যে কোনো উপসর্গ রোগের একটি পূর্বাভাস মাত্র

  অদ্বৈত মারুত

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০১:০৫ | অনলাইন সংস্করণ

দাঁত ও মুখগহ্বরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় কমবেশি অনেকেই আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে একটু সাবধানী হলে সহজেই এ সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করা যায়। দাঁত ও মুখগহ্বরের বিভিন্ন অসুখ, এসবের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয় সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তায়েফ ডেন্টাল হাসপাতালে কর্মরত বাংলাদেশি দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিকদার নাজমুল হক-এর কাছে। ইমেইলে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন অদ্বৈত মারুত

অদ্বৈত মারুত : দাঁত ও মুখগহ্বরের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য রোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কী?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : জি, সম্পর্ক রয়েছে। মাড়িরোগ শরীরের অন্যান্য রোগের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ও তীব্রতা বাড়িয়ে তোলে। মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রার মাড়িরোগ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে তোলে। বাড়িয়ে তোলে ডায়াবেটিসের মাত্রা। শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। অকাল প্রসব ও স্বল্প ওজনের সন্তান প্রসবে ভূমিকা রাখে। খাবারের যথাযথ হজমে বাধা সৃষ্টি করে। তাই বলা হয়ে থাকে, সুস্থ দাঁত ও সুস্থ মাড়ি না থাকলে সত্যিকার অর্থে আপনি স্বাস্থ্যবান নন।

অদ্বৈত মারুত : মুখগহ্বরে কী কী উপসর্গ দেখা দিলে সেসবের চিকিৎসা করা আবশ্যক?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মুখগহ্বরের কোনো উপসর্গই অবহেলাযোগ্য নয়। যে কোনো উপসর্গ রোগের একটি পূর্বাভাস মাত্র। যথাসময়ে সেসবের চিকিৎসা না করালে গুরুতর অবস্থা ধারণ করতে পারে। মুখগহ্বরে সচরাচর যে উপসর্গগুলো দেখা দেয় তা হলোÑ দাঁতব্যথা, দাঁতের সংবেদনশীলতা, মাড়ি থেকে রক্তপাত। দাঁতের গোড়া, মাড়ি, এমনকি চোয়ালে পুঁজ জমে যেতে পারে।

অদ্বৈত মারুত : মুখগহ্বরের রোগের বিভিন্ন উপসর্গের কারণগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

ডা. সিকদার নাজমুল হক : প্রথমেই বলা যাক, ব্যথার কথা। দাঁতের যে কোনো ব্যথা (হোক সামান্য বা তীব্র) তা দাঁত বা মাড়ির কিংবা মুখ গহ্বরের অন্য কোনো অংশে সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে। সাধারণত ডেন্টাল ক্যারিজ বা দাঁতের ক্ষয় বেশি গভীর হয়ে গেলে তা দাঁতের মজ্জা বা পাল্প আক্রান্ত করে। সৃষ্টি করে মজ্জা প্রদাহ বা পাল্পাইটিস। এটি দাঁতে তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করে। মাড়িতে পুঁজ হলে বা দাঁতের মজ্জা থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে দাঁতের শিকড়ের শেষ প্রান্তে জমা হয়ে সেখানে তৈরি করতে পারে অ্যাবসেস বা ফোড়া, যা তীব্র ব্যথার কারণ হতে পারে। দাঁতের আরেকটি উপসর্গ হলোÑ সংবেদনশীলতা। সাধারণত দাঁতের বাইরের আবরণ অ্যানামেল ক্ষয় হয়ে গেলে দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ঠা-া পানি পান করলে বা দাঁতে বাতাস লাগলে এমনকি মিষ্টি খাবার খেলেও দাঁত সংবেদনশীলতা প্রকাশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দাঁত শির শির করে, এমনকি ব্যথাও তৈরি করতে পারে। সাধারণত ডেন্টাল ক্যারিজ হলে, ভুল নিয়মে দাঁত মাজার কারণে, শক্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজলে, রাতে দাঁত ঘষার অভ্যাস থাকলে (ব্রাক্সিজম, উত্তেজনাবশত দাঁতে শক্তভাবে দাঁত চেপে ধরার অভ্যাস থাকলে, অমসৃণ মাজন বা পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজার ফলে পাকস্থলী থেকে মুখগহ্বরে অতিরিক্ত অম্ল উঠে এলে, অম্লের প্রভাবে দাঁতের অ্যানামেল ক্ষয় হয়ে দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তবে যেসব কারণে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে তা হলোÑ মাড়ির প্রদাহ বা জিঞ্জিভাইটিস। এ ক্ষেত্রে দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা ঠিকমতো পরিষ্কার করা না হলে এসবের সঙ্গে মুখের লালা মিশে এক জাতীয় আঠালো পদার্থ তৈরি হয়, যা থেকে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। এটির নাম ডেন্টাল প্ল্যাক। দাঁতের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা ও মাড়ির খাঁজের ভেতর জমা হয় ডেন্টাল প্ল্যাক। মূলত এ ডেন্টাল প্ল্যাকের জীবাণু সংক্রমিত হয়ে তৈরি হয় মাড়ির প্রদাহ বা জিনজিভাইটিস।

মুখগহ্বরের আরেকটি উপসর্গ হলো, অ্যাবসেস বা ফোঁড়া। এ থেকে হতে পারে মাড়িতে (জিঞ্জিভাল অ্যাবসেস), দাঁতের শিকড়ের শেষপ্রান্তে (পেরি এপিক্যাল অ্যাবসেস), হতে পারে দাঁতের শেকড়ের চারপাশে (পেরিওডন্টাল অ্যাবসেস) এমনকি চোয়ালেও দেখা দিতে পারে অ্যাবসেস (অ্যালভিওলার অ্যাবসেস)।

অদ্বৈত মারুত : মুখগহ্বরের রোগগুলোর চিকিৎসা কীভাবে করা যায়?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ সেবনে মুখগহ্বরের সমস্যাগুলোর নিরাময় সম্ভব হয় না। ডেন্টাল ক্লিনিকে গিয়ে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এটির চিকিৎসা করাতে হয়। ডেন্টাল ক্যারিজের ক্ষেত্রে, দাঁতের গর্ত আগে থেকে ফিলিং করিয়ে নিয়ে তা দাঁতটি মজ্জা প্রদাহ থেকে বাঁচানো যায়। দুর্ভাগ্যবশত যদি মজ্জা প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তা হলে দাঁতের রুট ক্যানেল করা আবশ্যক। এ চিকিৎসাটি সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। রুট ক্যানালের ক্ষেত্রে দাঁতের ভেতর থেকে সব মজ্জা একটু একটু করে বের করে আনা হয়। মজ্জাগুলো বের করে আনার জন্য ব্যবহৃত হয় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কিছু যন্ত্র। মজ্জাগুলো সব বের করা হয়ে গেলে শিকড়ের ভেতরের ক্যানালগুলো পরিষ্কার করে রবার জাতীয় উপাদান দিয়ে ক্যানালগুলো ভরাট করা করা হয়। সবশেষে দাঁতের স্থায়ী ফিলিং সম্পন্ন করা হয়। জিঞ্জিভাইটিস রোগের চিকিৎসার মূল সূত্রটি হলোÑ দাঁত থেকে ডেন্টাল প্ল্যাক পরিষ্কার করা। এ জন্য দরকার স্কেলিং করে দাঁতে জমা হওয়া পাথর সরিয়ে ফেলা, ডিপ স্কেলিং এবং ডিপ কিউরেটেজ নামক পদ্ধতিতে মাড়ির ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা, রুট প্লেনিং নামক পদ্ধতিতে দাঁতের শিকড়ে জমা হওয়া পাথর এবং বর্জ্য উপাদান পরিষ্কার করা। যেসব কারণে দাঁতে ডেন্টাল প্ল্যাক জমা হয়, সে কারণগুলো দূর করাও জরুরি।

এবার আসা যাক দাঁত শির শির করা অর্থাৎ সংবেদনশীল দাঁতের চিকিৎসার ব্যাপারে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে দাঁত শির শির করার কারণ খুঁজে বের করতে ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন। শক্ত ব্রাশের পরিবর্তে নরম ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজুন। দীর্ঘ সময় ধরে দাঁত মাজা পরিহার করুন। পর্যাপ্ত ফ্লোরাইড আছে এমন কোনো টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথ ওয়াশও ব্যবহার করা যায়। দাঁতের সংবেদনশীলতা প্রতিরোধী বিশেষ টুথপেস্টও ব্যবহার করা যেতে পারে। দাঁত শির শির করার কারণ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা সম্পন্ন করতে হবে। মুখের ভেতর অ্যাবসেস বা ফোড়া হলে ফোড়ার ভেতর থেকে পুঁজ বের করে ফেলা জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া আবশ্যক হয়। তবে ফোড়ার কারণ নির্মূল না করা হলে ভবিষ্যতে আবারও এ ফোড়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

অদ্বৈত মারুত : দাঁত ও মুখগহ্বরের অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে থাকার জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : দাঁত ও মুখগহ্বরের রোগ প্রতিরোধের জন্য দরকার প্রতিদিন সকাল ও রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দুবেলা নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা। ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা ভালো। ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথওয়াশও ব্যবহার করা যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রতি ছমাস অন্তর একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জন দিয়ে দাঁত ও মুখগহ্বর পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। এতে সহজেই দাঁত ও মুখগহ্বরের রোগ থেকে দূরে থাকা যাবে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে