অবৈধ ভবনে ফারমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখা

  হারুন-অর-রশিদ

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০১:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণসংক্রান্ত অনিয়মে জর্জরিত নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকের ভবন ভাড়ায় জালিয়াতি ধরা পড়েছে। গুলশানের জব্বার টাওয়ারে ১৩তম ফ্লোরে রয়েছে ব্যাংকটির করপোরেট হেড অফিস। অথচ ভবনটির অনুমোদন রয়েছে ৯ তলা পর্যন্ত। কিন্তু নির্মাণ করা হয়েছে ২২ তলা। ব্যাংকের কাছে অবৈধ ভবন ভাড়া দেন ব্যাংকেরই পদত্যাগী ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক ড. মো. আতহার উদ্দিন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বর্তমান সরকারের গত মেয়াদে অনুমোদন পাওয়া নতুন ৯ ব্যাংকের একটি ফারমার্স ব্যাংক। অনুমোদন পাওয়ার আগেই সাইনবোর্ড লাগিয়ে দপ্তর খুলে নিয়োগ দেওয়া শুরু করে। ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর পর বছর না ঘুরতেই ঋণ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংকটি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ধরা পড়ে, যা এখন খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
ব্যাংক চালাতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৭ নভেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হন ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। এ ছাড়া ব্যাংকটির নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক মাহবুবুল হক চিশতীকেও পদ ছাড়তে হয়। নতুন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরিচালনা পর্ষদের অন্য কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন এমডি নিয়োগ দিয়ে তার অনুমোদন চেয়েছে ব্যাংকটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্ঘাটিত অনিয়মগুলোর মধ্যে ভবন জালিয়াতি ধরা পড়েনি। গত ২০১৩ সালে রাজধানীতে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ ভবন ও স্থাপনার তালিকা নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যৌথ উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করে। উচ্ছেদ তালিকায় গুলশান অ্যাভিনিউয়ের আকাশচুম্বী ২২ তলা জব্বার টাওয়ারও ছিল। গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৩৫ নম্বর সড়কের ৪২ নম্বর প্লটে ১৩ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনের উচ্চতা ২২০ ফুট। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিধি অনুসারে গুলশান অ্যাভিনিউ এলাকায় ১৫০ ফুটের (১৫ তলা) বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ করা যায় না। ২০০৭ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।    
ক্রয়সূত্রে ওই ভবনের ১৩তম ফ্লোরের মালিক ড. মো. আতহার উদ্দিন। তবে এটির মালিক তার ছেলে বলে দাবি করেন আতহার উদ্দিন।
গত বছরের জুনে ওই ভবন ভাড়া দেন তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান ড. আতহার উদ্দিন। ভাড়াসংক্রান্ত চুক্তিনামায় ব্যাংকের পক্ষে এমডি একেএম শামীম, মালিক হিসেবে ড. মো. আতহার উদ্দিন ও সাক্ষী হিসেবে ব্যাংকের কর্মকর্তা মনিরুল হক ও জান্নাতুল ফেরদৌসী নামে একজনের স্বাক্ষর রয়েছে। ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিনামা অনুযায়ী, এই ৬ হাজার স্কয়ার ফিটের ভবনে প্রতি বর্গফুটে ভাড়া ৯০ টাকা। এই হিসাবে মাসিক ভাড়া ধরা হয় ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। চুক্তিনামার তথ্যমতে, ৩৬ মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ ১ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার অগ্রিম দিয়েছে ব্যাংক। ৯ বছরের জন্য চুক্তি করা হয়। ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে। প্রতি ৩ বছর পর থেকে প্রতিবছর ১০ শতাংশ করে ভাড়া বাড়বে।  
ড. মো. আতহার উদ্দিন বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষই জোর করে আমার কাছ থেকে ভবনটি ভাড়া নিয়েছে। সৌজন্যের খাতিরে ওই ফ্লোরে একটি কক্ষ চেয়ারম্যানকে বসার জন্য দিই। চেয়ারম্যান আমার সঙ্গে কথা না বলেই ব্যাংকের জন্য ফ্লোরটি সাজিয়ে নেয়। পরে ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে।
পদত্যাগী অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী বলেন, ভাড়া নেওয়ার সময় জানতাম না ভবনটি অবৈধ। যখন জানলাম বৈধ না হওয়া পর্যন্ত এটি ছাড়ার জন্য বলি। কিন্তু ভাইস চেয়ারম্যান (পদত্যাগী) প্রভাব খাটিয়ে ভাড়া অব্যাহত রাখেন। এমনকি তিনি প্রকৃত ভাড়ার চেয়ে বেশি পরিমাণে ভাড়া আদায় করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখার জন্য ভবন ভাড়া নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিয়ে থাকে। তবে ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন রয়েছে। সেই অনুমোদনগুলো নেওয়া আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ আছে কিনা এবং ভাড়ার বিষয়টি বাস্তবসম্মত কিনা সেটি বিবেচনা করে ব্যাংক থেকে পাঠানো প্রস্তাব অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ভবন ভাড়া নেওয়ার আগে ভবনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন দেখে ভাড়া করার জন্য সার্কুলার দিয়ে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। তাই অবৈধ ভবন ভাড়া নেওয়া ব্যাংকের জন্য আইনসিদ্ধ নয়।  
উল্লেখ্য, ড. মো. আতাহার উদ্দিন আজমত গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি ব্যাংকটির ২০ কোটি টাকার শেয়ার কেনেন। এই উদ্যোক্তা পরিচালক গত ২৭ নভেম্বর চেয়ারম্যান ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
রাজউকের নথিতে দেখা যায়, ভবনের মালিক জাতীয় পার্টির সাতক্ষীরা-২ আসনের সাবেক সাংসদ এমএ জব্বার ও তার ভাই এমএ গফ্ফার। গত ২০০৪ সালের ২১ জানুয়ারি ৯ তলা ভবন নির্মাণের আবেদন করেন। ২০০৫ সালের ২৭ অক্টোবর ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন তৈরির জন্য আবেদন করেন। ২০০৬ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজউকের বিসি কমিটিতে (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন) আবেদন উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করায় কমিটি ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী আবেদনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগেই নকশা না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর, ২০০৬ সালের ২৩ জুলাই এবং একই বছরের ৯ আগস্ট তিন দফায় নোটিশ দেওয়া হয় ভবন মালিককে। মালিকদের আবেদনের পর ২০০৭ সালের ২৮ জুন আবার বিসি কমিটিতে তা পর্যালোচনা করা হয়। কমিটি ১৫ তলা ভবনের অনুমোদন হওয়ার আগেই নির্মাণকাজ এবং নির্মাণ ত্রুটির কারণে নকশা অনুমোদন না করার সিদ্ধান্ত জানায়। ওই বছরের ১০ জুলাই আবেদনকারী রাজউকের আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে ২২ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য দাখিল করেন। কিন্তু আবেদনের সঙ্গে কোনো নকশা ফি বা জমার রসিদ দেওয়া হয়নি। ২ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ তাদের আবেদন নাকচ করে দেন। কিন্তু মালিকপক্ষ ২২ তলা ভবন নির্মাণকাজ চালিয়ে যায়।
পরে ২০১৩ সালের মে মাসে রাজউক অবৈধ ভবন ভেঙে ফেলার নোটিশ দিলে মালিকপক্ষ তার বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট করে। হাইকোর্ট প্রথমে তিন মাস এবং পরে ২০০৮ সালের ১৩ অক্টোবর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাজউকের নোটিশ স্থগিত করেন।
গত ২০১৬ সালের অক্টোবরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অবৈধ ভবন সম্পর্কিত বৈঠকে জব্বার টাওয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ৯ তলার অনুমতি নিয়ে কীভাবে ২২ তলা গড়ে তোলা হয়েছে সেই বিষয়ে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে