নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছেই

  আব্দুল হাই রঞ্জু

১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জানমাল-সম্ভ্রম রক্ষার গ্যারান্টি রাষ্ট্রের। কোনো কারণে রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম শৈথিলতা দেখালে পদে পদে মানুষের মানবতা ও মৌলিক অধিকার বিঘির্œত হবে, এটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারী নির্যাতন, নারী সহিংসতা, যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মূলত বিচারহীনতা, প্রলম্বিত বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে নারী সহিংসতা বাড়ছেই। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাক, অ্যাকশন এইড, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে নারী সহিংসতা অনেক বেড়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের সদস্য সচিব মাহবুবা বেগম বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও গবেষণার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেন, ২০১৭ সালে আগের বছরের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে। রাজধানীতে নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক ‘কার শহর’ শীর্ষক অ্যাকশন এইড পরিচালিত এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শহর এলাকায় ৫৪ শতাংশের বেশি নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বলেন, নারী সহিংসতার গবেষণায় দেখা গেছে, ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। মূলত দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালানোর মতো আর্থিক সঙ্গতির অভাবের কারণে অনেক সময়ই মামলার বাদী মামলা মোকাবিলা করতে পারেন না। ফলে অপরাধীরা সহসাই পার পেয়ে যায়। আবার নারী নির্যাতনের পরও অনেকেই ঝামেলা এড়ানোর কারণেও মামলা রুজু করেন না। আবার দেশের আইনি কাঠামোয় ভিকটিমকেই প্রমাণিত করতে হয়, সে নির্যাতনের শিকার। প্রকাশ্য আদালতে মামলা পরিচালনা হওয়ায় অনেকেই লাজলজ্জার কারণে আদালতকে এড়িয়ে চলতে চান। অর্থাৎ যখন নির্যাতিতকেই সাক্ষী-প্রমাণে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়, তখন ভাবাটাই স্বাভাবিক এ প্রক্রিয়া জটিল। এর পরও কেউ আইনের আশ্রয় নিলে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের খুশি (?) করতে না পারলে তদন্ত প্রতিবেদন সঠিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগও অনেক পুরনো। সব মিলিয়ে আমাদের দেশে, বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সহসাই ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কারণ মামলার সাক্ষী-প্রমাণ ব্যতীত বিচারক কাউকে সাজা দিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে সাক্ষীও অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া অনেকের ভাগ্যেই জোটে না। এর পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের দেখাও মেলে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট নিয়োগ পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে জাকিয়া সুলতানা রূপা নামে জীবনসংগ্রামী এক নারীকে একাকিত্ব পেয়ে বাসের চালকসহ অন্যরা গণর্ধষণের পর তাকে খুন করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ময়নাতদন্ত শেষে টাঙ্গাইলের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করে। পরে হতভাগী রূপার পরিচয় শনাক্ত হলে লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে আবার নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় বাসের চালকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে মামলাটি খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় এবং রায়ে চারজনের ফাঁসি ও একজনের সাত বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। ওই রায়ে ছোঁয়া পরিবহনের বাসটি নিহত পরিবারের নামে মালিকানা পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করার জন্য মধুপুর থানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। এভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হলে নারী সহিংসতার মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আমরা মনে করি। যদিও আমাদের আইনে আপিলের সুযোগ রয়েছে। হয়তো আপিল হবে। এরপর কতদিন লাগবে, তা আদালতই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমরা আশাবাদী, দৃষ্টান্তমূলক এ শাস্তি উচ্চ আদালতেও যেন বহাল থাকে এবং যতদ্রুত সম্ভব মামলাটির রায় দিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেওয়া নিম্ন আদালতের রায় যেন কার্যকর হয়। কারণ এ ধরনের মামলায় যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় হয়েছে, তা উচ্চ আদালতে বহাল থাকলে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যাবে, অপরাধী যেই হোক শাস্তি তাকে পেতেই হবে।

মূলত আমাদের দেশটিতে মাদক, অশ্লিলতা, বেহেল্লাপনার মাত্রা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বিরূপ প্রভাবে তরুণ থেকে যুব সম্প্রদায় এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে মাদকের টাকার জন্য খুনখারাবি, ছিনতাই থেকে শুরু করে এমন কোনো হীন কাজ নেই, যা করতে সামান্য দ্বিধা করে। সঙ্গত কারণেই প্রতিদিন খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সর্বোপরি নারী সহিংসতা বেড়েই চলছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকেও প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। প্রতিকারে প্রতিশ্রুতি আসে, হুমকি আসে ঠিকই কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের ধর্ষণের চিত্র এখন নতুন প্রজন্মকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবাদে সহজলভ্য মেমোরি কার্ডে যৌন ছবির ছড়াছড়িতে যুব সম্প্রদায় দিন দিন হারিয়ে ফেলছে নৈতিক মূল্যেবোধ। ফলে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যুব সম্প্রদায় এখন রুচিহীন যৌনতার শিকার হচ্ছে। ফলে নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকা- ক্যানসার (?) রোগের মতো সমাজটিকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। এ অবস্থা রোধ করা সম্ভব না হলে সামাজিক অবক্ষয়, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটবে। এ জন্য সামাজিক আন্দোলনকে যেমন জোরদার করা জরুরি, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বকে নিশ্চিত করতে হবে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে মাদক নামক ইয়াবার আস্তানাগুলোকে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে খোদ রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ইয়াবার আগ্রাসন মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে কমলমতি তরুণ-তরুণীরাও সহজলভ্য হওয়ায় ইয়াবার ছোবলে এখন দিশেহারা। মাঝেমধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়ে সত্য, কিন্তু চুনোপুঁটিরা ছাড়া রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। যারা নিজেদের নিরাপদ দুরত্বে রেখে সমানেই অনৈতিক পথে বিত্তবৈভবে সমৃদ্ধ হওয়ার নীরব প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। জনশ্রুতি আছে, অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সমাজবিধ্বংসী ন্যক্কারজনক কাজে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। তাহলে এর কি কোনো শেষ হবে না? এর সঠিক জবাব পাওয়াও ভার! কারণ যখন প্রভাবশালী ক্ষমতাধর রাঘব বোয়ালরা এ ধরনের অনৈতিক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের আইনের আওতায় আনাও কঠিন। তা না হলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে না কেন?

মাদকাসক্ত একজন অপরাধীর কাছে মা, বোন, মেয়ে কারোই সম্ভ্রম নিরাপদ নয়। ভাইয়ের হাতে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে আর এক বোনকে। কী বীভৎস সমাজের চেহারা! যখন আপনজনদের হাতে মেয়ে কিংবা বোনকে ধর্ষিত হতে হয়, তখন মনে হয় আমরা সভ্য যুগেও অসভ্য যুুগে বসবাস করছি। তা না হলে আপনজনরা ধর্ষিত হয় কীভাবে? এর মূলেই যে মাদক, আমার মনে হয়, তা আর উচ্চস্বরে কাউকে বলার প্রয়োজন পড়ে না। যখন একজন মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে বিবেক-বিবেচনা কোনো কিছুরই মূল্য থাকে না। এভাবেই দেশটি যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে! অতিসম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে এক নারীকে জন্মদিনের পার্টিতে দাওয়াত দিয়ে ধর্ষণ করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত রাজিব ও রুবেল নামে অভিযুক্ত দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা চাই, এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যুনালে বিচার করে রূপা হত্যার বিচারের মতো দ্রুত বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একমাত্র আইনের শাসনকে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে এ ধরনের অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। এর আগে গত বছরের ২৮ মার্চ জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বনানীর রেইন্ট্রি হোটেলে ডেকে নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। অবশ্য এ বিষয়গুলোয় ভিকটিমদেরও সর্তক হওয়া জরুরি। কারণ এ ধরনের ঘটনা যেখানে হরহামেশাই ঘটছে, সেখানে জন্মদিনের পার্টিতে ডাকলেই যেতে হবে কেন? এ ব্যাপারে নারীরা সতর্ক না হলে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকবেই।

উপসংহারে শুধু এটুকুই চলতে চাই, সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে উপনিত হয়েছে। ফলে ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে সামাজিক আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার রায় দিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ জনগণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ ব্যতীত নারী ধর্ষণ, নারী সহিংসতা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।

য় আব্দুল হাই রঞ্জু : কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে