সংসদে আনিত প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজও মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস

প্রকাশ | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:৩৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রমাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বসম্মতক্রমে ধন্যবাদ জানিয়েছে জাতীয় সংসদ। পৃথিবীর অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের ওপর প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ ৫৭ সংসদ সদস্য প্রায় ৬ ঘণ্টা আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সরকার ও বিরোধী দলের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। ১৮ মিনিটে ১ হাজার ১২৩ শব্দের এই ভাষণ আজ বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ। একইভাবে বাংলাদেশের সংবিধানের অংশ। শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষায় এই ভাষণ নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিল। ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। এই ভাষণ ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। সেদিন এই ভাষণ যেমন এ দেশের মেহনতি মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছিল, তেমনিভাবে এই ভাষণ বিশে^র নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আজও এই ভাষণ বিশে^র সব মুক্তিকামী স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। এই ভাষণ কালজয়ী ও অবস্মরণীয়।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদে কার্যপ্রণালির ১৪৭ (১) বিধিতে এ বিষয়ে সাধারণ আলোচনার প্রস্তাব আনেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। প্রস্তাবে বলা হয়, সংসদের অভিমত এই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ^ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দি ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার এ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশে ও জাতির সঙ্গে আমরা গর্বিত এবং এ জন্য ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় সংসদ ধন্যবাদ জানাচ্ছে। বক্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে এ দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এই ভাষণে মুক্তির পথও দেখিয়েছিলেন। এই ভাষণ ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। সেদিন এই ভাষণ যেমন এ দেশের মেহনতি মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছিল। আজ এই ভাষণ বিশে^র নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করতে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। কিন্তু সফল হয়েছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু। এই স্বীকৃতি এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। বক্তারা ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণার দাবি জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ আজ তা প্রমাণিত হয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি ছিল অত্যন্ত প্রত্যাশিত। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ১৮ মিনিটের এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তির  মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর দীপ্ত কণ্ঠের ঘোষণাÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ কেবল বাঙালি জাতিকে আলোড়িত করেনি; বরং বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ইউনেস্কোর এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কমিটিতে ১৫ বিশেষজ্ঞ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে পাওয়া নতুন নতুন প্রস্তাবের ঐতিহাসিক দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের  ঐতিহাসিক ভাষণকে এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। তিনি বলেন, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো গত ৩০ অক্টোবর প্যারিসে সংস্থার কার্যালয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রস্তাবগুলো দুবছর ধরে নানা পর্যালোচনার পর ইউনেস্কোর উপদেষ্টা কমিটি তাদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করে। এ সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আসা ৭৮টি দলিলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ নিয়ে ডকুমেন্ট দাঁড়াল ৪২৭টি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিএনপি-জামায়াত এই ভাষণ রেডিও-টিভিতে নিষিদ্ধ করেছিল। বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রতি ইঙ্গিত করে আরও বলেন, এই দানবের দল আবার ক্ষমতায় এলেই বঙ্গবন্ধুর আবার ভাষণ নিষিদ্ধ হবে। তাই দানবীয় শক্তিকে পরাজিত করতে হবে।
কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেয়েছি। এবারও তার নেতৃত্বে পেলাম জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, প্রতিটি বাঙালি একজন যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার চেতনাকে বারবার নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের ঐতিহাসিক স্থানটিকে ধ্বংস করতে জিয়াউর রহমান সেখানে শিশুপার্ক করেছিলেন। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্রই সত্যকে আড়াল করতে পারবে না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ হচ্ছে বিশ্বের নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের অনুপ্রেরণার ভাষণ। এ ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। পাকিস্তানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কালজয়ী এই অলিখিত ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ৭ মার্চের ভাষণকে নিষিদ্ধ করেছিলেন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে এ দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এই ভাষণে মুক্তির পথও দেখিয়েছিলেন। এই ভাষণ ছিল অনুপ্রেরণার উৎস। সেদিন এই ভাষণ যেমন এ দেশের মেহনতি মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছিল। আজ এই ভাষণ বিশে^র নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এই ভাষণের আবেদন, প্রভাব, পটভূমি ইউনেস্কোর কাছে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হওয়ায় এই ভাষণটি বিশ^ ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আজও এই ভাষণ বিশে^র সব মুক্তিকামী স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রেরণার উৎস।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে নিরস্ত্র জাতি সশস্ত্র জাতিতে পরিণত হয়েছিল; জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল, বাঙালি জাতিকে ধাবিত করেছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথে। কয়েকটি বাক্যের এই কালজয়ী ভাষণে বাঙালি জাতির ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনার কথা বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল।
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি ইতিহাস বিকৃতকারী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের মুখে চপেটাঘাত। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার রণনীতি ও রণকৌশল ঘোষণা করেন, সশস্ত্র যুদ্ধের কৌশলও বাতলে দেন। এই ভাষণের পরই অসহযোগের নামে বাংলাদেশের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। এই ভাষণের ফলই হচ্ছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতা।
ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একটি মাত্র দেশ, যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণে ২৬টি বাক্যের মাধ্যমে গোটা জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছেন। এই কালজয়ী ভাষণ শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের বাঙালি জাতির অহঙ্কার ও গর্বের।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভাষণ। ১৮ মিনিটের ১ হাজার ১২৩ শব্দের এই ভাষণ আজ বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ। বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করতে বহু আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। কিন্তু সফল হয়েছিলেন একমাত্র বঙ্গবন্ধু।
আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামছুল হক টুকু, সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, জাসদের নির্বাহী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, স্বতন্ত্র সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী, বিএনএফের আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের ইসরাফিল আলম, মৃণাল কান্তি দাস, মনিরুল ইসলাম, ফজিলাতুন্নেছা বাপ্পী, সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সানজিদা চৌধুরী প্রমুখ।