একটি ‘ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক’ খবর

  জাকির হোসেন তমাল

১৪ জুন ২০১৮, ২০:০৩ | আপডেট : ১৪ জুন ২০১৮, ২১:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

সুমন জাহিদ। ছবি : ফেসবুক থেকে নেওয়া
আজকের দিনটা শুরু হয় একটি ‘ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক’ খবর দিয়ে। সকাল পৌঁনে ১০টার দিকে ফোনে কথা হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুর সঙ্গে। সে ট্রেনে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসছিল। ফোনে জানাচ্ছিল, মাথা বিচ্ছিন্ন একটি দেহ লাইনের পাশে পড়ে আছে। তার পাশে বিচ্ছিন্ন মাথাটিও ছিল। চলন্ত্র ট্রেন থেকে তার হঠাৎ চোখ যায় বাইরে। তখনই লাশটি দেখতে পায় সে। ওটা দেখে সে বেশ ভয় পেয়ে যায়।  

ওই লাশটি কার-তা জানা যায় দুপুরের পরে। দ্বিখণ্ডিত লাশটি সুমন জাহিদের। তিনি একাত্তর সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ে রেললাইনের পাশে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েছিল লাশটি।  

ব্যাংক কর্মকর্তা সুমন জাহিদ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। বিচারে যুক্তরাজ্যে পলাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক আশরাফুজ্জামান উভয়কেই শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বন্ধু বলছিল, ট্রেনে কাটা পড়লে লাশ যেমন ক্ষতবিক্ষত হয়, ওটা তেমন ছিল না। ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে ফেললে যেমন হয়, লাশটি নাকি তেমন ছিল। ট্রেনের অন্য যাত্রীরাও নাকি তেমনটাই মনে করেছেন।

সুমন জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় ২০১৬ সালে। একুশে টিভির জন্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করতে গিয়েছিলাম তার সাক্ষাৎকার নিতে। রাত প্রায় ১১টার দিকে তার সাক্ষাৎকার নিয়ে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। মাত্র কয়েক ঘণ্টার কথায় বুঝেছিলাম, তিনি অনেক শান্ত স্বভাবের মানুষ। তার সন্তানের সঙ্গেও ওই রাতে পরিচয় হয়েছিলাম। সাক্ষাৎকার শেষে জাহিদ ভাই জোর করে নাস্তাও করিয়েছিলেন আমাদের।   

ওই দিন জাহিদ ভাইয়ের কথায় ঠিকরে পড়ছিল দেশপ্রেমবোধ। মায়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে তার চোখ বারবার ছলছল হয়ে উঠছিল। একাত্তর সালে তার মাকে বাড়ি থেকে কীভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন জাহিদ ভাই। একাত্তর সালের ১৩ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশকে অস্বীকারকারী গোষ্ঠির সদস্যরা। এরপর সেলিনা পারভীনের যখন খোঁজ মেলে তখন তিনি আর জীবিত ছিলেন না। দেশ স্বাধীনের একদিন পর ১৮ ডিসেম্বর ক্ষতবিক্ষত লাশটি শনাক্ত করে তার পরিবারের সদস্যরা। সেলিনা পারভীনের নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিনের উৎকণ্ঠা যে ওই পরিবারের জন্য কী ভয়াবহ ছিল, তা অনেক বছর পরেও জাহিদ ভাইয়ের কণ্ঠে ফুঁটে উঠেছিল।   

সেই বর্ণনা শুনে কখন যে নিজের অজান্তেই চোখে পানি এসেছিল বুঝতে পারিনি। সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল যেদিন তার মায়ের লাশ শনাক্ত করা হয়েছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে।

আজ পত্রিকায় সেই জাহিদ ভাইয়ের দ্বিখণ্ডিত লাশ উদ্ধারের খবর দেখার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা ‍কেঁপে উঠেছে। জাহিদ ভাইয়ের লাশ উদ্ধরের খবরটি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। জাহিদ ভাই একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। তার আগে তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।      

ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সুমন জাহিদের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি,ট্রেনে কাটা পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে।’

তবে সুমন জাহিদকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। তার বড় ভায়রা এটিএম এমদাদুল হক বুলবুল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কে বা কারা জাহিদকে উত্তর শাজাহানপুরের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপরই রেললাইনের পাশে তার লাশ পাওয়ার খবর শোনা যায়। সুতরাং তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’ 

জাহিদ ভাইকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি অন্যভাবে মারা গেছেন, সেটা পুলিশ খুঁজে বের করবে। কিন্তু আমাদের কাছে এখন জাহিদ ভাই এই পৃথিবীতে নেই, এটা ‘ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক’ খবর। জাহিদ ভাইয়ের মতো লোকের লাশ যদি দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে অন্যদের কী হবে?

যদি জাহিদ ভাইয়ের পরিবারের দাবি সত্য হয়, তাহলে একটা কথাই বলতে হবে, পরাধীন দেশে অনিরাপদ ছিল এই জনপদ। তাহলে স্বাধীন দেশে আমরা কি এখন নিরাপদ?  

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে