পাচুর ঘুড়িখেলা

  বিএম বরকতউল্লাহ্

৩১ মে ২০১৬, ১৩:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

খবরটা শুনেই পাচুর শরীরে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। 'ঘুড়িখেলা প্রতিযোগিতা' হবে। সমুদ্র সৈকতের খোলা আকাশে ঘুড়িখেলা প্রতিযোগিতা। চলছে ঘুড়িখেলার চমৎকার আয়োজন।

তিন বছর বয়স থেকে ঘুড়ির পেছনে আঁঠার মতো লেগে আছে পাচু। এখন তার বয়স এগারো বছর। হতদরিদ্র বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে পাচু বাড়ির পাশের মাঠে ঘুড়ি নিয়ে খেলা করছিল। ঘুড়িখেলা প্রতিযোগিতার কথাটা শোনার পর খবরটা মাকে বলার জন্য লাটাই-ঘুড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে পাচু। চলার পথে তার চঞ্চল পায়ের আঘাতে পথের ঢেলা, ধুলো আর শুকনো গোবর চারদিকে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে পালাতে লাগল।  

পাচু নিজেই ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়ায়। অসংখ্যবার সে ঘুড়ি বানায় আবার অসংখ্যবার ছিড়েও ফেলে। ঘুড়ি তার মনমতো না হলে, তার কথা না শুনলে সে অবাধ্য ঘুড়িকে আর ঘরে এনে রাখে না। অবাধ্য ঘুড়িকে সে টুকরো টুকরো করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবার তৈরি করে নতুন ঘুড়ি। এমন করে করে পাচু ঘুড়ি বশ মানিয়ে তার মতো করে আকাশে ঘুড়ি উড়ায়। পাচুর আকাশে ঘুড়ির খেলা দেখে এলাকার লোকেরা বলাবলি করে- ‘পাচুর ঘুড়ি জাদু জানে। তার ঘুড়ি শুধু সুতার টানে হাওয়ায় ওড়ে না; ঘুড়ি খেলা করে পাচুর কথায়।’

এগারো বছরের পাচু ‌'ঘুড়িবাজ পাচু' নামে এলাকায় পরিচিত।

দুই.
আজ প্রতিযোগিতার দিন। পাচু এক হাতে ঘুড়ি আরেক হাতে লাটাই নিয়ে ছুটে চলে এসেছে সমুদ্র সৈকতে। আজ সমুদ্র সৈকত অন্যদিনের মতো নয়। মনে হচ্ছে অসংখ্য রঙধনুর রঙ মেখে সমুদ্র সৈকতটা সাজানো হয়েছে। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান 'ঘুড়িখেলা প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করেছে। তারা তাদের মনের মতো করে সাজিয়েছে সৈকত। দেখলে মনে হবে এটা একটা স্বপ্নপুরী। দেশ-বিদেশের অসংখ্য নামিদামি মানুষের পদচারণায় মুখরিত সমুদ্র সৈকত। আকাশে উড়ছে ঘুড়ি। মনে হচ্ছে রঙের খেলা চলছে আকাশে। সমুদ্র সৈকতের চিকচিক বালিতে রঙবেরঙের পোশাক পরা ঘুড়িবাজদের আনন্দ হৈচৈ। আর আকাশে অসংখ্য ঘুড়ির আনন্দমেলা।

সমুদ্রপাড়ে এসে পাচুর আনন্দ যেন উবে গেলো। নামিদামি মানুষ আর নানা রঙের ঝালর লাগানো ঘুড়ি দেখে পাচু থ হয়ে গেল। আকাশে নানা রঙের মানুষঘুড়ি, পশুপাখিঘুড়ি, চেনা-অচেনা মাছঘুড়ি উড়ছে, খেলা করছে। পাচু তার দুই টাকার রঙিন কাগজে বানানো ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই প্রতিযোগিতায় কি সে তার ঘুড়ি উড়াতে পারবে, পাবে কি অনুমতি, সে দেখাতে পারবে কি তার ঘুড়িখেলা!

পাচু তার ঘুড়িটা নিয়ে এক কোনে বসে আছে। সে মনে মনে বলে, 'এহ্, এগুলো কোনো ঘুড়িখেলা হলো? এই খেলা দেখেই তারা এতো লাফালাফি করছে? আর আমার ঘুড়িখেলা দেখলে না পাগল হয়ে যাবে তারা!'

খেলা প্রায় শেষের দিকে। পাচু তার ঘুড়িটা এক হাতে বুকে চেপে ধরে আরেক হাতে লাটাই নিয়ে সোজা চলে গেলো আয়োজকদের কাছে। সে গিয়ে বলল, ‘স্যার আমি ঘুড়িখেলা দেখাব।’ আয়োজকদের একজন ময়লা জামা পরা পাচুর আপাদমস্তক দেখে একটু অবহেলা করেই বলল- ‘তুমি দেখাবে ঘুড়িখেলা? হা-হা-হা...।’

পাচু দমল না। সে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল- ‘জি, স্যার। আমার ঘুড়ি অনেক খেলা জানে। দেখলেই বুঝতে পারবেন। দয়া করে আমার নামটা লেখুন না স্যার।'

একজন মাথা ঝাকিয়ে বলল- ‘তোমার ঘুড়ি আবার কী খেলা দেখাবে বাপু।’

‘আমার ঘুড়িখেলা দেখে আপনাদের তাজ্জব লেগে যাবে। অনুমতি দেন। আমি এখনই খেলা দেখাই। দেখেন কী খেলা দেখাই।’

আয়োজকরা প্রতিযোগী হিসেবে পাচুর নাম খাতায় তুলল এবং বলল- ‘দেখাও দিখি তোমার খেলা।’

তিন.
পাচু তার দক্ষ হাতে ঘুড়িটা সামনে ছুড়ে মেরেই হাতের লাটাইটা মেসিনের মতো খলখল শব্দে ঘোরাতে লাগল। দেখতে দেখতে তার ঘুড়িটা এঁকেবেঁকে ওপরে উঠে গেল। সমুদ্র সৈকতের বালিতে পাচুর ছোট ছোট দুটি পা ঘুড়ির সাথে তোলপাড় করছে। আকাশের ঘুড়িটা পাচুর লাটাইয়ের খলখল শব্দের সাথে খেলা দেখাচ্ছে।

পাচু মুখে শিশ মেরে কি যেন একটা ইঙ্গিত করতেই তার ঘুড়িটা ওপর থেকে গোত্তা খেয়ে চলে আসে নিচে ঠিক মাটির কাছাকাছি। আবার পাক খেতে খেতে উঠে যায় ওপরে। পাচু শিশ দিতে দিতে কি একটা ইঙ্গিত করে আর তার ঘুড়িটা ডানে-বামে চঞ্চল বেগে ছোটাছুটি করতে থাকে। তারপর পাচুর সাথে তার ঘুড়িটাও ডানে-বামে কাৎ হয়। হঠাৎ করে ঘুড়িটা বাজপাখির মতো শোঁ শোঁ করে নিচে নেমে আসে আবার তীরবেগে ছুটে চলে ওপরের দিকে। পাচুর লাটাই চালানোর কারুকার্য দেখে সবাই অবাক। আকাশে পাচুর ঘুড়ি আর মাটিতে পাচু ও তার লাটাইয়ের নৃত্য একসুতায় গ্রন্থিত হয়ে এমন এক নাচ আর ছন্দ-তাল তুলেছে যে সৈকতের শত শত মানুষের চোখ পড়ল গিয়ে পাচুর ঘুড়িখেলার দিকে।

চারদিকে হই হই রব উঠল। পাচুর অদ্ভুত ঘুড়িখেলা দেখতে ভিড় জমে গেল।
হঠাৎ তার ঘুড়িটা খোড়াতে খোড়াতে চলে এল পাচুর কাছে। আবার ঢেউ খেলে চলে গেল অনেক ওপরে। এক অদ্ভুত কাণ্ড! তার ঘুড়িটার খেলা দেখলে মনে হবে একটা দক্ষ শিকারী পাখি পাচুর ইশারায় আকাশে খেলা দেখাচ্ছে। অসংখ্য মানুষের করতালি আর আনন্দ হই চইয়ের মধ্যে আয়োজকরা হাসিমুখে গর্বিত ভঙ্গিতে পাচুর পাশে এসে দাঁড়াল। তাদের ভাবটা এ রকম যে, এই অদ্ভুত ও অভূতপুর্ব ঘুড়ি খেলোয়াড়কে আমরাই জোগাড় করে প্রতিযোগিতায় আনতে পেরেছি।

সবশেষে আয়োজকরা বলল- ‘ঘুড়িটা সোজা ওপরে তুলে সোজা পথে নামাতে পারবে পাচু?’
'এইটা কোনো ব্যাপারই না স্যার, দেখেন ক্যামনে নামাই।' লাটাই ঘোরাতে ঘোরাতে বলল- পাচু।

সে অদ্ভুত ভঙ্গিতে লাটাই চালাতে লাগল। চোখের পলকে তার ঘুড়িটা পন্পন করে একদম ওপরে উঠে গেল। একেবারে সোজা ওপরে। আয়োজকরা ওপরের দিকে হা-করে তাকিয়ে দেখে বলে- 'ওয়াও!'

পাচু লাটাইটা এমনভাবে ঘোরাতে লাগল যে, তার ঘুড়িটা ঠিক হেলিকপ্টারের মতো ওপর থেকে সোজা নিচে নেমে এল। একদম তার হাতে। আনন্দে লাফিয়ে উঠল আয়োজক ও দর্শকরা। সবাই বলছে- 'এমন ঘুড়িখেলা আমরা জীবনেও দেখিনি!'

আয়োজকেরা পাচুকে ধরে টেনে নিয়ে গেল মঞ্চে। সবার মাঝখানে বসাল তাকে।
পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শুরু হলো।

আয়োজক দলের প্রধান অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে পাচুর অদ্ভুত ও অপূর্ব ঘুড়িখেলার প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক প্রশংসা করলেন এবং পাচুকে শ্রেষ্ঠ ঘুড়িখেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা দিলেন। ঘুড়িখেলায় শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার পেল পাচু। পুরষ্কার হিসেবে তার হাতে তুলে দেওয়া হলো সনদপত্র, মেডেল আর নগদ এক লাখ টাকা। কৌতূহলী লোকেরা ছোট্ট ঘুড়িবাজ পাচুকে কাঁধে তুলে নিল এবং আনন্দ মিছিল নিয়ে প্রবেশ করল পাচুর গ্রামে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে