আমি কেঁদেছি হলের শাওয়ার ছেড়ে, অঝরে

  নাদিরা সুলতানা নদী

০৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩৩ | আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৮, ১১:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

নাদিরা সুলতানা নদী। ছবি : ফেসবুক থেকে নেওয়া

কন্যা শিশু, কিশোরী বা তরুণী-এমনকি কিশোর ছেলেদের প্রতি যেভাবে যৌন সন্ত্রাস হচ্ছে আমার বাংলাদেশে, হাঁটে-ঘাটে, স্কুলে! আজকাল তার প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি। আর কী বলা যায়, কাকে বলা যায়!

এইসব ভাবতে ভাবতে জীবনের নানাচাপ নিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যে চোখ ফেলি গাছ ফুল লতা-পাতাতে কিছু সময় আমি ইচ্ছে করেই কিচ্ছু দেখি না, পড়ি না। কারণ মাঝেমাঝেই নিঃশ্বাস নিতে পারি না, এমন সব খবরে!

তারপরও দম নিয়ে ফের আসি স্বাভাবিক জীবনে। একটু আধটু লিখি, প্রকাশ করি ক্ষোভ। কাছের অনেকের মতামত জানা হয়, চেনা হয় অনেককেই ভিতর থেকে নুতন করে। শেষমেষ কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়াও জানিয়ে ফেলি, নিজেকে করি একটু নির্ভার বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে নিজের স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখতে। আবার জেগে উঠে বলি, মেয়ে জনমের গুমড়ে থাকা কষ্টগুলো মুছতেই হবে, আর নেওয়া যায় না।

কন্যা শিশু, কিশোরী, তরুণী বা মাঝবয়েসী অনেক নারীকেই বাংলাদেশে এক জনমে শুধুমাত্র শারীরিক অবয়বের জন্যে সারাটা জীবন যে কতভাবে কত জায়গায় কী ভীষণ তটস্ত হয়ে চলতে হয়। অনেক সাবধানতার পরও কতভাবে যে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা হয়রানির শিকার হতে হয়, তা নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেয়েদের একটু বেশিই জানা আছে।

আমি নিজেও এদেরই একজন, আমারও আছে বেশ লম্বা একটা ধূসর কালো সময়, সেই কিশোরী আমি গ্রামে ছিলাম, উটকো চিঠি, পাড়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবারের ছেলের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি। সব সময় পরিবার পাশে ছিল। সব কাটিয়ে উঠে শহরে স্কুলে পড়তে এসেছি, ময়মনসিংহ শহরের যে পাড়ায় থাকতাম সেখানেও টানা দুই-তিন বছর পাড়ার সবচেয়ে বাজে ছেলেদের কত রকমভাবে যে হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে। একাই সামলে নিয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, আর ছেলেদের ঘৃণা করতে করতে স্কুলে-কলেজ জীবন পাড়ি দিয়ে ফেলেছি!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প অনেক বর্ণাঢ্য। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার বাস-ট্রেনে একটা সময় পর একাই যাওয়া আসা করতে হতো। কমলাপুর রেলস্টেশনে নেমেই কৌশলে মিশে যেতে হতো কোনো না কোনো পরিবারের সঙ্গে। আমি একা নই, এটা বুঝাতে রীতিমতো ভাবতে হতো! আহ কত রকম কৌশল, নিজের মতো করেই বানিয়ে নিতে হয়েছে, ছোট্ট একটা শরীর বাঁচাতে! আজ লিখতে বসে নিজেরই চোখ ভিজে উঠছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছি শুরু থেকেই। প্রায় সারা দিনই অনেকগুলো ছেলেমেয়ে, তবে বেশিরভাগই ছেলেমানুষ নিয়েই চলেছি, ফিরেছি, খেয়েছি। আর নিজের সব হারানো বিশ্বাসকে মজবুত করেছি একটু একটু করে। সন্ধ্যাবেলা পুরানা পল্টনে দলের অফিসে যেতাম মাঝেমাঝেই। কারো সঙ্গে চলতে গিয়ে মনে হয়নি, আমি শুধুই একটা ‘মেয়েমানুষ’!

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আমি। একদিন সহকর্মী ছোট ভাইকে নিয়ে পল্টনের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি রিকশার জন্য। বেশ ভীড়। হঠাৎ মনে হলো, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো হাত আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলো!

অনেকদিন পর আরেকবার আমি শুধুই একটা ‘মেয়েমানুষের শরীর হয়ে উঠি’! সেদিনের মতো মন খারাপ অনেকদিন হয়নি। হায়! বাইরের সব ছেলেই কী এমন বিকারগ্রস্ত! আমি কেঁদেছি হলের শাওয়ার ছেড়ে অঝরে, অলক্ষ্যে, ক্ষোভে ফুঁসেছি, আর শেষমেশ সব সময়ই জেনেছি, বাইরের বেশির ভাগ পুরুষ এমন অসুস্থ।

চাকরি জীবনেও রাস্তায় চলতে গিয়ে পেয়েছি কত শত বিকৃত পুরুষের আকার! একটা ছেলে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বড় হয় তার পেছনে থাকে, পারিবারিক শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম ও আমাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাঝে আছে নারীও। বিশেষ করে বাংলাদেশে ‘মেয়েমানুষের চলাফেরা’ কী হওয়া উচিত, এটা যে সবার ভাবনার বিষয় না, এই নিয়ে যে একটা আলাদা ভাবনার জগৎ থাকতেই হবে। বিশেষ করে পুরুষদের, এটা যে ঠিক না, সভ্য না ব্যাপারটা, সেটাই, মনে হয় না আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবো !

খুব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যায় গত বছর রাজধানীর বনানীতে। এ বিষয়েও আমরা একমত নই, মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছে কি-হয়নি তারও আগে, রাত কত হয়েছিল, কেন গিয়েছিল-এই প্রশ্ন কিশোর-যুবা-তরুণ-নারী নির্বিশেষে আমার বাংলাদেশে আজও আছে এবং থাকবে বলেই মনে হচ্ছে আরও অনেক দশক!

ভাবছি,নিপীড়কদের থামাতে আমরা কী করব, কী করছি? যারা পড়ছেন তারাও আজ আরেকবার ভাববেন কি? কী  কী করতে পারি আমরা, যে-যার জায়গা থেকে। আমরা কি আর সুস্থ-সুন্দর স্বাভাবিক নারীবান্ধব পরিবেশই পাব না, নিরাপদে চলার জন্য কোথাও বাংলাদেশের?

আজ শেষ করি, নিজের একটা প্রবাসী অনুভূতি দিয়ে। যখন তখন চোখ ভিজে যাওয়ার রোগ আছে আমার। প্রবাসী জীবন বেছে নেওয়ার পর এটা আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পর একদিন কাছের একটা পরিবারের সঙ্গে রাতের খাওয়া-দাওয়া আড্ডা দিয়ে গাড়ি করে ফিরছি। এখানকার প্রায় শেষ রাত, তিনটা বা চারটা হবে বোধ হয়। রাস্তা ফাঁকা, তারপরও ট্রাফিকে লাল লাইটে থেমে নিয়ম মেনেই ফিরছি।

এখানে মাঝরাতে রাস্তার যেকোনো সংস্কার কাজ সেরে ফেলা হয়। কোনো এক ট্রাফিকে আমাদের গাড়ি থেমেছে, হঠাৎ আমাদের পাশে এসে থামে একটা ট্যাক্সি। অপরূপ এক তরুণী গান শুনে মাথা দুলাতে দুলাতে ড্রাইভ করছে, আমি হাসি বিনিময় করি। রাস্তার অন্যপাশে তাকিয়ে দেখি, কাজ করছে রোডস মেইন্টেইনেন্স এ যে কজন তার মাঝেও দুইজন তরুণী, কি যে ঝকঝকে তকতকে হাসিখুশি!

বাংলাদেশ থেকে আসা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আমি। এসেছিও নুতন। মেয়ে হলেই কত জায়গায় কতভাবে জীবন গুটিয়ে নিতে হয়, দেখেছি আমি! সেই আমি এটা ঠিক, বিদেশ জীবনে আসতে চাইনি, আমার নিয়তি আমাকে টেনে এনেছে। কিন্তু সত্যি বলছি, সেই রাতে আমি চোখ ভিজিয়েছিলাম সভ্য একটা পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে। আমিও মুক্ত বাতাস নিতে পারছি ক্ষণিক হলেও সে আনন্দে। 

আমার সোনার বাংলায় কেন হবে না? কেন তবে সব আবেগ নিয়ে গাই, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’ গাইতেই তো চাই, চোখে নিয়ে আনন্দাশ্রু!

মেয়েজনমকে নিরাপদ না রাখতে পারলে তো একটা দেশকে সভ্যতার মানদণ্ডেই আনা যায় না। কেন বাংলাদেশে এমন বিচিত্র নির্মম সব ঘটনা সামনে আসছে বারবার? আর একটাও শুনতে চাই না, না কিছুতেই না।

নাদিরা সুলতানা নদী : মেলবোর্ন, ভিক্টোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে