প্রবাসে নির্বাচনী হাওয়া ও ভোটাধিকার

  নুর মোহাম্মদ (নুর)

০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

নুর মোহাম্মদ
প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে এগিয়ে দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই, বিশেষকরে যোগাযোগমাধ্যমকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেই অগ্রযাত্রাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া যেকোনো কিছু পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে অনায়াসে। পাঁচ বছর আগে মানুষ ভাবেনি লাইভ স্ট্রিম (live stream) বা সরাসরি সম্প্রচার করার মতো একটি অভিলাষী সুযোগ হাতের নাগালে অনায়াসে সহজলভ্য হবে।

বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। মূলধারার টিভি মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, মুদ্রিত মিডিয়া সবকিছু ডিজিটাল ফরমেটে চলে গেছে মানুষের আঙ্গুলের স্পর্শে। প্রযুক্তির সেই সুবাদে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আর সেই অর্থে প্রবাসী নয়। তারা দেশের সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত। দেশের সমস্ত খবরাখবরে হালনাগাদ থাকে প্রবাসীরা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশে থাকা মানুষের চেয়ে অনেকটা বেশি, যদিও তাদের দৈহিক অংশগ্রহণ থাকছে না।

নির্বাচন আসলে আমাদের দেশে চায়ের দোকানগুলো পার্টি নির্বাচনী অফিসের প্রক্সিতে পরিণত হয়, চায়ের দোকানের পুরনো অর্ধ-ভাঙা কাপগুলোও যেন সচল হয়ে উঠে। দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদেশের মাটিতেও বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় চায়ের দোকানগুলো সেসব আমেজের ছোঁয়া লেগেছে। বিশেষ কোনো প্রার্থীর আলোচনা কম হলেও সার্বিক নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা প্রতিনিয়ত চলছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কে-কত সিট পেতে পারে, কে পরবর্তী সরকার বানাবে এসব নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

দেশের মতো বিদেশেও আলোচনায় অগ্রাধিকার তালিকায় আছে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি জোট। এতদিন ধরে আলোচনার সিংহভাগ জুড়ে ছিল দেশের তারকা রাজনৈতিকদের দল পরিবর্তনের বিষয়টি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর সেই আলোচনার কিছুটা ভাটা পরেছে। ইতিমধ্যে প্রবাসে অবস্থানরত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নানারকম সভা-আয়োজনের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ দলের প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মোটের ওপর বলতে গেলে, সকল প্রবাসীরা সোশ্যাল মিডিয়াতে সক্রিয়। তাই প্রবাসীরা নিজ নিজ দলের পক্ষে উত্সাহ, উদ্দীপনা, উত্তেজনা, প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে দেশে থাকা রাজনৈতিক সতীর্থদের।

প্রবাসীদের একটা চুম্বক অংশ প্রতিবারের মতো নির্বাচন উপভোগ করতে ইতিমধ্যে দেশে গিয়ে পৌঁছেছে বা যাওয়ার প্রস্তুতিতে আছে। প্রবাসীদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন স্বরূপ প্রতিবারের মতো এবারও ডজন খানেক প্রবাসী একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় প্রবাসী রাজনৈতিক কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমান্বয়ে, সঙ্গে বাড়ছে তাদের অবদানও অংশীদারিত্ব।

রাজনৈতিক সচেতনতার কথা বিবেচনায় নিলে প্রবাসীরা দেশে থাকা রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে এবং যৌক্তিকও বটে। রাজনৈতিক সচেতনতার কারণেই প্রবাসে বসেও তৈরি হচ্ছে এক ঝাঁক ইতিবাচক নেতৃত্বের যারা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমান্তরাল ভূমিকা রাখতে সহায়ক।

প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি পৃথিবীর ১৪২ দেশে ‘প্রবাসী’ হিসেবে অবস্থান করছে। প্রতি বছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে সেসব প্রবাসীরা দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিচ্ছে। পৃথিবীর চারপাশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাই বাংলাদেশ ও লাল সবুজের পতাকাকে পরিচিত করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের রাজদূতখ্যাত এসব প্রবাসীদের হাতে সবুজে মোড়ানো পাসপোর্ট থাকলেও সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করার মতো তাদের ভোটাধিকার নাই। অধিবাসী, আদিবাসী কিংবা প্রবাসী নির্বিশেষে প্রত্যেক বাংলাদেশি ভোট-যোগ্য মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। সেই দিক দিয়ে ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ব্যবস্থা নিতে না পারার অসামর্থ্য এবং উদাসীনতা দুটাই তাদের। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক কোটি ভোটযোগ্য ভোটারের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা।

নুর মোহাম্মদ : কলামিস্ট ও রাজনীতিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে