শিক্ষক-এমপির বিবেকের ‘অসারতা’

  জাকির হোসেন তমাল

১২ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৪২ | আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০১:১২ | অনলাইন সংস্করণ

একটি ভিডিও এখন অনেকের ফেসবুক পাতায় ঘুরছে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে বিভিন্ন সমালোচনাসূচক শব্দ জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে একজন জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।    

ভিডিওটি যশোরের চৌগাছা উপজেলার এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যাললের একটি অনুষ্ঠানের। স্কুলের নতুন একটি ভবনের উদ্বোধন করা হয় বৃহস্পতিবার। ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মনির। তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ওই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিলেন এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই।

ভিডিওতে দেখা যায়, এমপি মনিরুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের নেতারা একটি কক্ষের মধ্যে চেয়ারে বসে আছেন। তাদের বরণ করতে স্কুলের পোশাক পরা একদল ছাত্রী ফুল হাতে অতিথিদের সামনে এসে দাঁড়ান। তারপর বাজানো হয়, ‘ধন, ধান্য পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা...’ গানটি। সেই গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চেয়ারে বসা অতিথিদের সামনে ফুল হাতে নিয়ে ছাত্রীরা ওঠাবসা করছে। ছাত্রীরা ফুল হাতে করজোড়ে প্রণামের মতো করে মাথা নতো করে সেই কাজ করছিল। আর পাশ থেকে স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রীদের তা শিখিয়ে দিচ্ছিলেন।

শিক্ষকের এমন শিক্ষা কেউ কামনা করে না। একজন এমপি বা অন্যদের সামনে এভাবে মুর্তির মতো শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া মোটেও সঠিক হয়নি। এই ছাত্রীরাই একদিন দেশ চালাবে। লাল-সবুজের পতাকা বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাবে। এমন বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সী মেয়েরা ফুটবল-ক্রিকেটে দেশের সম্মান এনে দিচ্ছেন। কিন্তু তাদেরকে শিক্ষকরা যদি এমপিদের সামনে মাথা নতকরা শেখান, তাহলে সেই শিক্ষা তাদের কতদূর নিয়ে যাবে?

একটি সুন্দর সমাজ শিক্ষা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। শিক্ষার আলোয় সমাজ নিজের জ্যোতি ছড়ায়। আর সেই প্রদীপ জ্বালানোর প্রধান কাজটি করেন শিক্ষকরাই। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে যা শেখান, শিক্ষার্থীদের জীবনে তারই প্রতিফলন ঘটে। সমাজে সেই প্রতিবিম্ব উদ্ভাসিত হয়। শিক্ষকরা সব সময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, ভালো, সুন্দরের শিক্ষা দেবেন, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু যশোরের ওই শিক্ষক যেভাবে এমপিসহ অন্যদের কুর্নিশ করানোর শিক্ষা দিলেন, তা কল্যাণকর শিক্ষা হতে পারে না। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ বলে যে শিক্ষার কথা প্রচার করা হয়, এটা সেই শিক্ষা নয়। একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলামের উচিত ছিল, শিক্ষকদের এমন আয়োজনের প্রতিবাদ করা। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। উল্টো ছাত্রীদের থেকে কয়েকটি মালা তিনি গলায় পুড়েছেন।

শুধু তাই নয়, দেশজুড়ে এমপির এমন সমালোচনার মধ্যে তিনি ওই কাজকে ‘সম্মানজনক’ বলে দাবি করেছেন গণমাধ্যমের কাছে। আইনপ্রণেতার বিবেকের এই ‘অসারতা’কে তাই দাঁড় করানো হয়েছে বিচারের কাঠগড়ায়। 

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে যশোর জেলার নাম অনেকভাবে জড়িয়ে আছে। পাকিস্তানিদের নির্যাতন থেকে পালাতে গিয়ে যশোর রোড দিয়ে অনেক শরণার্থী ভারতে গেছে। সেখানে গিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরবাড়ি হারা ওই মানুষগুলোর সেই সময়কার ‍দৃশ্যপট নিজের লেখায় এঁকেছিলেন বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। তার লেখা কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নিয়ে পরে গান করা হয়েছিল। সেই কবিতার মাধ্যেমে বিশ্ববাসী জেনেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের কথা।

সেই যশোরের একজন এমপি মনিরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যে দলটির নাম সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে সেই আওয়ামী লীগের একজন স্থানীয় নেতাও তিনি। তার কাছ থেকে সবাই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে। কিন্তু তিনি হয়তো তেমনটি করেননি।  

এমপি মনিরুল ইসলামের এমন আচরণ দেখে জীবনানন্দ দাশের কবিতার দুটি লাইন স্মরণে এলো, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,/যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;’

যারা আজ অন্ধ তারাই হয়তো বেশি দেখছেন। তাদের চোখ দিয়ে সুন্দর আগামী দেখতে গিয়ে তাই অনেকে হোঁচট খাচ্ছেন। যেমনটি হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।’ আসলেই কি সব নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে?

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে