বিশেষ লেখা

গণরায় মেনে নেওয়াই গণতন্ত্র

  আবুল মোমেন

২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

আজ সকাল থেকেই নির্বাচনের প্রচার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এবার জাতি অপেক্ষায় থাকবে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য। এবার দেশে ভোটারের সংখ্যা সাড়ে ১০ কোটির মতো। সেদিক থেকে বাংলাদেশকেও এক বৃহৎ গণতন্ত্র আখ্যায়িত করা যায়। ১৯৯১ থেকে দেশে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তারপর এবারেরটি নিয়ে জাতীয় সংসদের সপ্তম নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে এর মাঝে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে যে নির্বাচন করেছিল, তা গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং কয়েক মাসের মাথায় সরকারকে পদত্যাগ

করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচন দিতে

হয়েছিল। এর সঙ্গে যোগ হবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ২০১৪ সালে যে নির্বাচন করেছিল সেটি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাপকাঠিতে এ দুটি নির্বাচন উত্তীর্ণ হয়নি। তবে ওই সময় তিন-চার মাসের ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াওসহ আন্দোলনকে সরকার শেষ পর্যন্ত পুলিশি তৎপরতা ও আইন প্রয়োগের কঠোরতার মাধ্যমে দমন করেছিল। সে হিসাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দশ বছর ধরে টানা দেশ শাসন করছে।

১৯৪৭ সাল থেকে হিসাব নিলে দেখা যাবে একবার পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসক আইয়ুব খান এবং আরেকবার বাংলাদেশ আমলে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের টানা দশ ও নয় বছরের শাসনকাল ছাড়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আজ অবধি কোনো সরকার পাঁচ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, অনেক সরকারের মেয়াদ ছিল এক বছরেরও কম। সেই বিবেচনায় শেখ হাসিনার দশ বছরের শাসনকাল নানা দিক থেকে গুরুত্ব বহন করে।

তবে গণতন্ত্র কায়েম হওয়া সত্ত্বেও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব রয়েছে, যার পেছনে কাজ করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক ধারার মধ্যকার নীতি-আদর্শের বৈপরীত্য। আবার এর রেশ ধরে তাদের মধ্যে চলমান রয়েছে পারস্পরিক চরম অবিশ্বাস, এমনকি চরম ঘৃণা। তারও পেছনে এমন কিছু কারণ রয়েছে যার সঙ্গে দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পর্ক গভীর, আর তার জের ধরে চলে আসে জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকা-, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বারবার হত্যাচেষ্টা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর বর্বরোচিত হামলার মতো ঘটনা। এসব ঘটনার বিচার যে এতদিন বন্ধ ছিল তার পেছনে জামায়াত-বিএনপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশে জঙ্গিবাদ ও ধর্মান্ধ রাজনীতি এবং এদের উত্থানের পেছনেও জামায়াত-বিএনপি সরকারের কারো কারো হাত ছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিতে যে বিরোধ ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তার ঐতিহাসিক, আদর্শিক ও আইনগত ভিত্তি রয়েছে। সম্ভবত এমন বিরোধের চূড়ান্ত মীমাংসা কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে প্রত্যাশা করা যায় না। বরং অনেকগুলো ঘটনা বা অপরাধের বিচার ও শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর এখন যেন রাজনীতিতে বিরোধ, অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

এ রকম প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনে যেন সংঘাত ও রক্তপাত বেড়েছে। সরকারের কর্তৃত্ববাদী মারমুখী ভূমিকাও গোপন থাকছে না। এতকিছুর মধ্যেও এবারের নির্বাচনের বড় ইতিবাচক দিক হলো দশ বছর পর বিএনপিসহ সব দল এতে অংশ নিচ্ছে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারালেও বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর ফলে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধই থেকে গেল। শুধু তা নয়, আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা মনে করছে দশ বছরে জনগণকে, বিশেষত বিপুল তরুণ সম্প্রদায়কে, দেশের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করেই আজ দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঠিক পথে আনা সম্ভব হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা আরও কিছুদিন না চললে এ অগ্রগতি টেকসই না-ও হতে পারেÑ তাদের এমন প্রচারণার পেছনে যুক্তি যে নেই তা নয়। বলা যায়, ১৯৭৫-এর পর দীর্ঘ তিন যুগ শেষে অগ্রযাত্রার যে পথ তৈরি করা গেছে তাকে ধরে রাখার জন্য শেখ হাসিনা, তার দল ও মিত্রদের আগ্রহ প্রবল। তারা মনে করছেন, এ যাত্রা ব্যাহত হলে আবার পঁচাত্তরপরবর্তী বা ২০০১-০৬ এর মতো নৈরাজ্যকর অবস্থায় ফিরে যেতে পারে দেশ। সেটা ঠেকানোর জন্যই কি তারা মরিয়া হয়ে পড়েছেন?

কিন্তু বিএনপির জন্য এ নির্বাচন প্রায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অতীত রেকর্ড বলছে, এ দেশে বিপুল জনপ্রিয় দলও ক্ষমতা ও জনগণ থেকে ছিটকে পড়ে আর অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রবল বাধা, প্রচুর মামলা ও প্রায় গণগ্রেপ্তার সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের মাঠ ছাড়ছে না, সম্ভবত ছাড়বেও না। তাদের জন্য একটু সুবিধা করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর এক কালের বিশ্বস্ত সহচর, ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল রূপকার ও দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন জোটের হাল ধরতে এগিয়ে এসে। এতে তাদের পক্ষেও জনমত বেড়েছে, আবার সরকারের ও সরকারি দলের মারমুখী ভূমিকার কারণে তাদের অনুকূলে সহানুভূতি ভোটও বাড়তে পারে।

আমরা আশা করব আজ থেকে নির্বাচনী হাঙ্গামা বন্ধ হবে, সামরিক বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সবার জন্য শান্তিপূর্ণ সমপরিবেশ বজায় রাখতে তৎপর থাকবেন এবং শেষ পর্যন্ত সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে।

আর এ-যাবৎ নির্বাচনী হালচাল যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তা থেকে বলব, বিএনপি যদি ক্ষমতায় নাও যেতে পারে তবুও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখার মতো সংসদ সদস্য তারা পাবে। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে শক্তিশালী কার্যকর বিরোধী দলের অপরিহার্য ভূমিকা তারা পালন করবেÑ এই বিশ্বাস আমরা রাখতে চাই। আর যদি গণরায়ে ক্ষমতায় ফিরতেই পারে, তা হলে আশা করব চেতনা ও উন্নতির বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখবে।

৩০ ডিসেম্বর রাতের মধ্যেই জাতি তার পরবর্তী সরকারের কথা জানতে পারবে। সেই পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। কেবল আমাদের কামনা হবে এ দুদিন যেন পরিস্থিতি শান্ত থাকে, আর নির্বাচন যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। সর্বোপরি ফলাফল যা-ই হোক, সব পক্ষ যেন তা মেনে গণরায়ে তাদের জন্য নির্ধারিত ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করেÑ সেটাই সবার প্রত্যাশা।

আবুল মোমেন : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে