একাত্তরের ধর্ষক-লুটেরার-নির্যাতকরা রয়ে গেছে

  জাকির হোসেন তমাল

১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:৫৯ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সাল যেমন ছিল বেদনা-লাঞ্ছনা ও দুঃখ-দুর্দশার, ঠিক তেমনি গর্ব-অহংকারের। একাত্তরে বাঙালি জাতি তাদের দেশ ফিরে পায়, ভেঙে ফেলে পরাধীনতার শৃঙ্খল। তবে রাতারাতি এই স্বাধীনতা আসেনি। অনেক প্রাণের বিসর্জন, নির্যাতন, বঞ্চনার মাধ্যমে এসেছে সেই স্বাধীনতা।

সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল লাখো বাঙালি। ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে তারা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অনেকে দেশের ভেতরেই প্রস্তুতি নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের সহায়তার জন্য পুরো দেশকে প্রস্তুত রেখেছিলেন সাধারণ জনতা। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানও কম নয়। যুদ্ধে অনেকেই প্রাণ দিয়েছেন, হেসে হেসে নির্যাতন সহ্য করেছেন। সব ধরনের অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল তাদের প্রধানতম দাবি।  

একাত্তর সালের সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সামনে খুব সহজেই কিছু বিষয় হয়তো ধরা পড়বে। একাত্তরে সমাজে বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খুব সহজেই অন্যায় করা সম্ভব হয়েছে। এই সুযোগ যেমন নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা, ঠিক তেমনি এই দেশের মানুষরাও সেই সুযোগে হত্যা-নির্যাতন ও লুটপাটে অংশ নিয়েছিল। ওই সময়ে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকরা ছিল চিহ্নিত নির্যাতন ও লুটপাটকারী। এই দুই শ্রেণির সঙ্গে পাকিস্তানিদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাদের বাইরে অনেকেই এসব কাজে জড়িয়ে পড়েছিল, যাদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের খুব কমই যোগাযোগ ছিল।

সমাজে ধর্ষকের চরিত্র বদলায়নি

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ৯ মাস দেশের শহর-গ্রামে কমবেশি অনেক স্থানেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।  কোথাও গণহারে ধর্ষণ হয়েছে, আবার কোথাও একজন করে। এই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিল পাকিস্তানি সেনারা। তাদের এসব কাজের সুযোগ করে দিয়েছিল আমাদের দেশেরই কিছু মানুষ। যারা এই দেশের সুন্দর হাওয়া গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তাকে সম্মান করতে পারেনি। একটা সময় পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের কাছে হেরে গেছে। তারা এই দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তবে তাদের সহযোগীরা এখনো রয়েছে এই বাংলায়। তাইতো এখনো তাদের সেই বিভৎস রূপ আমাদের দেখতে হয়। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সেই ধর্ষণের খবর আমাদের শুনতে হয়।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও বাংলাদেশের সমাজে এখনো ধর্ষকরা রয়ে গেছে। তাদের চরিত্র একটুও বদলায়নি। অথচ, দেশ স্বাধীনের সঙ্গে সঙ্গেই এই ধর্ষকগোষ্ঠিরও চিরবিদায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি, এটা বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য।

লুটেরার শ্রেণি রয়ে গেছে

একাত্তরে এই লুটেরার শ্রেণির কার্যক্রম ছিল বৃহৎ আকারে। তাদের উৎপাত গ্রাম-শহরে সমানভাবে ছিল। সংঘর্ষিত বা অসংর্ঘিত দুই এলাকাতেই এই শ্রেণির উদ্ভব উপস্থিতি দেখা গেছে। তাদের বড় একটা অংশ ছিল আমাদের দেশেরই মানুষ। তাদের মধ্যে যেমন ছিল বিত্তহীনরা, তেমনি ছিল বিত্তবানরাও। তারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। নিজেদের স্বার্থে তারা মানুষদের ঘরবাড়ি লুট করেছে, প্রয়োজন হলে পাকিস্তানি সেনাদের নানা তথ্য দিয়ে ওই এলাকায় ডেকে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানিরাও এই কাজ করেছে অনেক বেশি। 

একাত্তরে এই লুটেরার শ্রেণির সঙ্গে আরেকটি শ্রেণি ছিল, তারা পেশাদার ডাকাত। এই ডাকাত শ্রেণির সদস্যদের সঙ্গে পাকিস্তানি বা রাজনীতির সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না। একাত্তর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এই শ্রেণি সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাদের পেশাই ছিল ডাকাতি করা। কোথাও ধর্মের কথা বলে আবার কোথাও পাকিস্তান-বিরোধী বলে লুট করা হয়েছে, সম্পদ ডাকাতি করা হয়েছে। এই কাজে বাধা দিতে গিয়ে অনেককে প্রাণও দিতে হয়েছে। 

সবার আকাঙ্ক্ষা ছিল, দেশ স্বাধীনের পর সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। সমাজ থেকে সব ধরনের বঞ্চনা দূর হবে। এসব লুটকারী সমাজ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে যাবে। তাই তো দেশ স্বাধীনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লুটেরার ও ডাকাতদের অনেক স্থানে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও সেই শ্রেণি থেকে গেছে। আগের থেকে তাদের রূপ আরও ভয়াবহ হয়েছে বৈকি! রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের অনেকভাবে দেখছে এই দেশের মানুষ।

ভিন্নরূপে আবির্ভাব হয়েছে অত্যাচারকারীরা

এই দেশের মানুষকে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে অনেক প্রাণের বিনিময়ে। অনেক কষ্ট-নির্যাতন সহ্য করে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঘরবাড়িও হারাতে হয়েছে, এলাকা ছাড়া হতে হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাদের এসব হত্যাজ্ঞের পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে এ দেশের রাজাকার ও আল-বদররা সমানভাবে দোষী। একাত্তরে ধর্মের কারণে নানাভাবে অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছিল হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যরা। দেশের অনেক স্থানে তাদের ওপর চালানো হয়েছে গণহত্যা। তাই তো একাত্তরে পরিবার-পরিজন হারিয়ে অনেকেই ভারতে চলে যায়। প্রাণ বাঁচাতে বেছে নেয় শরণার্থীর জীবন। দেশ স্বাধীনের পর তারা ফিরে এসেছিল এই আশায় যে, তাদের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন আর হবে না, কেউ তাদেরকে আর ধর্মের কারণে হামলা চালাবে না।

কিন্তু দেশ শত্রু মুক্ত হওয়ার বহুকাল পরেও এখনো শুধু ধর্মের কারণে দেশের নানা স্থানে হিন্দুদের ওপর হামলা হচ্ছে, তাদের ওপর নির্যাতন চলছে। শুধু তারাই নয়, দেশের অনেক স্থানেই হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষ। তাদের কাউকে কাউকে জীবনও দিতে হচ্ছে। তাইতো পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে গত ৮ জানুয়ারি প্রাণ দিতে হলো জাহিদ মিয়া নামের একজন নিরপরাধ শ্রমিককে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জাহিদ ওই আন্দোলন বা বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে, শেষমেষ তার প্রাণটাই চলে গেছে।

এভাবে বলতে গেলে অনেক ঘটনা সামনে আসবে, যেখানে দেখা যাবে-দুর্বলরা সবলদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, প্রাণ দিচ্ছেন, ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। লুটপাট করা হচ্ছে পুরো দেশের সম্পদ। সেই একাত্তরে যেমন বাঙালি জাতিকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছিল পাকিস্তানিরা, ঠিক তেমনি এখনো দেশের দুর্বলদের টার্গেট করেছে সবলরা। এর বিচার একাত্তরে হয়নি, এখন হবে কি না-জানি না।

জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে