সবজি দেখে কব্জি কাঁপে

অরুণ কুমার বিশ্বাস

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

পেঁয়াজের ঝাঁজ নিয়ে কথা বলে খুব একটা ফায়দা নেই, কারণ ব্যাপারটা এখন অনেকটাই ক্লিশে হয়ে গেছে। মানে বলতে বলতে বক্তার মুখে থুতু জমলেও তাতে পেঁয়াজের দামের কোনো হেলদোল নেই। ত্রিশ টাকা কেজির পেঁয়াজ এখন দুলতে দুলতে একশ। ওই বস্তু মানুষ খাবে নাকি তাকিয়ে দেখবে, এ নিয়ে বরং বিস্তর গবেষণার অবকাশ রয়েছে।

গোত্রবিচারে পেঁয়াজ মসলার সমাজে পড়ে, তাই মসলা না হয় খানিক কম খেলুম। কিন্তু সবজি ছাড়া চলে কি! যাদের ডায়াবেটিস বা শর্করায় কড়াকড়ি, তাদের পক্ষে সবজি না খেয়ে উদরপূর্তি অনেকটাই অসম্ভব। বস্তুত, ভাত বা রুটির বদলে শাকসবজি খেয়েই তাদের পেট শান্ত করতে হয়। সেই সবজির বাজারে যখন আগুন লাগে, তখন ক্রেতাসাধারণের ভয় পাওয়ার বাস্তবিক কারণ আছে।

কী খাবেন বলুন! কথায় বলে যত খাবে সবজি, মোটাতাজা কব্জি। শীত সমাগত, অথচ শাকেরও খুব একটা সরবরাহ নেই। লালশাক বলুন বা সবুজ শাক, ছোট এক মুঠ শাক এখন পনেরো থেকে কুড়ি টাকা বিকোয় বাজারে। তার অন্তত তিন মুঠ না হলে চার-পাঁচজনের সংসারে একবেলা খাওয়াই হবে না। অর্থাৎ শাক বাবদ একুনে পঞ্চাশ-ষাট টাকা বেরিয়ে গেল। মুলা শাক দেখা যায় কিছু, তার দাম আনুপাতিক হারে কম, কিন্তু তা মনুষ্যখাদ্যের বদলে গো-খাদ্য হিসেবে চলে ভালো। এই শাকে পুষ্টিগুণের চেয়ে চিবোতে মুখে লাগে বেশি। তাই সবার পক্ষে তা খাওয়া সঙ্গত নয়। লাউ বা কুমড়ো শাকের দেখা নেই বা ভাগ্যগুণে দেখা মিললেও তার মূল্য এত চড়া যে, তাতে হাত দেওয়া বারণ। ছুঁলে নির্ঘাত হাতে ফোসকা পড়বে।

শাকের বদলে এবার সবজিতে আসুন। সবচেয়ে সস্তা ছিল একসময় কাঁচা পেঁপে। কিন্তু এখন সেই পেঁপের বাজারও অশান্ত। কোনোখানে পঁচিশ টাকা কিলো তো, অন্যখানে ত্রিশ। মাত্র একখানা পেঁপে পাল্লায় তুললেই এক কিলো ওজন। দুটো কিনলে পঞ্চাশ। ঢেঁড়শ খাবেন! তাতে বুকের পাটা থাকতে হয়। দেখতে আধমরা কিছু ঢেঁড়শ দোকানির টুকরিতে কেতরে পড়ে আছে। দাম জিজ্ঞেস করলে মশা-মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বিক্রেতা বলবে, আশি টাকা কিলো। ভাবখানা এমন যেন নিলে নেন, নইলে কেটে পড়–ন। কুছ পরোয়া নেহি। আমার ঢেঁড়শ আমার কাছেই শুয়ে থাক।

নামে বেগুন হলেও আমরা অনেকেই বেগুন খাই, বেশ পছন্দ করি। কারণ বেগুনের গুণের অন্ত নেই। নানাভাবে ও প্রকারে বেগুন খাওয়া যায়। বেগুন পোড়া, ভর্তা, ভাজি বা রান্না, যেভাবেই পাকান বেগুন খেতে মন্দ লাগে না। অথচ সেই বেগুনেও আগুন লেগেছে যেন। পোকাওয়ালা গোল বেগুনের দাম ষাট টাকা কিলো, আর একটু বাছাগোছা চেহারায় চটকওয়ালা হলে দাম আরও বেশি। নিদেনপক্ষে আশি। বেগুন খাবেন না চাটবেন, ভেবে দেখুন এবার।

মিষ্টি কুমড়ো বেশ খাদ্যগুণসম্পন্ন আনাজ। সেই অর্থে পাকা কুমড়ো এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। বরং কচি বা কালি কুমড়ো কিছু চোখে পড়ে। গোটা কুমড়ো কেনার সামর্থ্য বা ইচ্ছে বিশেষ কারো নেই। বরং এক চিলতে কুমড়ো কিনেই খুশি থাকতে হয়। দাম বাড়ার কারণে সেই এক চিলতে ছোট হতে হতে এখন এক ফালিতে ঠেকেছে। কুমড়ো নয়, যেন সরেস তরমুজ। আগে যেই চিলতের দাম ছিল খুবজোর কুড়ি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ত্রিশ বা তারও বেশি। দরাদরি করে খুব যে লাভ হয় তাও নয়। বরং বিক্রেতার তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টি দেখে একছুটে বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হয়। কিসের ছাই কাঁচাবাজার!

কাঁচকলা খাবেন ভালো কথা। কিন্তু দামের বিষয়টাও মাথায় রাখবেন। কথায় কথায় আমরা বলি, তোর ভাগ্যে কাঁচকলা। মানে খুব কিছু নয়, মন্দ কপাল। আর এখন সেই কাঁচকলার দাম গগনচুম্বী। কুড়ি টাকার কাঁচকলার হালি এখন পঁয়ত্রিশ। মেলা মুলামুলির ফলে বিক্রেতা কিঞ্চিত সদয় হলে বা কলা যদি কাঁদির নিচের দিকের হয়, তাহলে হয়তো ত্রিশ টাকায় এক হালি পেলেও পেতে পারেন। তার কমে নয়।

নধরকান্তি পটোল আর এখন দেখা যায় না, সব যেন চুপসে গেছে। কেন কেন! পটোলের মুখ শুকনো কেন! শুকোবে না! দাম শুনে ভয়ে তো আর কেউ কিনতে চায় না, তাই বেচারা পটোলের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। ধরাছোঁয়া দূরে থাক, অনেকেই ভয়ে এখন এসব সবজির পানে চোখ দেন না। দোকানির টুকরিতে পটোল শুয়ে আছে থাক, পটোল না খেয়ে কি আমরা সব ক্রেতাসাধারণ পটল তুলব? কভি নেহি!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা তাহলে খাবটা কী! আ-া খাবেন! সম্ভব নয়। পাতিহাঁসের ডিম এক হালি পঞ্চাশ চেয়ে বিক্রেতা এমন একখানা ভাব করবেন, যেন আপনাকে ভালোবেসে তিনি দাম কিঞ্চিত কম চেয়েছেন। ডিম কিনলেন, বাসায় নিতে নিতে দুটো ভাঙা নয়তো পচা। বুঝুন ঠেলা। পঁচিশ টাকা হাপিস হয়ে গেল।

করলা এমনিতেই তিতা, তারপর দাম শুনে জিভটা আরও তিতিয়ে যায়। যেন ও বস্তু না কেনাই ভালো। কিনলেই শাস্তি। কিনবেন কী করে! এক কিলো বড় করলা ষাট টাকা বিকোয়। করলার সাইজ ছোট হলে দামের সাইজ আরও বেশি। এসব নাকি অর্গানিক সবজি, বড়টা হাইব্রিড। ফুলকপি-বাঁধাকপি এখনো বাজারে সেভাবে আসেনি, তাই দাম বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। তাই বলে পুঁচকে সাইজের একখানা ফুলকপির দাম ত্রিশ টাকা! হয় কখনো! তাই বলি কী, যাদের হার্টের অবস্থা ভালো নয়, মানে টুকটাক গোলমাল করে, তাদের ভুলেও বাজারমুখো হওয়া সমীচীন নয়। দাম শুনে হার্ট হঠাৎ দাপানি দিলে একেবারেই শেষ। আর কখনো সবজির বাজারে কব্জি দেখাতে আসতে হবে না। জায়গায় ব্রেক।

এই সুযোগে শিশুরা খুব আরাম করে নিচ্ছে। বলে কিনা, সবজির দরকার নেই, ফার্মের মুরগি আনো। সবজি খেতে পচা, দামও বেশি। তাই সকাল-বিকাল-রাত্তির, শুধু মুরগি আর মুরগি। কিন্তু ওসব মুরগি যে তিনবেলা খাবেন, শরীর টিকবে তো! জানেন কি এসব মুরগির আহার কী! এই জিনিস যত কম খাওয়া যায়, ততই মঙ্গল। এত দুঃখের মাঝেও একটু সুখের খবর এইÑ মাছের বাজার কিঞ্চিত মরা এখন। সবজির মতো কব্জি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে না আপনাকে। তুলনামূলক কম দামে মাছ বিকোচ্ছে। তাও দরকষাকষি করা চাই। বাজার বুঝে মাছ কিনতে হবে। মাছ স্বাস্থ্যের পক্ষেও ভালো। ফরমালিনের কাহিনি খুব একটা শোনা যায় না এখন। তাও দেখেশুনে কিনবেন, পচাবাসি খেলে পেট ছেড়ে দেবে, তখন ওষুধের দোকানে ছুটতে হবে আবার।

গুরুতর প্রশ্ন এইÑ সবজির দাম এমন চড়া কেন! সবজি কবে ক্রেতাসাধারণের হাতের নাগালে পাওয়া যাবে! সোজা প্রশ্ন কিন্তু উত্তর নেই। বন্যা একটি কারণ হতে পারে। আরও যেসব কারণ এর পেছনে আছে তা বলা বারণ। বরং বলা যায়, কৃষকের ক্ষেত থেকে শহর অবধি সবজির ট্রাক যাতে ঘাটে ঘাটে না থামে, সেই ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। না হলে মধ্যস্বত্বভোগী আর অদৃশ্য হাতের ইশারায় সবজির দাম ক্রমেই বাড়তেই থাকবে, কমতির সম্ভাবনা নেই আর। সবুজ সবজি নয়, ক্রেতারা তখন স্রেফ নিজের কব্জি কামড়ে বেঁচে থাকবে। জান বাঁচানো ফরজ বৈকি!

য় অরুণ কুমার বিশ^াস: কথাসাহিত্যিক

ও কলাম লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে