বয়সকে জয় করা

একজন মাহাথির মোহাম্মদ

  শামীম ফরহাদ

১৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ মে ২০১৮, ০১:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মালয়েশিয়ার

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ডা. মাহাথির মোহাম্মদ। দেশটির ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদ-আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট পাকাতান হারাপানের (অ্যালায়েন্স অব হোপ) সংখ্যগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাতে কুয়ালালামপুরের ইস্তানা নেগারা রাজপ্রাসাদে শপথ নেন ‘ডক্টর এম’। অথচ দুই দশক আগে মাহাথিরকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পাকাতান হারাপান আন্দোলন শুরু করেছিলেন আনোয়ার। সেই জোট থেকেই ১৫ বছর পর আবার দেশটির কা-ারির ভূমিকায় ৯২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। এশিয়ার অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক মনে করা হয় তাকে। স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যাওয়ার পর, ক্ষমতায় ফিরলেন নিজের দল ও এক সময়ের শিষ্যদের পরাজিত করে। বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ শামীম ফরহাদ

মাহাথিরের বাজিমাত : ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক নির্বাচিত নেতা হিসেবে ইতিহাস গড়লেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশানাল (বিএন) ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় থেকেছে। মাহাথির মোহাম্মদ অতীতেও প্রধানমন্ত্রীর এবং বারিসান ন্যাশানালের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২২ বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেনÑ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। ২০০৩-এ তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু তার ভাষায়, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সংশোধন করার জন্য তিনি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। তার এই রূপকথার মতো ফেরার পেছনে বড় অবদান রেখেছে তার নিজস্ব ভাবমূর্তি এবং দেশটির অর্থনীতি। জীবনধারণের ব্যয় মালয়েশিয়ায় অত্যধিক বেড়ে গেছে এবং জিনিসপত্র ও বিভিন্ন সেবার ওপর সরকার নতুন নতুন কর আরোপ করেছে, যা কখনই জনপ্রিয় নয়। এ ছাড়া সম্প্রতি কয়েক বছরে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো দুর্নীতি। ক্ষমতা হারানো প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, যা ভোটারদের মাহাথিরের দিকে টানতে সহায়তা করেছে।

ব্যক্তি মাহাথির : ডা. মাহাথির মোহাম্মদ ১৯২৫ সালে মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর অ্যালোর সেটরে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মাতার নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। তার পিতা একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে একজন সরকারি অডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। তার মা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং মাহাথিরকে বাসায় পবিত্র কোরআন শিক্ষা দিতেন। ১৯৪৭ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের কিং এডওয়ার্ড মেডিসিন কলেজে ভর্তি হন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়া ফিরে আসেন। সিঙ্গাপুরে পড়ার সময় মাহাথিরের সিথি হাসমা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সিথি হাসমা তখন দ্বিতীয় মালয় মহিলা হিসেবে সিঙ্গাপুরে বৃত্তি নিয়ে একই কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মাহাথির ও সিথি হাসমা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের মোট সাতজন সন্তান আছে, যার মধ্যে তিনজনকে তারা দত্তক নিয়েছিলেন।

দেশে ফিরে মাহাথির চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঠিক আগে চাকরি ছেড়ে নিজ শহর অ্যালোর সেটরে মাহা-ক্লিনিক নামে একটি প্রাইভেট ক্লিনিক শুরু করেন। শহরের পাঁচটি প্রাইভেট ক্লিনিকের মধ্যে এটি একমাত্র মালয় বংশোভূত ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্লিনিক ছিল। তিনি রোগীদের বাড়িতে যেতেন এবং মাঝে মাঝে ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করতেন। ১৯৭৪ সালে মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা পেশা অব্যাহত রেখেছিলেন।

মাহাথির মোহাম্মদের উত্থান : একুশ বছর বয়সে রাজনীতি শুরু করেন মাহাথির মোহাম্মদ। তখন তিনি তার সাবেক দল ইউনাইটেড মালয়িস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে (ইউএমএসও) যোগ দেন। যদিও পরবর্তী সাত বছর একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি প্র্যাকটিস অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কেদাহ প্রদেশ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে তিনি সেই আসনটি হারান আর দল থেকেও বহিষ্কৃত হন, কারণ তখনকার প্রধানমন্ত্রী টাঙ্কু আবদুল রহমানের সমালোচনা করে তিনি একটি প্রকাশ্য চিঠি লিখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন এবং শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হওয়ার চার বছরের মধ্যে ইউএমএনওর দ্বিতীয় প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৮১ সালে তিনি প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি দেশ নিয়ে তার চিন্তাগুলোর বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেন। জাপানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি মালয়েশিয়াকে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, স্টিল ও গাড়ির উৎপাদক দেশে পরিণত করেন। অথচ এর আগে মালয়েশিয়া শুধু রাবার ও টিন রপ্তানি করত। তার টানা ২২ বছরের শাসনামলে মালয়েশিয়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। যদিও তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু অভিযোগ আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্য তাকে মালয়েশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। তাকে আখ্যায়িত করা হয়, আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি হিসেবে।

অবসরের পরে : ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের খারাপ ফলাফলের জন্য তিনি তার উত্তরসূরি আবদুল্লাহ বাদাউয়ির প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। আবদুল্লাহর পদত্যাগের পর নাজিব রাজাক ক্ষমতায় আসেন। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মাহাথিরই প্রথম নাজিবকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। নাজিব প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন তার সমর্থন নিয়ে। প্রথম দিকে নাজিব রাজাককে সমর্থন করলেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর তা পাল্টে যায়। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার ও পার্টির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের সমর্থন দাবি করেন মাহাথির মোহাম্মদ। কিন্তু সেখানে সাড়া না পাওয়ার পর ২০১৬ সালে তিনি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং বিরোধী পক্ষে যোগ দেন। এবার নির্বাচনে শিষ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মাহাথির বলছিলেন, আগে তিনি ভুল করেছিলেন! এবার সেগুলো শুধরে নিতেই ক্ষমতায় আসতে চান তিনি।

সমালোচনা : মাহাথির তার দেশকে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে নিয়ে এলেও কম সমালোচিত ছিলেন না। বর্ণবাদী, বৈষম্যে, দমন-পীড়নসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে এসেছেন। পশ্চিমা দেশগুলো নিয়ে তার সমালোচনা বহির্বিশ্বেও তাকে আলোচিত করে তোলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার অনেক নাগরিকই তাকে ‘বর্ণবাদী’ হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকরা তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। নিজ সম্প্রদায় মালয়দের প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর পাশাপাশি নৃতাত্ত্বিক বৈষম্যের সূচনাও করেছিলেন তিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মাহাথির মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের গুরুতর অভিযোগ আছে। বহু বিতর্কিত ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় অনেক বিরোধী রাজনীতিবিদকে কারাগারে পাঠানো হয়। তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো সব ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।

মাহাথিরের শরীর-মনে তারুণ্যের রহস্য : গত মার্চে সিঙ্গাপুরভিত্তিক দ্য স্ট্রেইট টাইমস মাহাথির মোহাম্মদের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক সুমিকো তান সাক্ষাৎকারের এক ফাঁকে হাসতে হাসতেই প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা আপনাকে এত তরুণ তরুণ লাগে কেন?! এর রহস্যটা আসলে কী?’ সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন মাহাথির। তারপর বললেন, ‘এ প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করে থাকেন। তাদের সবাইকেই আমি বলি, ‘এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কখনো বেশি খাবেন না। একবার শরীরে চর্বি জমে গেলে আর সহজে তা কমাতে পারবেন না। আর এটা হচ্ছে আমার মায়ের উপদেশ। হার্টের সমস্যার কারণে দুবার বাইপাস অপারেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ৯২ বছর বয়সের ‘গ্রান্ডপা’কে। তিন সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আসলে আমি মনে করি আমি খুব বেশি টেনশন করি না। কিন্তু সমস্যা হলো আমার হার্ট আমাকে বুঝতে চায় না! তাই দুবার অপারেশন করতে হয়েছে। তবে যা-ই হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ আমি খুবই শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন করি।’

মাহাথির মোহাম্মদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের

২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মাহাথির বলেন, ‘চট্টগ্রামের কাপ্তাই রাঙ্গুনিয়ার কোনো একটি গ্রামে আমার দাদার বাড়ি ছিল এবং দাদা পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ায় বসতি স্থাপন করেন।’ তার এই কথার সূত্র ধরেই খোঁজ নিয়ে জানা যায় চট্টগ্রাম জেলার উত্তরাংশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন চন্দ্রঘোনা ও কাপ্তাইগামী সড়কের সামান্য পূর্বে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম মরিয়মনগর। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এ গ্রামের এক যুবক ব্রিটিশ শাসিত মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। তিনি ছিলেন জাহাজের নাবিক। মালয়েশিয়ায় অ্যালোর সেটর গিয়ে এক মালয় রমণীর সঙ্গে সম্পর্কে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরেই জন্ম নেন মোহাম্মদ ইস্কান্দার। আর এই মোহাম্মদ ইস্কান্দারের ছেলেসন্তান হিসেবে জন্ম নেন মাহাথির মোহাম্মদ। সেই হিসাবে চট্টগ্রাম হচ্ছে মাহাথির মোহাম্মদের পূর্বপুরুষের দেশ এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশি রক্ত তার শরীরে বহমান।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে