ট্রাম্পের অভিশংসন কতদূরে

  রাহাত খান

১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের তাবৎ রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা ছিল ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি মাস কয়েকের বেশি টিকবে না। কারণÑ এক. তার নারীঘটিত কেলেঙ্কারি কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে। দুই. প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে আসায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তো বটে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার সীমাহীন আবহাওয়া বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। তিন. ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দিচ্ছেন প্রায় প্রায়ই। চার. তার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের উল্লেখযোগ্য অংশের পদত্যাগ। পাঁচ. ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে তার আঁতাত থাকার বিষয়ে ক্রমে ক্রমে সত্য উন্মোচিত হতে থাকা। এ বিষয়ে ম্যুলারের নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট সেই উপসংহারের দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয়। ছয়. মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিস্তর রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণায়। সাত. ট্রাম্পের সীমাহীন মুসলিম বৈরিতা। অতিরিক্ত ইহুদিপ্রীতি।

রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল যা যা ভেবেছিলেন ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি সম্পর্কে, সেসব উচ্চারণ সবই যে অসার ছিল, তা নয়। অনেক কথাই সত্যি বলে প্রতিপন্ন হয়েছে, তবে এসব কিছুর পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল-তবিয়তে টিকে আছেন। এমনকি ‘শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও বেড়েছে মাঝারি ব্যবসায়ী ও তরুণদের মধ্যে। মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ, মার্কিন অর্থনীতি ওবামা যুগে ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষতি ছাড়িয়েও গত এক বছরে ঊর্ধ্বগতি লাভ করেছে এবং মার্কিন অর্থনীতি এখন চনমনে। বেকার যুবকদের বহুল সংখ্যায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে থাকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।

অবশ্য এর পরও মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি খুব যে একটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছে, তা মোটেও নয়। ট্রাম্পের নিজের দলের লোকরা পর্যন্ত ট্রাম্পের দেশ শাসন এবং বিশ্ব কূটনীতি পরিচালনার রকমসকম দেখে বিব্রত ও শঙ্কিত। মুক্ত বিশ্বের অবিসংবাদী নেতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ছিল সমর ও অর্থনীতিতে বিশ্বসেরা। সেই অবস্থান জর্জ বুশ জুনিয়র থেকেই ধীরক্রমে নিচে নামছিল। বারাক ওবামার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব মার্কিন অবস্থানের নিম্নগতি কিছুটা রোধ করতে পেরেছিল। তবে ২০১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র টুইটার আসক্ত এমন এক প্রেসিডেন্টকে পেয়েছে, যিনি অর্থনীতি কিংবা কূটনীতি কোনো ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগেকার প্রশ্নাতীত শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখা দূরে থাকুক, ধরে রাখার ভাবনাচিন্তা তেমন করেন না।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি হয়তো নতুন ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছেন। কে জানে। তবে টুইটারে অনর্গল নিজেকে ডিফেন্ড করতে থাকা, প্রতিপক্ষকে টুইটারে আক্রমণ বা প্রতি-আক্রমণ করতে থাকা, এমনকি কংগ্রেস ও সিনেটকে, বলতে হয় প্রায় অগ্রাহ্য করে। টুইটারে দেশ শাসনের চেষ্টা করতে থাকা এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট মানসিক বৈকল্যে ভুগছেন কিনা তেমন প্রশ্ন তার নিজের দলেও উঠেছে। আবার মাঝে মাঝে ট্রাম্প তার টুইটার জগৎ ছেড়ে রাজনীতি-কূটনীতির বাস্তবেও ফিরে আসছেন। বলছেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবার যোগ দেবে তার দেশ। মেয়ে ইভাংকা ও জামাতা জেড কুশনারকে উপদেষ্টার পদ ছাড়তে এবং হোয়াইট হাউস ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছেন না। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল মনে করেন, কথা ও কাজে উল্টাপাল্টা করাটাই ব্যক্তি ট্রাম্পের শক্তি। টুইটার করার দুর্নিবার প্রবণতাই তাকে দেশ-বিদেশে জনপ্রিয় না করুক, প্রতিনিয়ত আলোচনায় রয়েছেন। এটাও বা কম শক্তি কিসে!

তবে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আছেন, এতে না বাড়বে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সক্ষমতা, না উপকৃত হবে মার্কিন অর্থনীতি। ট্রাম্পের রাজনীতি-অর্থনীতি পরিচালনার ধরন এবং বিশ্বজুড়ে একটা হতাশা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন হালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর আমদানিতে তিনি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ট্যারিফ কর বাড়াবেন। এতে ইইউর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপের সেরা অর্থনীতির দেশ। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবে না। ইইউ ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইউরোপের বিরুদ্ধে মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবে দেখছে। তারা চীন ও রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে একটা সম্ভাব্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে। তেমন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হলে এর প্রতিক্রিয়া বিশ্ববাজারে পড়তে বাধ্য। বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিন্যাস হওয়াটাও বিচিত্র হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন বাণিজ্যে ৮০০ বিলিয়ন বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করতে গিয়ে মুক্ত বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বের সর্বোচ্চ অবস্থানটি খুইয়ে বসতে পারেন।

সামরিক শক্তির বিবেচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের শীর্ষ দেশ। কাছাকাছি অবস্থানে আছে শুধু রাশিয়া। এর পরও বিশ্বে সমরশক্তির ভারসাম্যতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই হেলে পড়ে। তবে ইউরোপকে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ রেখে ট্রাম্প প্রেসিডেন্সি সম্ভাব্য শেষ যুদ্ধে কোণঠাসা হতে বাধ্য। অবশ্য এ রকম হিসাব করাটা অতি সরলীকরণের পর্যায়ে পড়ে। মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প যে দেশের প্রেসিডেন্ট, সে দেশে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমরনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এমনভাবে বিন্যস্ত যে, একজন রণচ-ী বা অযোগ্য প্রেসিডেন্ট ইচ্ছা করলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক বিন্যাস কিংবা বহির্বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ভেঙে দিতে পারবেন না। কাজেই ন্যাটো থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা ইইউর সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ভেঙে ফেলা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভবপর বলে ভাবার কোনো কারণ নেই।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্সির নির্বাহী ক্ষমতার পরিধিও বড় কম নয়। বুদ্ধিনাশ হলে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের, সেই সঙ্গে মার্কিন স্বার্থের কিছু ক্ষতি বুঝে বা না বুঝে করতেই পারেন।

এই যেমন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজি হয়ে যাওয়াটাÑ উত্তর কোরিয়া ছোট দেশ তো বটেই। উন্নয়ন বলতে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সফলতা। মাঝে মাঝেই দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে দেশটা। মাথাপিছু আয় দেড় হাজার মার্কিন ডলারের বেশি নয়। দেশের রাজনৈতিক আদর্শ কমিউনিজম। আসলে কমিউনিজমের নামে ভেতরে ভেতরে রাজতন্ত্র বহাল। এ রকম একটা দেশের প্রধান নেতা রাজা বললেও হয়, পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির নেশায় উন্মাদ প্রায়। ইদানীংকালে কিম নেতৃত্ব এমন কয়েকটা আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম।

এই কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের বেশ কয়েক দফা বাকযুদ্ধ হয়ে গেছে। যেন বা উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমরশক্তির বিবেচনায় সমান সমান। উত্তর কোরিয়ার পেছনে চীনের পৃষ্ঠপোষকতা আছে। তবে বিরাট শিশুর অবয়ববিশিষ্ট কিম জং উনের উসকানিমূলক কার্যক্রম চীন পছন্দ করছিল না, বরং অযথা কিমের হৈ-হুঙ্কার শুনে বিরক্তই হচ্ছিল। তবে ১২০ পরমাণু শক্তিবিশিষ্ট কোরিয়ান (উত্তর) নেতার সঙ্গে ৭৩০০ পরমাণু শক্তিসম্পন্ন দেশের নেতা কেন বাকযুদ্ধে নিজেকে জড়াতে গেলেন, হতবাক বিশ্ববাসীর প্রশ্ন সেটাই।

উত্তর কোরিয়া হালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র ও বিশ্ব শান্তি নিয়ে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে রাজিও হয়ে গেছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, উত্তর কোরিয়া যা চাইছিল সেই ফাঁদে ধরা দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকৃতি দিলেনÑ এই দাবির যে রাশিয়া নয়, চীন নয়, এই সমরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু আক্রমণের হুমকি হচ্ছে উত্তর কোরিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ নেতা বিল রিচার্ডসন তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তিরস্কার করে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বলেই ফেলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসা টেলিভিশনের কোনো রিয়েলিটি শো নয়।

অনেকে মনে করেন, চেয়ারম্যান কিমের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমরশক্তি ও কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে হেয় করলেন। বৈঠকে রাজি হওয়াটাই তুলনামূলক বিচারে ক্ষুদ্র শক্তি উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক জয়কে নিশ্চিত করল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নিজের এবং দেশের এমন কূটনৈতিক অবনমনের ঘটনা আর ঘটেনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরও একটি সিদ্ধান্ত মার্কিন কূটনীতির এতদিনকার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। সেই সিদ্ধান্তটা হলো পরিস্থিতিগত কোনো চাপ বা সামাজিক-রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতা না থাকা সত্ত্বেও জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে কার্যত স্বীকার করে নিয়ে তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দেওয়া। প্রেসিডেন্ট নিজের কাজকর্মে এমনিতেই মুসলিমবৈরী হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কালোদের অবস্থানও তিনি ভালো চোখে দেখেন না। তার ওপর ফিলিস্তিনি আরব এবং মুসলিম উম্মাহর সেন্টিমেন্টকে এভাবে আঘার করা বহুবারের মতো আর একবার প্রমাণ করল যে, মুসলিম ঘৃণা এবং ইসরায়েল তোষণ তার মজ্জাগত।

ভুলের পর ভুল করে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিত্যদিন তার নৈতিকতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো সোচ্চার। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের অভিশংসিত হয়েছিলেন টেলিফোনে আড়িপাতার গোপন ব্যবস্থা রাখার দায়ে। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের মতো জনপ্রিয় ও কল্যাণকামী এক ব্যক্তি নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিশংসিত হতে হতে বেঁচে গিয়েছিলেন। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি কোনোদিন অভিশংসনের মুখে পড়বেন? যদি বা পড়েন, সেটা কতদূরে?

য় রাহাত খান : কথাশিল্পী ও সাংবাদিক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে