x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

আমাদেরসময় বাজেটবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক ২০১৭-১৮

‘রাজনৈতিক অভিঘাতের কথা স্মরণে রেখে বাজেট নিয়ে ভাবতে হবে’

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ মে ২০১৭, ১১:৪৫ | আপডেট : ২৪ মে ২০১৭, ১৪:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

২০১৭-১৮ জাতীয় বাজেট নিয়ে দৈনিক আমাদের সময়ে এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আজ বুধবার বেলা ১১টায় আলোচনা শুরু হয়।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অ‌ধ্যাপক এম এম আকাশ।

প্রবন্ধে বলা হয়, আমরা জানি রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থমন্ত্রী নিজেই এক সভায় সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০১৭-১৮ বাজেটের মধ্যেই তার যা কিছু অপ্রিয় কাজ তা তিনি করে ফেলতে চান। কারণ পরবর্তী ২০১৮-১৯ এর বাজেটটি হবে নির্বাচনী বছরের বাজেট এবং স্বাভাবিকভাবেই তা হবে উদার ও রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে কিছুটা শিথিল ও নরম বাজেট। নির্বাচনী চক্রের কথা মনে রেখে বর্তমান এ কাজটি তিনি কিছুটা কঠোরভাবে করার অভিলাষ পোষণ করেছিলেন। সে জন্য এ বছরই কড়াকড়িভাবে ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের কিছুটা প্রস্তুতি ও অভিযান-আয়োজন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই শেষ পর্যন্ত এ বাজেটেই অর্থমন্ত্রী কতখানি কঠোর হতে পারবেন বা হওয়া উচিত তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী পিছু হটতে শুরু করেছেন বলে মনে হচ্ছে। এ সময় ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল ভ্যাটের কর হার কমানো এবং সর্বত্র সমান কর হার আরোপ না করা। তা ছাড়া ভোক্তারাও আশঙ্কা করছেন, ভ্যাটের ভিত্তি প্রসারিত হলে চাপটা অবশেষে চূড়ান্তভাবে তাদের ওপরই গিয়ে পড়বে। তাই সরকারকে সিরিয়াসলি এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাতের কথা স্মরণে রেখে বাজেট প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে হবে।

ক. ভ্যাটের হার যা আছে তাই থাকা উচিত কি? নাকি সাধারণভাবে বা ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা কমানো উচিত?
খ. ভ্যাটের আওতা যদি আরও বিস্তৃত করতে হয়, তা হলে কীভাবে এবং কোথায় কোথায় তা বিস্তৃত করা হলে জনগণের ওপর চাপ সহনীয় মাত্রায় বাড়বে?
গ. ভ্যাট আদায়ের নতুন অনলাইন পদ্ধতির কোনো পাইলট টেস্ট ইতোমধ্যে হয়েছে কি? কীভাবে তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়?

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি
বেশ কিছুদিন যাবৎ আমরা সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে আমাদের বাজেট প্রণয়ন করে আসছি। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে আরও যুক্ত হয়েছিল ২০০০-২০১৫ কালপর্বে অর্জিতব্য এমডিজি, যা অর্জনে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সফলও হয়েছে। বর্তমানে ২০১৫-৩০ সময়ে অর্জনের জন্য যুক্ত হয়েছে এসডিজি। এসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য সামগ্রিকভাবে অর্জনের পদক্ষেপগুলো কী হবে এবং বাজেটে সে অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পিত ব্যয় বরাদ্দ থাকছে কিনা, সেটি একটি বহুমুখী, জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে কয়েকটি ন্যূনতম প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরা হলো-
১.     উল্লিখিত দলিলগুলোয় বর্ণিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য আমাদের সর্বপ্রথম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে পরিমাণগতভাবে আরও বাড়াতে হবে। গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রথমে ৮ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা আমরা নিজেরাই ঘোষণা করেছি। কিন্তু সে জন্য আমাদের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হার বাড়াতে হবে। অথবা/এবং বিদেশিদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই কয়েক বছর ধরে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে তা একটি উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। খালি ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ, EPZ ও SEZ তৈরি এ সমস্যার সমাধান কিনা, সে প্রশ্নটি আমি আপনাদের সামনে রাখছি?
২. বলা হয়ে থাকে বিনিয়োগযোগ্য প্রচুর উদ্বৃত্ত কতিপয় ধনী ব্যক্তির হাতে বর্তমানে রয়েছে। তা হলে প্রথমে প্রশ্ন ওঠে, কেন তারা দেশের ভেতরে তা বিনিয়োগ করছেন না? এটি কি শুধুই দুর্বল অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, নাকি বড় ধনীদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সংশয় রয়েছে, নাকি বিদেশে টাকা পাচার তাদের বিদেশমুখী mindset-এর এক ধরনের অভিপ্রকাশ। যেসব নাগরিক স্থায়ীভাবে প্রবাসী চীনাদের মতো, তারা কি দেশে বিনিয়োগ করার জন্য আকৃষ্ট হতে পারেন না? যাই হোক না কেন, বিদেশে বৈধ-অবৈধ পন্থায় পুঁজি পাচারের এ প্রবণতা  থেকে বেরোনোর পথটি কী হতে পারে? সম্প্রতি বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ অবারিত করে দেওয়ার ফল কি রকম হতে পারে?
৩. ব্যাংকগুলোও ক্রমাগত ঋণখেলাপির শিকার হচ্ছে? ২০১৭-এর মে মাসে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৭৩ হাজার কোটি টাকা (এর সঙ্গে অবলোপনকৃত আরও ৪৩ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা!)। এর শেষ কীভাবে হবে? ব্যাংকগুলোর জন্য কোনো ব্যাংক কমিশন তৈরি হওয়াটা কি জরুরি? ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণের বর্তমান দ্বৈত কাঠামোই কি এ জন্য দায়ী? কোন রাজনৈতিক শাসনামলে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি?
৪. বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি কীভাবে SME খাতের আরও ঊর্ধ্বমুখী উন্নয়ন সম্ভব? কিভাবে উপযুক্ত প্রযুক্তি, উপযুক্ত ঋণ বা পুঁজি, উপযুক্ত দক্ষতা, উপযুক্ত বাজার সংযোগ, উপযুক্ত ভ্যালু চেইন ইত্যাদি গড়ে তোলা সম্ভব? এদের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে কি করা যেতে পারে? তবে এদের নিয়মিত census/survey করে একটি ধারাবাহিক তথ্য সিরিজ ছাড়া এখানে প্রণোদনা কাঠামো নির্ধারণ করা কঠিন হবে। census না থাকলেও সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা ও পরিকল্পনা কি আমাদের শিল্প মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বা কখনো ছিল? এবারের বাজেটে এসব সম্ভাবনাময় উদ্যোগের জন্য কি কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কি তা বাস্তবায়নে সক্ষম হবে?
৫. বিদ্যমান রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর উচ্চতর মানের ব্র্যান্ড পর্যায়ে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় পদার্পণের জন্য কি ধরনের সাহায্য আমাদের তাদের দিতে হবে? পাশাপাশি বর্তমানে ‘কমপ্লায়েন্স’ প্রশ্নে যেসব আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে তা আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব? EPZ-এ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিতে আপত্তি কি যুক্তিসঙ্গত? এর সমাধান কি?
৭. বর্তমানে কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণের বিপুল তাগিদ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে কি আমাদের নিঃশর্ত উৎসাহ দেওয়া উচিত? কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে কী ধরনের সুবিধা প্রদান করা উচিত হবে? ফলে কি কৃষি মজুরদের কাজের সুযোগ হারানোর কোনো আশঙ্কা রয়েছে? না কি সব মিলিয়ে এর ফলে নিট কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে ও কৃষির জন্য তা মঙ্গলকরই হবে?
৮. কৃষির বহুমুখীকরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কৃষিপ্রযুক্তি ও জ্ঞানের নিত্যনতুন প্রয়োগ। তা ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণের একটি অন্যতম উপায় হচ্ছে কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার। বাজেটে কৃষি গবেষণা ও এক্সটেশনের জন্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য কী রকম সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশিত? সেসব প্রত্যাশা কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কী আছে?
৯. কৃষকের কৃষিপণ্যের উপযুক্ত, মূল্যপ্রাপ্তি এবং ভোক্তাদের সহনীয় দামে কৃষিপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য উপকরণ ভর্তুকি, দাম সমর্থন, সমবায় ইত্যাদি নানা ধরনের কর্মসূচির প্রস্তাবনা চালু আছে। বাজেটে এসব প্রস্তাবের ব্যাপারে সমন্বিত দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। অর্থ বরাদ্দও দরকার। আপনারা কি মনে করেন?
১০. শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য, শিক্ষা কর্মমুখী করার জন্য, অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সার্বজনীন অধিকারে পরিণত করার জন্য এবং একটি উপযুক্ত আধুনিক পাঠক্রমের জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বাজেটের বর্ধিত বরাদ্দ উপযুক্ত খাতে প্রবাহিত করা প্রয়োজন। সেটি কেন দিনের পর দিন মর্মান্তিকভাবে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে?
১১. প্রাথমিকভাবে দরিদ্র জনগণের জন্য এবং পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সব নাগরিকের জন্য সাধারণভাবে সংবিধান বর্ণিত মৌলিক অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান-সম্মানজনক কাজ-ন্যূনতম আয়  ইত্যাদি নিশ্চিত করার জন্য কল্যাণ রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এ জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ খাতে যে বাজেট বরাদ্দ হয় তা আরও স্বচ্ছ, আরও কার্যকর এবং আরও জবাবদিহিতা সম্পন্ন করার উপায় কি? তাকে বৃদ্ধি করারও প্রয়োজন। কিন্তু সে জন্য কোথা থেকে আয় সংগ্রহ ও কোথায় ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে?

দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস
এবার প্রথমবারের মতো SDG-এর অধীনে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে আয় ও সম্পদের বৈষম্য না কমাতে পারলে প্রকৃত উন্নয়ন অর্জিত হবে না। আমি গাছতলায়-তুমি বিশ তলায়Ñ এভাবে যে উন্নয়ন তা টেকসই হবে না। উন্নয়নকে টেকসই করতে গেলে আয় ও সম্পদ বণ্টনকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে হবে না। সরকারকে তার আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ বাজেটের মাধ্যমে কিছু পুনর্বণ্টনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। ‘ধনীদের ওপর করারোপ এবং দরিদ্রদের জন্য ব্যয়’Ñ কল্যাণ রাষ্ট্রের এই মূল দর্শনটি সরকারকে ও নীতিনির্ধারকদের মেনে নিতে হবে। যদিও crony capitalist system এ রাষ্ট্রের পক্ষে উপরোক্ত দর্শন কার্যকরী করা খুবই কঠিন বা অসম্ভব। কিন্তু এ নিয়ে আমরা অন্তত ভাবনা শুরু করতে পারি। আগামী বাজেটে বিবেচনার জন্য নিচে কতকগুলো অ-চিরায়ত (non traditional) প্রস্তাব তুলে ধরা হলো-
১. নিম্ন আয়ভুক্ত নাগরিকবৃন্দ যদি একত্রিত হয়ে যৌথ অ্যাকাউন্টে কিছু সঞ্চয় করতে পারেন, তা হলে তাকে সমপরিমাণ matching fund বা অনুদান হিসাবে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হোক। ওই  অনুদান ও সঞ্চয় ব্যবহার করে যদি ওই গ্রুপটির সদস্যরা এককভাবে বা সমবায়ের মাধ্যমে আরও বৃহত্তর তহবিল নির্মাণ করতে সক্ষম হয়, তা হলে তাদের সফল উদ্যোগের জন্য আরও বাড়তি তহবিল প্রদান করা হোক। প্রাথমিকভাবে এটি ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের গ্রুপগুলোর মধ্যে pilot basis-এ চালু হতে পারে। তাদের ঋণদাতা এনজিও-ই প্রাথমিকভাবে দেখভাল করতে পারেন। এ কর্মসূচিটি credit plus কর্মসূচি হিসাবে কোথাও কোথাও এখনই চালু রয়েছে। এগুলো পর্যালোচনা করে একটি সার্থক self felp group model reinvent করা প্রয়োজন। এ জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ‘স্ব-সাহায্যকারী দরিদ্রদের তহবিল’ নামে একটি সামুষ্টিক বরাদ্দ আগামী বাজেটে থাকতে পারে কি?
২. ভূমি রেকর্ড ডিজিটাইজেশন, বিশেষভাবে পাবর্ত্য চট্টগ্রামসহ সব প্রান্তিক ও পশ্চাৎপদ এলাকার খাস, জলাজমির স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন এবং বেআইনি দখলকারীর কাছ থেকে তা পুনরুদ্ধার ও পুনর্বণ্টনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ‘ভূমি সংস্কার’ কমিশন তৈরি করে তাদের পর্যাপ্ত অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ভূমিহীনরা, কোনো কোনো এনজিও এবং বাম সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। বর্তমান বাজেটে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে পারে।
৩. সম্পত্তি করের মাত্রা নিরূপণে যে দাম জটিলতা, হার নিয়ে জটিলতা ও আদায় নিয়ে জটিলতা রয়েছে, তা দূর করার লক্ষ্যে দেশের নির্বাচিত কয়েকটি অঞ্চলে সম্ভাব্য সম্পদ কর আদায় মাত্রা নির্ণয়ের একটি polot excersise করা প্রয়োজন। সেই ভিত্তিতে এ বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উপায়গুলো আবিষ্কার করা যায় কি? অন্য দেশগুলোর কোনো শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা আছে কি?
৪. গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় খাদ্য/নগদ অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা এ বাজেট থেকেই শুরু করা যেতে পারে।
৫. পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য রেশন ও বাসস্থানের দায়দায়িত্ব সরকার ও মালিকদের যৌথভাবে নেওয়ার প্রস্তাব শ্রমিক সংগঠনগুলো দিয়েছেন। ১০০ ডলার রপ্তানির জন্য বর্তমানে যে কয় সেন্ট অর্থ মালিকরা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে জমা দিচ্ছেন, তার পরিমাণ ও ব্যয় প্রণালি স্বচ্ছ করে সেই সংগৃহীত তহবিলকে এ জন্য কাজে লাগানোর প্রস্তাব করা যেতে পারে।

মধ্যম আয়ের দেশ
বর্তমানে আমরা মাথাপিছু আয়ের নিরিখে নিম্ন মধ্যম আয়ের অবস্থানে উপনীত হয়েছি। এখান থেকে মধ্যম আয় এবং মধ্যম আয় থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে আমরা চাই। কিন্তু সে জন্য কি করতে হবে? বাজেটে তার দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
১. শুধু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করে ‘মধ্যম আয়’ মান নির্ধারণ সঠিক হবে কি? মধ্যম মানের সাধারণ জীবনমান অর্জন করতে হলে আমাদের নাগরিকদের ব্যাপক অংশকে মধ্যবিত্তে পরিণত হতে হবে। যারা এখন মাসিক ১০-১৫ হাজার টাকা রোজগার করছেন, তাদের মাসিক আয় দ্বিগুণ বেড়ে ২০-৩০ হাজার টাকা (বর্তমান স্থির দামে) হতে হবে। এবং এ ধরনের নাগরিকদের সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বাড়াতে হবে। সে জন্য করণীয় হিসেবে সুপারিশগুলো হচ্ছে-
ক. শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি।
খ. প্রযুক্তির উন্নত প্রয়োগ।
গ. শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
ঘ. অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি।
ঙ. রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্পের পুঁজিঘন উন্নতর পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন।
চ. অভ্যন্তরীণ বাজার প্রসারিত করার স্বার্থে এবং মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে ভবিষ্যতে মুক্ত থাকার জন্য আয় বণ্টনকে বর্তমান স্তর থেকে আরও কমিয়ে আনা।
ছ) সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্বলদের ক্ষমতায়ন।
২. প্রশ্ন হচ্ছে এই সুপারিশগুলো বহুদিন ধরেই আমরা জানি। কিন্তু এগুলো করা হচ্ছে না বা করার চেষ্টা করা হলেও তা খুব একটা অগ্রসর হচ্ছে না কেন?
৩. সাধারণভাবে বহুদিন ধরে দুটি বাধার কথা শোনা যায়। একটি হচ্ছে আমলাতন্ত্র, অপরটি কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ক্ষমতা। এগুলোর মূলে রয়েছে উপযুক্ত গণতন্ত্রমনা প্রশাসনিক ও দলীয় কোডারের অভাব। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত না হলে কোনো কোনো ক্ষমতাই শেষাবধি বিকেন্দ্রীভূত হবে না। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত করে তাকে তৃণমূলের কণ্ঠস্বর ও জবাবদিহিতার অধীনস্ত করার লক্ষ্য এসডিজিতে আছে। কিন্তু বাজেটে প্রতিবার অর্থমন্ত্রী তা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রতিবারই তিনি তা কিছু cosmetic changes-এর মাধ্যমে পূরণ করার ভান করেন। এবং এক অর্থে নিজের সঙ্গে নিজেই আত্মপ্রতারণা করে যাচ্ছেন। সম্ভবত এ বিষয়ে কিছু মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ এবারই তাকে পারলে কার্যকরী করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনী বছরের বাজেটে বড় কিছু সংস্কার যে সম্ভব নয় তা তিনি আগেই আমাদের জানিয়েছেন। আমরা কি আশা করতে পারি যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে তিনি খোলামেলা কিছু কথা তুলে ধরবেন। আমরা এও জানি যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে। সেখানেও গণতন্ত্রের চর্চা বৃদ্ধি করে অন্তর্বিরোধগুলো মিটিয়ে ফেলা দরকার। সহনশীলতা ও অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করার সংস্কৃতির বিকাশ প্রয়োজন। সে জন্য আমলা ও রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিরও প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটটিতে E-education এবং E-culture-এর ব্যাপক কর্মসূচি থাকা দরকার। E-commerce শুধু নয়, E-governance-ও আমাদের দেশে প্রয়োজন। বাংলাদেশের অন্যতম দুটি শক্তির দিক হচ্ছেÑ এর ঘনবসতি এবং জনমিতিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ (democratic dividend)। এখানে তাই যে কোনো ভালো idea-কে দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সৃজনশীল পরিবর্তনমুখী শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে ICT এই প্রক্রিয়ায় কি ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও আলোচকদের আলোচনা করার জন্য আমি অনুরোধ করছি।

পরিবেশের সংরক্ষণ
আমাদের SDG-এর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছেÑ টেকসই প্রবৃদ্ধি। কিন্তু সে জন্য অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে পরিবেশের সংরক্ষণ নিশ্চিত করে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন।  যাতে বর্তমান প্রজন্মের লোভের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিসর্জিত না হয় সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। এ কথা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, যদি বিশ্বের সব দেশ আমেরিকান ভোগবাদকে আদর্শ স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনা করে, তা হলে দু-তিনটা পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ একত্র করলেও তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। আমাদের তাই ‘plain living-high thinking’-এর পুরনো আদর্শে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আগামী বাজেটে সেই মূল্যবোধের নির্দেশনা দিতে হলে
ক. নবায়নযোগ্য এনার্জির ওপর গুরুত্বারোপ করে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে।
খ. অনবায়নযোগ্য এনার্জিভিত্তিক প্রকল্প বাদ দিতে না পারলেও যথাসম্ভব কম ব্যবহারের জন্য চেষ্টা করতে হবে।
গ. বন ধ্বংস, নদী ধ্বংস, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সে জন্য জরুরি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করে আগামী বাজেটে সেগুলোর জন্য প্রণোদনামূলক (নৈতিক ও বস্তুগত) বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে কি?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে