বিএনপি কীসের অপেক্ষায়

  রাহাত খান

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৫৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে প্রতিবার সংবাদ সম্মেলন ডাকার একটা ধারাবাহিক নজির প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরসংক্রান্ত বিষয়াদি অবহিত করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছেও তিনি যান প্রায় প্রতিটি বার। এসবই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পালনের পর্যায়ে পড়ে। তবে গণতান্ত্রিক বিধানের আওতায় পড়লেও শেখ হাসিনা ছাড়া ক্ষমতাসীন হওয়া অন্য কোনো দলের প্রধান নেতৃত্ব এসবের পরোয়া করেছেন বলে আমার জানা নেই।

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন ইতালিতে। দেশে ফিরে এসে যথাবিহিত সংবাদ সম্মেলন করলেন গত সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, গণভবনে। ইতালি সফর সম্পর্কে একটি লিখিত ভাষণ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন তিনি। তবে সফর সম্পর্কিত লিখিত বিবরণী ছাপিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মুখ্য হয়ে উঠেছিল বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার দুর্নীতির দায়ে জেলে যাওয়া, বছর শেষে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনসহ আরও দু-একটা বিষয়।

শেখ হাসিনা যেন জানতেন তার ডাকা সংবাদ সম্মেলনের গতি কোনদিকে গড়াবে। মনে হলো তিনি সে জন্য প্রস্তুত ছিলেন। সাংবাদিকদের কাজ যা তা-ই তারা করেছিলেন। চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে খবরের ভেতর খবরটি বের করে আনতে। আলোচিত বিষয়ে বিশেষ করে খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার প্রসঙ্গে সরকারের ভেতর ও বাইরের সত্যতা বের করে আনতে। সত্য যথেষ্ট উদঘাটিত হয়েছে এটা যেমন বলা যায়, তেমনি দ্বিধাহীন চিত্তে এ-ও বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সততা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না। বিশ্বাস করা যায়, গ্রহণ করা যায়, তেমন ঔজ্জ্বল্যের প্রতিফলন ছিল তার প্রশ্নের প্রতি জবাবে।

জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন হয়ে উঠেছিল সেটা। তেমনটা হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। বাংলাদেশ অর্থনীতি ক্ষেত্রে যতটা এগোতে পেরেছে, রাজনীতিতে তেমন সুস্থতা সময়ের ধারায় নানা কারণে অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দুই ধারার একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বটে। অনেকে মনে করেন যে কারণে হোক, খালেদা জিয়ার জেলে যেতে হওয়ায় এবং উচ্চতর আদালতে তার জামিন বা খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বিধায় দুস্তরবিশিষ্ট সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অন্তত সময়ের জন্য হলেও লোপ পেতে পারে।

অবশ্য বাংলাদেশে দ্বিস্তরবিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দুই দলীয় ব্যবস্থার মতো ছিল কিনা তা বলা সহজ নয়। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সবশেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশটি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। পাকিস্তান সাম্প্রদায়িক এবং সেনাশাসিত একটা দেশ। বাংলাদেশের ভিত্তি অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। এই বিষয়টি ছিল মীমাংসিত। পাকিস্তানকে শুধু রণক্ষেত্রে পরাজিত করাই নয়, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করাও ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম হওয়ার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনের অনেকের নৃশংস হত্যাকা-ের ভেতর দিয়ে মোশতাক ও জিয়া জনগণের সম্মতি ছাড়াই অনেকটা গায়ের জোরে বাংলাদেশকে যেভাবে তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে না ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, কৃষ্টি, সংস্কৃতির প্রতিফলন, না ছিল গণতন্ত্র, না ছিল অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যা কিছু অর্জিত হয়েছিল, মোশতাক ও জিয়া সেসব কিছু নির্মূল করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হন।

বাংলাদেশে দ্বিস্তরবিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা, স্বাধীনতার পক্ষশক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির আদলে বিন্যস্ত। এই দুই দলীয় ব্যবস্থার মধ্যে একটা বৈপরীত্য রয়েছে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার কিংবা বিএনপি প্রায় বিবৃতি-বক্তৃতাসর্বস্ব দলে পরিণত হওয়ায় বাংলাদেশবিরোধী শক্তির মধ্যে একটা লুকানো আতঙ্ক বিরাজ করতেই পারে, তবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বিবেচনায় তথাকথিত দুই দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিলুপ্তির আশঙ্কায় মুষড়ে পড়ার কিছু নেই। কখনো, কোথাও শূন্যতা স্থায়ী হয় না। এক সময় না এক সময় বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনে নিয়ে দুই দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই গড়ে উঠবে।

১৯ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে জনৈক সংবাদপত্রসেবী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আওয়ামী লীগ দল বা সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দেয়নি। দিয়েছিল এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার। মামলা চলেছে দীর্ঘ দশ বছর। এর পর বিচারাধীন বিষয়ে রায় দিয়েছেন আদালত। সরকারের তো এ ক্ষেত্রে করার কিছু ছিল না।

বিএনপি অবশ্য তা স্বীকার করে না। খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো প্রসঙ্গে তারা বলে, চলতি বছরে সাধারণ নির্বাচনকে একতরফা করতেই নাকি ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্বপরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা এ-ও মনে করেন, খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার চরম ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। বছর শেষে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায় বলে তারা মনে করেন। বিএনপির উগ্রপন্থি অংশটি ‘শেখ হাসিনার সাধের নির্বাচন’ হতে দেওয়া হবে না বলেও মুহুর্মুহু হুশিয়ারি উচ্চারণ করে যাচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আলোচ্য দুটি প্রসঙ্গ প্রশ্নের আকারে উত্থাপিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কোনো অস্বস্তি বা উদ্বেগ লক্ষ করা যায়নি। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেছেন, নির্বাচনে কোন দল অংশ নেবে, কোন দল অংশ নেবে না, এটা তাদের সিদ্ধান্ত। যথাসময়ে সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যারা নির্বাচন ভ-ুল করার হুশিয়ারি দিচ্ছেন তারা নির্বাচন হওয়া ঠেকাতে পারবেন না।

শেখ হাসিনা এই ধরনের বক্তব্য, এই ধরনের আত্মবিশ্বাস ঘোষণা করতেই পারেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি। কারণ সংবিধান সংশোধন করে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দেওয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের যুক্তি ছিল দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই অস্থায়ী ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পর সংবিধান মোতাবেক এই বিধানের কোনো বৈধতা থাকে না। বিএনপির হুশিয়ারি এবং রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ সংবিধান মেনে আরও কয়েকটি দলসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশ অচল করে দেবে এবং নির্বাচন ভ-ুল করে দিতে বিএনপি-জামায়াত সহিংস হরতাল ও অগ্নিসন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছিল। তবে নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। যদিও বিএনপি-জামায়াতের সহিংসার আগুনে কয়েক হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি ধ্বংস হয়। চলমান অর্থনীতির বিপুল ক্ষতিসাধিত হয়েছিল।

এবারও বিএনপি খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার আগে ও পরে সেই হুশিয়ারি দিচ্ছে। তবে জনগণ রাজনীতিতে এই সহিংসতা চায় না। এটা নিশ্চিত, এবারের নির্বাচনে সাধারণ জনগণের কোনো ধরনের সমর্থন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আদৌ পাবে না। তা ছাড়া গত দশ বছরে উন্নয়ন ও অর্থনীতির উন্নতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, অগ্রসরমান অর্থনীতির এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াতের প্রভাব বলয় অনেকটাই দুর্বল। মুখে যা-ই বলুক, জনগণের ইচ্ছার বিপক্ষে গিয়ে ২০১৪ সালের মতো আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন ভ-ুলে সমর্থ হবে কিনা সেটা অনুমান করা কঠিন নয়। অবশ্য সন্ত্রাস ও সহিংস পন্থার আশ্রয় যারা নেয় বা নিতে চায়, জনগণের সমর্থনের আশা তারা করে না। এ কারণে সন্ত্রাস ও সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া দলের বিপক্ষে যথেষ্ট সতর্ক থাকার এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপ স্তব্ধ করে দেওয়ার সর্বাঙ্গ প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে শতভাগ। ১৪ দলীয় সরকারকে বিষয়টি গুুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে আছেন। রাজনীতির মূল কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হয়ে যারা রাজনীতির বারান্দায় স্থান পেয়েছেন তাদের কেউ কেউ বলেন, ‘ক্ষুদ্র’ দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়ার মতো বড় ‘নেতা’কে দোষী সাব্যস্ত করা এবং জেলে পাঠানো নাকি ঠিক হয়নি।

ওই শ্রেণির লোকদের কথাবার্তা বোঝা দুঃসাধ্য। ‘বড় নেতা’ এতিমদের প্রাপ্য টাকা দীর্ঘ পাঁচ বছরে একজন এতিমকেও না দিয়ে নিজেরা ভাগাভাগি করে নেবেন কেন? আদালত রায় দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ছোট দুর্নীতি আর বড় দুর্নীতির প্রশ্ন আসে কেন? দুর্নীতি দুর্নীতিই। দুর্নীতি যে বা যারা করেন, প্রমাণসাপেক্ষে তাকে বা তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ আদালত অবশ্যই দিতে পারেন। এতিমের প্রাপ্য টাকা মেরে খাওয়া শুধু আমাদের প্রচলিত আইনে নয়, ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মেও গর্হিত অপরাধ হিসাবে বিবেচ্য।

খালেদা জিয়ার রায়ের কপি পাওয়ার পরও বিএনপির একশ্রেণির আইনজীবী যেভাবে কুতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেটাও হাস্যকর। তাদের একজন সক্রোধে বলেছেন, রায়ের বিধানে প্রথম ৫ দিন থেকেই ডিভিশনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি কেন! হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারি না। বিএনপির কিছুসংখ্যক আইনজীবী রায়ে কী থাকবে কী থাকবে না, সেটাও কি বিচারককে ডিক্টেট করতে চান?

রাহাত খান : সাংবাদিক ও কথাশিল্পী

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে