ভোগান্তির অপর নাম ধুলাদূষণ

  সাধন সরকার

১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:১২ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণ মূলত ধুলাবালি। শীত আসার আগেই রাজধানীতে ধুলাদূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। রোগজীবাণুমিশ্রিত ধুলাবালি শ^াস-প্রশ^াসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে নানা রোগব্যাধি সৃষ্টি করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোর, কর্মস্থলে যাওয়া নারী-পুরুষ এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা প্রতিদিন এই অবর্ণনীয় ধুলাদূষণের শিকার হচ্ছে। রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় দিনে তো বটেই এমনকি রাত পর্যন্ত চলছে এ ধুলাদূষণের যন্ত্রণা। রাস্তায় বের হলে নাকে মাস্ক ছাড়া চলা মুশকিল। কোনো কোনো রাস্তার অবস্থা এতই খারাপ যে, খালি চোখে ধুলা পর্যন্ত ঢুকছে। রাজধানীর শেরেবাংলানগর, ফার্মগেট, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, তেজগাঁও, জুরাইন, শ্যামপুর প্রভৃতি স্থানে ধুলাদূষণে অতিষ্ঠ নগরবাসী। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সেই শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অবস্থা ধুলাদূষণের কারণে সবচেয়ে খারাপ। ধুলাদূষণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ধুলাদূষণের কারণে শহরবাসীকে শ^াসকষ্ট, যক্ষ্মা, অ্যাজমা, সর্দি, কাশি, চোখের সমস্যা, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁচি, নিউমোনিয়াসহ প্রভৃতি রোগে ভুগতে হচ্ছে। ধুলাদূষণে ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে যে, ঢাকার বায়ুতে ক্ষতিকর কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ওজোন, সালফার, সালফার ডাই-অক্সাইড সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। রাজধানীর এই ধুলাদূষণের উৎস বা কারণগুলো নির্ণয় করা কঠিন কিছু নয়। যত্রতত্র উন্নয়ন কাজ ও অন্যান্য উৎস থেকে সৃষ্টি হচ্ছে এই ধুলা। আশপাশের ইটভাটার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানো, পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন তৈরির সময় তৈরি ধুলা থেকে তৈরি হচ্ছে ধুলাদূষণ।

যে কোনো বড় ধরনের নির্মাণকাজের সময় পরিবেশ সমীক্ষা করার কথা থাকলেও তা হয় কিনা সন্দেহ! আইন অমান্য করে অনেক পুরনো লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন রাজধানীতে চলছে। এসব গাড়ির কালো ধোঁয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। আশপাশের ইটভাটাগুলোয় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চিমনি ব্যবহার না করায় ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীতে ময়লা- আবর্জনা যেখানে সেখানে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেই স্তূপ অপসারণ না করে কখনো কখনো অপসারণের নামে সেখানেই আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে । ফলে তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, সিমেন্ট, ইট-সুরকি নির্দিষ্ট স্থানে বেড়া দিয়ে বা ঢেকে না রাখার ফলে ও ড্রেন পরিষ্কার করে রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ময়লায় তৈরি হচ্ছে ধুলা। ধুলাদূষণ রোধে রাস্তায় সিটি করপোরেশন থেকে পানি ছিটানোর কথা থাকলেও তা নিয়মিত দেখা যায় না।

রাজধানীর বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের সমন্বয়হীনতার কারণেও বাড়ছে ধুলাদূষণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় ধুলাদূষণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে তিনগুণ বেশি। অবস্থা এতই খারাপ যে, রাস্তার ধুলা ঘরের ভেতরেও প্রবেশ করছে। ঢাকা শহরের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই ধুলাদূষণের শিকার। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধুলা ও বায়ুদূষণের জন্য ঢাকাবাসীর বছরে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে। আবার বছরে মারা যাচ্ছে ১৫ হাজার মানুষ, যার অর্ধেকই শিশু। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন কাজের সময় দূষণ রোধে উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমাদের দেশে তা নেওয়া হয় না। জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তথ্যমতে, দেশের সাত লাখ মানুষ হাঁপানিতে আক্রান্ত। এদের অর্ধেকই শহরে বসবাসকারী শিশু।

রাজধানীর বায়ুদূষণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শহরের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অচিরেই ধুলাদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না নেওয়া হলে ধুলার দূষণ থেকে নিস্তার মিলবে না। ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশ দূষণে বিশেষ করে বায়ুদূষণে রাজধানী ঢাকা বহু আগেই মাত্রা ছাড়িয়েছে।

সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’র গবেষণায় বলা হয়েছে, দূষণজনিত মৃত্যুতে বিশে^ বাংলাদেশ শীর্ষে। জীবনমানের বিভিন্ন সূচকে ঢাকা আর কত নিচে নামলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? যে কোনো শহরের ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত পরিবেশগত বিষয়গুলোর দিকে। বায়ুদূষণ এভাবে বাড়তে থাকলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর চরম মূল্য দিতে হবে। ঢাকার বায়ুদূষণ বিশেষ করে ধুলাদূষণ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তা হলে হয়তো এমন সময় আগামীতে আসবে যখন ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

য় সাধন সরকার : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে