দুই বিজ্ঞানীর দেখা ও এক আকাশ আশা

  আমাদের সময় ডেস্ক

২১ জানুয়ারি ২০১৮, ২৩:২২ | আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৮, ২৩:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

মাভাবিপ্রবির বিজ্ঞান আসরে আমন্ত্রিত দুই পদার্থবিজ্ঞানী: অধ্যাপক এ এ মামুন (বাঁ থেকে তৃতীয়) ও অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব (চতুর্থ)। ছবি সৌজন্যে: ড. মাসুম হায়দার।
‘হাইড্রোজেন বোমার জনক’ বলে পরিচিত বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেইলার বলেছিলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞান যথাসম্ভব সহজবোধ্য। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা নন।’ এ কথার কোনো মিল অবশ্য পাওয়া গেল না মাভাবিপ্রবিতে আমন্ত্রিত হয়ে আসা দুই পদার্থবিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে। প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের সাধক এ এ মামুন এবং সুপারকন্ডাক্টিভিটির বোদ্ধা সালেহ্ হাসান নকীবÑ দুই বিজ্ঞানীই বন্ধুর মতো মিশলেন মাভাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাভাবিপ্রবি) শনিবার ‘পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবন’ শীর্ষক এক আলোচনায় নিজেদের বিজ্ঞানসাধনার গল্প শোনান এই বিজ্ঞানীদ্বয়। এ সময় তারা সহজ ভাষায় গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই ‘কর্মশালা’য় অংশগ্রহণ করেন। ড. মামুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ড. নকীব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

অধ্যাপক মামুন তার বক্তব্যে বলেন, ‘অনেকেই মনে করে, পিএইচডি নেওয়া শেষ তো গবেষণা শেষ। আসলে কিন্তু তা ঠিক নয়। বরং পিএইচডি শেষ মানে গবেষণার শুরু।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের জীবনে যা ঘটে গেছে, যা ঘটছে এবং যা ঘটবে তা ব্যাখ্যা করতে সহযোগী হবে এই গবেষণা। এই গবেষণা আমাদের মস্তিষ্ককে শানিত করবে। আমি বিশ্বাস করি, একটা শানিত মস্তিষ্ক একশ মস্তিষ্ককে শানিত করতে সম হবে।’

মাভাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ আয়োজন করেছিল ‘পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা ও  প্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবন’ শীর্ষক ওয়ার্কশপ। ছবি সৌজন্যে: ড. মাসুম হায়দার।

ড. মামুন বলেন, ‘যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নেই, সে বিশ্ববিদ্যালয়কে কলেজ বললেও অন্যায় হবে না। আর তাই আমাদের উৎসাহী হতে হবে গবেষণার প্রতি।’ তিনি খুব আফসোসের সঙ্গে বলেন, আমাদের দেশের শতকরা আশি ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গবেষণা করেন না। পদার্থবিজ্ঞানকে ‘একটা বটগাছ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই পদার্থবিজ্ঞানই পারে আমাদের সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যেতে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিজ্ঞানী মামুন বলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞান হতাশার বিষয় নয় বরং অনেক মজার বিষয়। তুমি যদি তোমার কাজে উৎসাহী হও, নিশ্চয়ই একদিন না একদিন এই কাজের মূল্যায়ন পাবেই।’

অধ্যাপক নকীব দীর্ঘ দুই দশক ধরে গবেষণা করছেন পদার্থের পরমপরিবাহিতা বা অতিবাহিতা (সুপারকন্ডাক্টিভিটি) নিয়ে। ১৯১১ সালে কামেরলিং ওনস এই সুপারকন্ডাক্টিভিটি প্রথম আবিস্কার করেন। কৃতিত্বস্বরূপ ১৯১৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু, ড. নকীব বলেন, ‘১৯৫৭ সালের আগ পর্যন্ত কেউ সুপারকন্ডাক্টিভিটির তত্ত্ব দিতে পারেননি। ওই বছরই প্রথম এ বিষয়ে বিসিএস তত্ত্ব দেওয়া হয়।’

বার্ডিন-কুপার-স্ক্রিফার বা বিসিএস তত্ত্বের নামটা তিন বিজ্ঞানীর নামের আদ্যোক্ষর নিয়ে। এরা হলে জন বার্ডিন, লিও কুপার এবং জন রবার্ট স্ক্রিফার।

সালেহ্ হাসান নকীব ব্রত আছেন উচ্চ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটি আবিষ্কারের গবেষণায়। তিনি বলেন, ‘আমরা ২০৩ ডিগ্রি কেলভিন (সেলসিয়াস স্কেলে শূন্যের নিচে ৭০ ডিগ্রি) তাপমাত্রা পর্যন্ত যেতে পেরেছি। আমরা আশাবাদী, একদিন কক্ষ তাপমাত্রাতেই মিলবে সুপারকন্ডাকটিভিটি।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিজ্ঞানী নকীব বলেন, ‘তোমরা সেই বিষয়টিই পড়ছ, যে বিষয়টি মানবসভ্যতায় সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। পদার্থবিজ্ঞান হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়। যার উপরে আর কোনো শাখা নেই। থাকার কথা না।’

বক্তৃতা শেষে এক অবসরে কথা হয় দুই বিজ্ঞানীর সঙ্গেই। অধ্যাপক মামুনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কীভাবে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের নেশায় পড়েছিলেন। তিনি বলেন, এক আত্মীয়ের উচ্চতর শিক্ষাবৃত্তির খবর তাকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করে। সেখান থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার সৃষ্টি। পদার্থবিজ্ঞানকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে কার অনুপ্রেরণা প্রধান ছিল, জানতে চাইলে অধ্যাপক নকীব বলেন, ‘আমার বাবা ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। মূলত তার অনুপ্রেরণাতেই পদার্থবিজ্ঞান পড়া। আর পরবর্তীতে শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা আমায় পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে শেখায়।’

মাভাবিপ্রবির পদর্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী এনামুল হক এই লেখককে বলেন, ‘আমি এই ওয়ার্কশপ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছি, পেয়েছি অনেক আগ্রহ। দুই বিজ্ঞানীই অনেক ভালো মনের মানুষ।’

 

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী সানজিদা নিশাত বলেন, ‘মামুন ও নকীব স্যারের কথা শুনে উচ্চতর গবেষণার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’

মাভাবিপ্রবির বিজ্ঞান আসরে আমন্ত্রিত দুই পদার্থবিজ্ঞানী: অধ্যাপক এ এ মামুন ও অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ

মূল্যায়ন জানতে চাইলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক উম্মে হাবিবা বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ওয়ার্কশপে অধ্যাপক মামুন ও অধ্যাপক নকীব এত সুন্দরভাবে গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, আমি বলব- শিক্ষার্থীরাই শুধু নয়, আমরা উপস্থিত শিক্ষকরাও অনুপ্রাণিত হয়েছি। উৎসাহ জোগানো ও প্রেরণামূলক এমন আয়োজন আরও হওয়া দরকার।’

ওয়ার্কশপের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আলাউদ্দিন। তিনি আমন্ত্রিত দুই বিজ্ঞানীর নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু এই পদার্থবিজ্ঞান।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. পিনাকী দে বলেন, ‘আমি মনে করি, এরকম ওয়ার্কশপ আরও বেশি বেশি দরকার।’ অনুষ্ঠানের প্রথমেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন মাভাবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মোঃ মনিরুজ্জামান।

আফরোজা খাতুন, লেখক: পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে