একজন প্রকৃতিকন্যার চলে যাওয়া

  লাবণ্য লিপি

০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০২:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতিই চিরকাল পথিককে পথ দেখায়। মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর ধানম-ির বাসায় যাওয়ার আগে প্রতিবারই আমি ঠিকানা ভুলে গেছি। বারবার তো আর ফোন করে ঠিকানা জানতে চাওয়া যায় না। আমি গাছপালা খুঁজতে খুঁজতেই এগিয়ে গেছি। যে বাড়িটা নানারকম গাছ দিয়ে ঢাকা ছিল, দেয়ালজুড়ে লতা, উঠোনে বাগান, সেই বাড়িটা দূর থেকেই ঠিক চোখে পড়ত। সবুজে ঘেরা দেয়াল খুঁজতে খুঁজতেই এগিয়ে যেতাম। তার পর ঠিক পেয়ে যেতাম। বাড়ির আঙিনায় পা রাখতেই ছায়ানিবিড় পরিবেশই বলে দিত এখানেই বাস প্রকৃতিকন্যার। যতবার তার কাছে গিয়েছি ঠিক যেন প্রকৃতির মতোই উদাত্ত আহ্বানে এগিয়ে এসেছেন দুবাহু বাড়িয়ে। আমি গাছপালা আর ভাস্কর্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে তাকাতাম। ঠিক যেন প্রকৃতিরই একটা অংশ। ধীরস্থির, প্রকৃতির মতোই শান্ত। আলাপ শুরু হতো তার কাজ নিয়েই। একটার পর একটা ভাস্কর্য দেখিয়ে বলতেন, বলো তো এটা কী? বলতে পারায় আনন্দিত স্বরে বলতেন, তা হলে আমার কাজ মানুষ বুঝতে পারে! আমি আমার অনেক গল্প এসব ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বলি। সবাই বুঝতে পারবে না হয়তো। তবে কেউ কেউ পারলেই তো হলো! বলতে বলতেই তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। ঠিক যেন তবলার ঠুকঠাক। একটু পরেই তালে ঢুকে যাওয়ার মতো আমি প্রসঙ্গে ঢুকে যেতাম। কী করব, আমি যে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতেই তার কাছে যেতাম। যে যুদ্ধ আমি দেখিনি, সেই যুদ্ধ আমি তার চোখ দিয়ে দেখতে চেয়েছি। বারবার তার কাছে ছুটে গেছি নানা অজুহাতে। শুরুতেই কখনো মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না। পুরনো ক্ষতটা খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে আমারও যে ভীষণ খারাপ লাগত। তাই অলিগলি খুঁজতাম। একদিন খুব বিষণœকণ্ঠে বললেন, যতবার আমি ওইসব দিনের ঘটনা বর্ণনা করি, ততবার যেন আরও একবার আমি বিবস্ত্র হয়ে যাই। আমার ভেতরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে! আমার ছেলেমেয়েরাও আজকাল খুব রাগ করে। বলে, মা বারবার এসব কথা বললে আমাদের বারবার সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়! বিড়বিড় করে বলছিলেন, কঠিন সত্যের মুখোমুখি হই তো আমিও। চোখে ভেসে ওঠে সেসব বীভৎস দৃশ্য। কত নারীকে যে ক্যাম্পে উলঙ্গ করে রাখা হয়েছিল। তাদের শরীর রক্তাক্ত, অপরিচ্ছন্ন! তাদের দৃষ্টি ছিল উ™£ান্তের মতো। নিজে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, অন্য অসংখ্য নারীকে নির্যাতিত হতে দেখেছি। নারীরা সেসব ঘটনা গোপন রেখেছিলেন। সমাজ-সংসারে টিকে থাকার জন্যই এটা করেছেন তারা। কিন্তু আমি মুখ ফুটে বলেছি। কেন বলব না! নারীরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন এটা তো তাদের অপরাধ নয়! বরং তারা যে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশের স্বাধীনতা আনতে বড় একটা ভূমিকা রেখেছেন এটা তো অস্বীকার করা যাবে না! বলতে বলতে তিনি আরও একটু বিষণœ হতেন। ঘনঘন শ্বাস নিতেন।

তার আরও একটা ব্যাপার খুব খেয়াল করতাম। অতীতের কোনো ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আপা খুব নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতেন। তার ছেলেবেলার গল্প কতবার যে আমি শুনেছি! বলার সময় চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠত। থেমে থেমে মৃদুকণ্ঠে বলতেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে নানার বাড়িতে। ওবাড়ির পরিবেশটাই এমন ছিল যে, ঠিক যেন চিরায়ত বাঙালি সমাজ। বাড়ির বৈঠকখানা ঠাসা ছিল বইয়ে। আমার বয়স যখন সাড়ে তিন বছর তখন থেকেই আমি ওইসব বই নাড়াচাড়া করি। পাঁচ বছর বয়স থেকেই বই উপহার পেতে শুরু করি। পড়তে শেখার আগেই নানা, মামা, মা, খালাদের মুখে শুনে শুনেই বিষ্ণুদে, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের কবিতা মুখস্থ করে ফেলেছি। বাড়িতে নতুন বই এলে সেটা নিয়ে আমার মা-খালাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। একজন বইটা পড়ত, পরের জন অপেক্ষা করত। তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো বই নিয়ে। আবার গল্পও হতো ওই বই নিয়েই। বাড়ির ছোটরাও বড়দের কাছে আবদার করত বইয়েরই। আমার বড় মামা নাজিব মাহমুদ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। খুব প-িত ও সাহিত্যরসিক ছিলেন। তার ঘরটার প্রতি ছিল খালাদের রাজ্যের আগ্রহ। মামা বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমরা ঢুকতাম মামার ঘরে। সে ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত নতুন আসা বই, ম্যাগাজিন। এমন সব চমকপ্রদ খবর আর ছবি থাকত তাতে খালারা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন দেখার জন্য। যেমনÑ ব্রিটেনের রানি মা হয়েছেন, মহাশ্বেতা দেবীর নতুন লেখা, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালের লেখা। সবকিছু দেখে মামা ফেরার আগে আবার আগের মতো করে রাখা হতো। লেখকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল আত্মীয়ের মতো। বই পড়তে হবে বলে আমরা পড়িনি; না পড়ে থাকতে পারিনি বলে পড়েছি।’

গল্প শুনতে শুনতে আমিও যেন কোথায় চলে যেতাম। তার ছেলেবেলায়? চোখ চলে যেত উঠোনে। উঠোনজুড়ে ফুলের বাগান। আর গাছগুলোও কী সুন্দর করে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। মাটির টবে, গাছের গুঁড়িতে, নারকেলের মালুইয়ে বেড়ে উঠছে ওরা। কেউ ছোট, কেউ বড় আবার কেউ বা মাঝারি। দুর্বল লতা গাছগুলো সবল বাঁশ কিংবা গাছকে জড়িয়ে লকলকিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ঘরের বারান্দাজুড়ে ভাস্কর্য। কাঠের টুকরোয় কত শিল্পই না তিনি গড়েছেন। মায়ের কোলে শিশু, চার বেহারার পালকিতে যাচ্ছে নববধূ, কৃষক, প্রেমিকযুগল, পশু-পাখি সবকিছুই ঠাঁই করে নিয়েছেন শিল্পীর আঙিনায়। তিনি বলেন, আমি আমার আনন্দ-বেদনা, অন্যায়ের প্রতি প্রতিবাদ সবকিছুই আমার ভাস্কর্যের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করি। আমার কোনো শিক্ষক নেই। আমি যা শিখেছি নিজে শিখেছি। তাই আমার কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতা নেই। আমার কাজ ভালো হলে আমি যেমন নন্দিত হই, তেমনি খারাপ হলে নিন্দিতও হই। আমার কাজের দায়ভার আমারই। প্রকৃতিই আমার শিক্ষক। কুড়িয়ে পাওয়া কাঠ দিয়েই আমি প্রথম কাজ শুরু করি। এখনো আমি কাঠ কুড়াই। যা পাই জমিয়ে রাখি। উইয়ে খাওয়া কাঠেও আমি শিল্প খুঁজে পেয়েছি। জোর করে গাছের রূপও পরিবর্তন করতে যাই না কখনো। কখনো কখনো বাড়তি মাত্রা যোগ করেছি মাত্র। একটা পাথর এমনিতেই দেখতে সুন্দর। তাকে রঙিন করে আমরা শুধু কৃত্রিমতা দান করি কেবল। মানুষের জীবন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। নিজে নির্যাতিত হয়েছি। জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে কোনো আপসে যাইনি। মানুষ ও প্রকৃতি অবিচ্ছেদ্য। মানুষকে ভালো থাকতে হলে, সুস্থ থাকতে হলে প্রকৃতির কাছেই আশ্রয় নিতে হবে। তবে প্রকৃতির প্রতি আমরা যে যথেচ্ছাচার করছি, তার দায়বদ্ধতাও আমাদের থাকতে হবে। প্রকৃতিকে অবজ্ঞা করে নয়; পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করার জন্য প্রকৃতির পরিচর্যাও আমাদেরই করতে হবে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ইউএনডিপি, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাস, ইউএনআইসিইএফসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। শেষ বয়সে এসে ভাস্কর্যশিল্পে মনোনিবেশ করেন। গাছের পাতা, শেকড়, মরা ডালপালার মতো প্রকৃতির খুব সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি করেন অসাধারণ সব ভাস্কর্য। প্রকৃতির প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। তিনি কপালে টিপ-তুলির আঁচড়ে আঁকতেন লতাপাতা, পাখি আর বাংলার প্রকৃতি। কখনো লাল টকটকে টিপে ধারণ করতেন বৃত্ত, যা ফুটে উঠত তার শক্তি আর সাহসের প্রতীক হয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেয়। এর আগে ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক পান।

য় লাবণ্য লিপি : লেখক ও সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে