আমানত সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এটি ভালো লক্ষণ। ব্যাংক নিজেদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ঋণপ্রবাহ অনেক বেশি মাত্রায় বাড়তে শুরু করেছে। গড়ে প্রতিমাসে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু আমানত বেড়েছে মাত্র ৯ থেকে ১১ শতাংশ। আমানতের তুলনায় ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৯ শতাংশ বেশি।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোয় ঋণপ্রবাহের চেয়ে আমানতের প্রবাহ বেশি বাড়তে হয়। কেননা ব্যাংকগুলো তাদের পুরো আমানত ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারে না। আমানতকারীদের স্বার্থে একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকে বিধিবদ্ধ আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। আগে ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের ৮০.৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারত; বিশেষ বিবেচনায় আরও ৪.৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা যেত। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের ৮৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারত; বাকি ১৫ শতাংশ বিধিবদ্ধ আমানত হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখতে হতো। ইসলামি ব্যাংকগুলো মোট আমানতের ৮৮ এবং বিশেষ বিবেচনায় আরও ২ শতাংশসহ মোট ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারত। গত ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমা ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়। নতুন হারে ব্যাংকগুলো বিশেষ বিবেচনায় আমানতের ১ থেকে দেড় শতাংশ কম বিনিয়োগ করতে পারবে। এর মধ্যে সাধারণ ব্যাংকগুলো দেড় শতাংশ ও ইসলামী ব্যাংকগুলো ১ শতাংশ কম বিনিয়োগ করবে। যারা ইতোমধ্যে এই সীমার বেশি বিনিয়োগ করেছেন তাদের আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারিত হারের মধ্যে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংকের বিনিয়োগই ওই সীমার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। ওই সীমার মধ্যে বিনিয়োগ নামাতে হলে ব্যাংকগুলোকে নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ করে আগের ঋণ আদায় বাড়াতে হবে বা আমানত সংগ্রহ বাড়াতে হবে। বিতরণ করা ঋণ ব্যাংকগুলোর জন্য আদায় করা কঠিন। এ কারণে তারা এখন নতুন করে আমানত সংগ্রহের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। এ কারণে বাড়ছে আমানতের সুদের হার। এদিকে ব্যাংকগুলোয় যে অতিরিক্ত তারল্য ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল সরকারি ও ইসলামী ব্যাংকে। সেগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ হয়ে গেছে। ফলে অতিরিক্ত তারল্য কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া নতুন যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, সেগুলোও আদায় হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত তারল্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় নেই বললেই চলে। তারা ইতোমধ্যে যেমন মাত্রাতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করেছেন, তেমনি ঋণ আদায় কম। এ ছাড়া আমানতপ্রবাহও কম। সব মিলিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় আমানত ঝুঁকি বেশি।

ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, নির্বাচনী বছরে বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে; একই সঙ্গে বাড়তে পারে কালো টাকার প্রবাহ। সে জন্য আগাম সতর্ক থাকতে বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, নির্বাচনী বছরে যাতে ঋণের চাপ বেশি না বাড়ে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন।

এর আগে ২০১০ সালে ব্যাংকগুলোয় আমানত সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছিল। ওই সময় ব্যাংকগুলো চড়া সুদে আমানত নেওয়ার পাশাপাশি দেড়শ শতাংশ সুদে কলমানিতেও ধার করেছে। ঋণ বিতরণ কমে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাংকগুলো এবার আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close