অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও জনগণের অংশগ্রহণ

  মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:০৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে দেশে কোনো ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ হতে পারে না। তিনি অবশ্য তার এ কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় সেটি যে ‘অংশগ্রহণমূলক’ ছিল না এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটিও যে ‘অংশগ্রহণমূল’ হবে না, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্যের অর্থ তেমনটিই দাঁড়ায়। এ কথার দ্বারা ‘একতরফা নির্বাচন’ বনাম ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ নিয়ে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন নির্দিষ্টকৃত উপাদান যুক্ত হলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির মুখ থেকে এমন একটি সুনির্দিষ্ট অভিমত ব্যক্ত হওয়াটা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু তা নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক ছিল, তেমন করে আলোচনা কেন যেন হচ্ছে না।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্যে বিএনপি খুশি হলেও আওয়ামী লীগ তাতে বিব্রত হয়েছে। এটি ছিল স্বাভাবিক। তবে বেশ আশ্চর্যের কথা হলো, পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘নাই-কথা’ নিয়ে গলা ফাটানো কোন্দল করতে কখনো দ্বিধা না করলেও বিএনপি এ নিয়ে আলোচনার কোনো ঝড় যেমন তোলেনি, আওয়ামী লীগও বিষয়টি নিয়ে তেমন ঘাঁটাঘাঁটি করেনি।

‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ বিষয়টির তাৎপর্য খুবই বিস্তৃত ও গভীর। তা কেবল এককভাবে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা বা না-করার ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়। একটি নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক’ হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্নটি বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল নয়। সে ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হলো নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণের’ বিষয়টি। বস্তুত একটি নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক’ কিনা তা বিচারের ক্ষেত্রে মৌলিক বিষয় ও মূল মানদ- হলো সেই নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ কতটা নিশ্চিত হয়েছে।

এই মৌলিক বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতির মতো বুর্জোয়া ধারার দলগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করতে নারাজ। কারণ তা করতে গেলে বর্তমানে দেশে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ খর্বিত করে নির্বাচনের নামে যে ধরনের ‘প্রহসন’ চলছে তার মুখোশ খুলে যাবে। গোটা নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার যৌক্তিকতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তা হতে দিতে চায় না। কেননা ‘গদি’ নিয়ে তাদের মধ্যে ‘গলাকাটা দ্বন্দ্ব’ থাকলেও উভয় দল নির্বাচনের নামে ‘প্রহসনের’ ব্যবস্থাই কায়েম রাখতে চায়। কারণ তারা উভয় দলই মনে করে, ক্ষমতায় থাকলে তারা তখন এই ‘প্রহসনের নির্বাচনের’ মাধ্যমে পুনরায় ‘বিজয়ী’ হওয়ার ‘ব্যবস্থা’ করতে সক্ষম হবে। এবং ক্ষমতা তো এই দুটি দলের কোনো একটি দলের হাতেই থাকবে। নির্বাচনকে অর্থশক্তির ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে পারলে ‘গদির প্রতিযোগিতার’ ক্ষেত্রে এ দুটি দলের প্রাধান্য অক্ষুণœ রাখা যাবে। ‘টাকার শক্তিতে বলীয়ান’ হওয়ার ক্ষেত্রে একচেটিয়া প্রাধান্য থাকায়, প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় দ্বিদলীয় মেরুকরণভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোতে দল দুটির একক আধিপত্য নিশ্চিত করা তাদের পক্ষে সহজ হবে। সে কারণে অর্থশক্তি-পেশিশক্তি-প্রশাসনিক কারসাজি ইত্যাদিনির্ভর বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তারা বহাল রাখতে চায়। ‘জনগণের অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন এ কারণে তাদের কাছে ভয়ের বিষয়।

‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ ক্ষেত্রে ‘জনগণের অংশগ্রহণের’ বিষয়টি যে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত সে কথাটি দেশের সংবিধানে স্পষ্ট করে ব্যক্ত করা আছে। সংবিধানের প্রথম ভাগে ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ...।’ তার পর পরই একই বাক্যে বলা হয়েছেÑ ‘এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ বুঝতে হবে যে, ‘... জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ...’ সম্পর্কে যে নির্দেশনাই থাকুক না কেন, এ কথা দ্বারা সব সময় ও সব ক্ষেত্রেই ‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ’Ñ এই মূল বিষয়টি সর্বাবস্থায় রাষ্ট্রের ‘প্রধান ভিত্তি’ বলে বিবেচিত হবে।

সংবিধানে রাষ্ট্রের ৩টি স্বাধীন ও পরস্পর সম্পৃক্ত ‘বিভাগের’ মাধ্যমে ‘জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ’ কার্যকর করার ব্যবস্থা নির্দেশিত হয়েছে। এগুলো হলো (১) নির্বাহী বিভাগ (রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, স্থানীয় শাসন) (২) আইন বিভাগ (সংসদ) (৩) বিচার বিভাগ (সুপ্রিমকোর্ট, অধস্তন আদালত)। ‘সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’Ñ এই মূল বিষয়টি কার্যকর করার এই সামগ্রিক কাঠামোর আলোকেই ‘জাতীয় সংসদ’ ও তার সদস্যদের ‘নির্বাচনের’ বিষয়টিকে গণ্য করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের পঞ্চম ভাগের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ ‘... সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে; ...।’ এর পর একই অনুচ্ছেদের (২) ধারায় বলা হয়েছেÑ ‘... প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিনশ সদস্য লইয়া...সংসদ গঠিত হইবে...।’ সংবিধানের সপ্তম ভাগে ১১৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন ‘... সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং... সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন ...।’

সংবিধান থেকে এই কয়েকটি উদ্ধৃতির মধ্য দিয়েই এ কথা স্পষ্ট যে, অন্য সব ক্ষেত্রের মতো নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ‘জনগণের অংশগ্রহণের’ বিষয়টিই হলো প্রধান বিষয়। সেটিই ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ প্রাথমিক শর্ত। এ বিবেচনা থেকে বলা যেতে পারে, ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ জন্য বিএনপি অথবা অন্য কোনো দলের অংশগ্রহণ ‘প্রয়োজনীয়’ হলেও সেটিই যথেষ্ট ও প্রধান শর্ত নয়। প্রধান শর্ত হলো ‘জনগণের অংশগ্রহণ’। অথচ ‘জনগণের অংশগ্রহণের’ এই প্রধান বিষয়টিই সবচেয়ে কম আলোচিত ও সবচেয়ে হালকাভাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

এ ক্ষেত্রে এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণের’ বিষয়টি নিয়ে যেটুকুই বা আলোচনা হয় তা হলো তাদের ‘ভোট দেয়ার’ সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে। কিন্তু নির্বাচনে ‘অংশগ্রহণের’ ক্ষেত্রে ‘ভোট দেয়ার’ সুযোগের পাশাপাশি ‘প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগের বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের ‘প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগের বিষয়টি বলতে গেলে বিবেচনার একেবারেই বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে।

এক সময় ব্রিটিশরা এ দেশে যে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেছিল সেখানে ‘সর্বজনীন ভোটাধিকার’ ছিল না। যারা ট্যাক্স প্রদান করে থাকেন এবং নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষিত, তাদেরই কেবল ‘ভোট দেয়ার’ ও ‘প্রার্থী হওয়ার’ অধিকার ছিল। পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে কিছুদিন পর্যন্ত সেই ব্যবস্থা চালু ছিল। পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘সর্বজনীন ভোটাধিকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ নামে বিডি মেম্বারদের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। ‘প্রত্যক্ষ সর্বজনীন ভোটাধিকার’, ‘এক লোক এক ভোট’ ইত্যাদি দাবিতে তাই জনগণকে আবার সংগ্রাম করতে হয়েছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সে দাবি আদায় করলেও ভোটের রায় কার্যকর হতে না দেওয়ায়, জনগণের রায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। আশা ছিল যে, এর পর ‘জনগণের অংশগ্রহণে’ ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ জন্য আর সংগ্রাম করতে হবে না।

দুঃখ ও ক্ষোভের বিষয় হলো, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত করার পথে স্বাধীন বাংলাদেশ অগ্রসর হতে পারেনি। সামরিক শাসন এসেছে। তা চলেছে দেড় দশক ধরে। নির্বাচনকে ‘প্রহসনে’ পরিণত করা হয়েছে। ‘আমার ভোট আমি দিব, যাকে খুশি তাকে দিব’ সেøাগান নিয়ে জনগণকে আবার সংগ্রাম করতে হয়েছে। সামরিক সরকারের পতনের পর নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত হবে বলে জনগণ পুনর্বার আশায় বুক বাঁধলেও সে আশাকে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচনকে টাকার খেলা, পেশিশক্তির দাপট, প্রশাসনকে নানাভাবে হাত করা, সাম্প্রদায়িক ধূম্রজাল সৃষ্টি করা ইত্যাদি দ্বারা কলুষিত করা হয়েছে। নির্বাচনকে এখন বস্তুত সমাজের সুবিধাভোগী বিত্তবানদের মধ্যকার ‘কম্পিটিশনে’ পরিণত করা হয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে সে ক্ষেত্রে কেবল এই বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার ‘সুযোগের’ মধ্যে সীমিত করে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেটুকু সুযোগও বহুলাংশে লুপ্ত করা হয়েছে। এখন ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচন হচ্ছে। এমনকি গতবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ভোটবিহীন সরকার গঠনের’ তামাশাও হয়ে গেছে। সংসদ এখন বিত্তবান-ব্যবসায়ীদের কাবে পরিণত হয়েছে। এ কথা রাষ্ট্রপতিসহ অনেকেই বলেছেন।

এসব তো গেল জনগণের ‘ভোট দেয়ার’ অধিকারের নিশ্চয়তার বিষয়। সে অধিকার চাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, শুধু এটুকুতেই ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ তথা নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত হয় না। এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য অপর বিষয়টি হলো নির্বাচনে ‘প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগের নিশ্চয়তা। ‘প্রার্থী হবে’ অভিজাত ও বিত্তবানরা, আর গরিব-মধ্যবিত্তরা শুধু ‘ভোটার হবে’Ñ এমন হলে তাকে মোটেও ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে না। অভিজাত ও বিত্তবানরা সংখ্যায় জনগণের ১ শতাংশ, আর গরিব-মধ্যবিত্তরা সংখ্যায় ৯৯ শতাংশ। এই ৯৯ শতাংশের জন্য ‘ভোট দেয়ার’ সুযোগ নিশ্চিত করলেও যদি তারা ‘প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগ না পায় তাহলে নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ হয়েছে বলে বলা যায় কি?

এমন কথা দাবি করা হতে পারে যে, বর্তমানে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সবার অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। তা হলে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকার প্রশ্ন ওঠে কোন বিচারে? এ ক্ষেত্রে বুঝতে হবে, ‘অধিকার’ থাকা আর ‘সুযোগ’ থাকার অর্থ এক নয়। বর্তমানে ঢাকার মেয়র পদে বা এমপি পদে প্রার্থী হওয়ার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু প্রার্থী হতে হলে জামানত হিসেবে ১ লাখ টাকা ও ভোটার তালিকার সিডি কেনার জন্য আরও ৩০ হাজার টাকা বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগেই জমা দিতে হয়। এমপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে জামানত হিসেবে ২০ হাজার টাকা (এ পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ হাজার করার পাঁয়তারা চলছে) এবং ভোটার তালিকার সিডি কেনার জন্য আরও ১৫-২০ হাজার টাকা আগেভাগেই খরচ করা বাধ্যতামূলক। ৯৯ শতাংশ জনগণের পক্ষে এত টাকার ব্যবস্থা করা অসম্ভব। ফলে তারা ‘প্রার্থী হওয়ার’ কথা ভাবতেই পারে না। ৯৯ শতাংশ মানুষকে প্রার্থী হওয়ার অধিকার দিলেও কার্যত তাদের সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে প্রথম চোটেই বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। সেসবের মধ্যে যেমন একটি হলো, নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে ব্যক্তিগত-করদাতা হতে হয়। প্রার্থীদের তাদের টিআইএন নম্বর জানাতে হয়। যাদের বার্ষিক আয় করসীমার নিচে, টিআইএন নম্বর না থাকার কারণে তারা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যায়।

জামানত জমা দেওয়ার বিধান কি তা হলে উঠিয়ে দিতে হবে? বলা হয় যে, জামানত নেওয়ার বিধান না থাকলে প্রার্থীর সংখ্যা সামাল দেওয়ার বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু প্রার্থী সংখ্যা সীমিত রাখার জন্য বড় অঙ্কের জামানতের বাধা সৃষ্টি করাই কি একমাত্র অত্যাবশ্যক পন্থা? উপযুক্ত প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কি প্রার্থী সংখ্যা সীমিত করা যায় না? এ ছাড়া অন্য অনেক উপায়েই এ কাজটি করা যেতে পারে। আর জামানত যদি নিতেই হয় তা হলে সেটি আমির-ফকির নির্বিশেষে ঢালাওভাবে একই পরিমাণ হবে কেন? জামানতের পরিমাণ হিসেবে প্রার্থীর বার্ষিক আয়ের ১ শতাংশ নির্ধারণ কেন করা যাবে না? যার আয় ১০০ কোটি টাকা তাতে করে তার জন্য জামানতের পরিমাণ হবে ১ কোটি টাকা, আর যার আয় ১ লাখ টাকা তার ক্ষেত্রে সেটি হবে ১ হাজার টাকা। কিন্তু তা করা হবে না। নির্বাচনকে এখন এমন প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে যে, তাতে ১ শতাংশ অভিজাত ও বিত্তবানদের ‘প্রার্থী হওয়ার’ সুযোগ আছে, আর ৯৯ শতাংশ গরিব-মধ্যবিত্তের শুধু ‘ভোট দেয়ার’ সুযোগ আছে। অবশ্য সেই সুযোগটুকুও এখন অনেকটাই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, ‘আপনাকে কষ্ট করে ভোট দিতে হবে না, আমরাই আপনার ভোট দিয়ে দেব।’ ছাপ্পা ভোট, আগের রাতেই ভোটবাক্স ভরে ফেলা, বুথ দখলÑ ইত্যাদির কথা কে না জানে!

নির্বাচনে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ তা হলে ঘটতে দেওয়া হচ্ছে কি? এবং তা ঘটা ছাড়া ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ হওয়ার উপায় আছে কি? এ প্রশ্নের উত্তর হলোÑ প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রকৃত ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ জন্য শুধু নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ ঘটাতে পারলেই হবে না। সে জন্য বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। সেটিই হলো আসল কর্তব্য।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close