রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে এগিয়ে আসতে হবে

  জাকির হোসেন তমাল

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:২২ | অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্য

মতিহারের এই সবুজ চত্বরে আজ আমরা যেভাবে ঘুরে বেরাচ্ছি, একটা সময় সেটা সম্ভব ছিল না। ক্যাম্পাসে দিনের পর দিন কারফিউ জারি করা হয়েছিল। ওই সময়ে কেউ আর ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারতেন না। এক সময় এই ক্যাম্পাস ছিল জনমানব শূন্য। ক্যাম্পাসের ভবনসহ সব কিছুই ছিল। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্নুজান হলের দেয়াল ঘেষে বসানো হয়েছিল সারি সারি কামান। সৈন্যরা সেগুরো সব সময় ধোয়া-মোছা করত। এই কামান পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা হতো শাড়ি। সেই শাড়ির মালিক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ২৫ মার্চের পর ছাত্রীরা বাড়ি চলে যাওয়ায় মন্নুজান হল থেকে তাদের রেখে যাওয়া কাপড় নিয়ে আসা হতো। সেই শাড়ি দিয়ে কামান পরিষ্কার করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো দিক দিয়েই নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানো যেত না। ক্যাম্পাসে চলাফেরার জন্য বাড়তি এক ধরনের কার্ড বহন করতে হয়েছিল।

পুরো রাজশাহী অঞ্চল থেকে মুক্তিকামী ও নিরহ মানুষদের ধরে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে হত্যা-নির্যাতন করা হতো। তাদের অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আধা-মরা করে মাটিতে পুতে রাখা হতো। বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হতো এই ক্যাম্পাসেই।

নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, এই চিত্রগুলো ১৯৭১ সালের। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল পাকিস্তানিদের দখলে। সেই দখল থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করতে ৯ জন শিক্ষার্থী, ৩ জন শিক্ষক, ৫ জন সহায়ক কর্মচারী ও ১০ জন সাধারণ কর্মচারী প্রাণ দিয়েছেন।

শহীদ শিক্ষকরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের হাবিবুর রহমান, মনোবিজ্ঞান বিভাগের মীর আবদুল কাইয়ুম ও সংস্কৃত বিভাগের সুখরঞ্জন সমাদ্দার।

শহীদ ছাত্ররা হলেন, আবদুল মান্নান আহমেদ (বাণিজ্য বিভাগ, দ্বিতীয় বর্ষ), আমীরুল হুদা জিন্নাহ (বাংলা বিভাগ, এমএ শেষ বর্ষ), গোলাম সরওয়ার খান সাধন (পূর্ব বিভাগ, এমএসসি), প্রদীপ কুমার রাহা (রসায়ন বিভাগ), মোহাম্মদ আলী খান (অর্থনীতি বিভাগ, প্রথম বর্ষ), শাহজাহান আলী (বাণিজ্য বিভাগ), মিজানুল হক (এমএসসি, পূর্ব ভাগের পদার্থবিদ্যা বিভাগ), ফজলুল হক, আ. লতিফ ও রেজাউল করিম।

শহীদ সহায়ক কর্মচারীরা হলেন, আবদুর রাজ্জাক (নৈশপ্রহরী, প্রশাসন ভবন), শেখ এমাজ উদ্দিন (স্টোন টাইপিস্ট, প্রশাসন শাখা), এস এম সাইফুল ইসলাম (উচ্চমান সহকারী, হিসাব বিভাগ), মো. কলিমউদ্দিন (কর্মসহকারী, প্রকৌশল দপ্তর), আবুল হোসেন (পরিবহন শাখার চালক) ও শফিকুর রহমান (কাঠমিস্ত্রি, প্রকৌশল দপ্তর)।

শহীদ সাধারণ কর্মচারীরা হলেন, মোহনলাল (সুইপার, স্টুয়ার্ড শাখা), নূরু মিঞা (প্রহরী, স্টুয়ার্ড শাখা), মোহাম্মদ ইউসুফ (উপাচার্য অফিসের জরুরি পিয়ন), মো. ওয়াজেদ আলী (পিয়ন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর), মো. আফজাল মৃধা (প্রহরী, উপাচার্য দপ্তর), ওয়াহাব আলী (অর্ডালি পিয়ন, প্রক্টর দপ্তর), আবদুল মালেক (বেয়ারা, আইন বিভাগ), কোরবান আলী (প্রহরী, ভূগোল বিভাগ), ইদ্রিস আলী (পানিবাহক, সৈয়দ আমীর আলী হল) ও মো. আবদুল মজিদ।

তাদের স্মৃতি রক্ষা করতে হবে 

শহীদ শিক্ষকদের স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। দীর্ঘ দিন পর শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে, যা অনেকের প্রাণের দাবি ছিল। কিন্তু, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্মৃতি রক্ষার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুই করা হয়নি। অথচ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শহীদ একজন কর্মচারী ছিলেন। তার নাম আবদুর রাজ্জাক। তার সম্পর্কে কোথাও কোনো স্থাপনা তৈরি করা হয়নি। তার স্মৃতি রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের পাশে চাইলেই স্মৃতিফলক তৈরি করা যেত। যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন পাহারা দিতে গিয়েই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন ২৫ মার্চ রাতে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়জন শিক্ষার্থী প্রাণ দিলেন। কিন্তু তাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য কিছুই করা হলো না। এটা তাদের প্রতি এক ধরনের অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্মৃতি রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এগিয়ে আনতে হবে। আর এই কাজটি করতে পারেন একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীরাই। তারাই পারেন শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে কাজ করতে।

এই বিজয়ের মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই কাজ করবেন বলেই বিশ্বাস। এই মহান কাজে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসলে পুরো ক্যাম্পাসসহ দেশের মানুষ তাদের শ্রদ্ধা করবেন। তাদের উদ্যোগকে স্মরণে রাখবেন স্বর্ণাক্ষরে।

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে