• অারও

পাল্টে যাচ্ছে বিএনপির হিসাব

  হাসান শিপলু

২১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৮, ০৮:১২ | প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হবে এমন ভাবনাই ছিল না বিএনপি নেতাকর্মীদের। গত কয়েকদিনের ঘটনায় তাদের ধারণা, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হবে। নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপিও নতুনভাবে হিসাব কষছে, তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে। দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র বলছে, কর্মসূচি প্রণয়ন নিয়ে দলের নেতারা খুবই চিন্তিত। দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে যে নরম কর্মসূচি চলছে, তা আমলে নিচ্ছে না সরকার। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদের কারোই সহসাই বের হওয়ার লক্ষণও নেই। আবার শক্ত কর্মসূচি দিলে সরকারের ফাঁদে পা দেওয়া হবে। তখন চলবে গণগ্রেপ্তার, যার মাশুল গুনতে হবে নির্বাচন পর্যন্ত। গতকাল সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এক সময় দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আমাদের কাছে চাইবে না।

দলের হাইকমান্ড এবং আইনজীবী নেতাদের ধারণা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সহজেই জামিন পাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। হাইকোর্টের জামিন এবং চেম্বার জজ তা স্থগিত না করায় সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু আপিল বিভাগে জামিন স্থগিত হওয়ায়, রাজনীতির মাঠে যে গুঞ্জন ও আশঙ্কা ছিল; তা সত্যিই হলো।

এ বাস্তবতায় বিএনপি নেতারা এখন মনে করছেন, নির্বাচন পর্যন্ত তাকে কারাগারে থাকতে হবে। কারণ বিষয়টি শুধু আদালতের নয়, রাজনৈতিকও। এ কারণে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি এখন সামনে চলে আসছে। খালেদা জিয়া কারাগারে রেখে নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে নেতাদের মনোভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

নেতাদের অনেকেই বলছেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না করে কিছু আসন পাওয়ার জন্য নির্বাচনে গিয়ে লাভ নেই। শুধু কিছু আসন পেয়ে সরকারকে বৈধতা দেওয়াই হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমরা তো শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক পথে চলব। সরকার স্বৈরতান্ত্রিক পথে চলুক, আমরা গণতন্ত্রের পথে চলব। গণতন্ত্রের পথই মুক্তির পথ। জনগণের শান্তিই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি। সরকার জনগণের ওপর নয়, রাষ্ট্র শক্তির ওপর নির্ভরশীল।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নির্বাচনের সময়ই সিদ্ধান্ত নেব। গণতন্ত্র হচ্ছে নির্বাচনের বাহক। দেশের মানুষ তাদের অধিকার আদায় করবে, ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কেউ তো বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। তারাও থাকতে পারবে না।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার রাতে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সিনিয়র নেতারা বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকের সূত্র ধরে বলা যায়, কৌশলে পরিবর্তন আনতে চাইছে বিএনপি।

বৈঠকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলমান আন্দোলনে শরিকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিকতর আলোচনার জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের যৌথসভা ডাকা হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করবেন দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা। এ ছাড়া বেগম জিয়ার জামিন না পাওয়াসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ কূটনীতিকদের ব্রিফ করবেন দলের কূটনীতিক কোরের নেতারা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট কর্মসূচির ধরন পাল্টানোর আলোচনা হলেও এখনই হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি আসছে না।

সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জোট ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জোট এবং বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন নেতাকে ‘টোপ’ দিচ্ছে সরকার। জোট ভাঙতে চেষ্টা করছে। শরিক দলের এক শীর্ষ নেতাকে পার্শ¦বর্তী দেশে ডেকে নেওয়া হয়েছে। এসব জানার পর জোটের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য স্থায়ী কমিটির এক সদস্যকে জোটের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে জোট নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি দেওয়া হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতে, সরকারের অন্তত তিনটি ভাবনা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এক. বিএনপি বড় কর্মসূচি দিলে সরকার মামলা দিয়ে ধরপাকড় করত, কিন্তু এতে পা দেয়নি দল। দুই. খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হবে; বাস্তবতা হলো এখন পর্যন্ত অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে দল ঐক্যবদ্ধ আছে। তিন. তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হলে তার নেতৃত্ব কেউ মানবে না, এখানেও বাস্তবতা; এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। বরং তার নেতৃত্বে দল আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দলের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে পরামর্শ করেই নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের একের পর এক ভাবনা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় তারা আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই নানা ধরনের ফন্দি আঁটছে কীভাবে বিএনপি এবং নেতাদের আটকানো যায়। কিন্তু একটি কথা স্পষ্ট করে বলা যায়, সরকার যে পথে হাঁটছে, তা কোনোভাবেই সফল হওয়ার নয়।

সম্প্রতি এক বৈঠকে বিএনপির বিদেশনীতি পরিবর্তন আনার পক্ষে আলোচনা হয়েছে। ভারত বিএনপিকে স্পেস না দেওয়ায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত বলে অনেকে মন্তব্য করেন। বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষ করে, এশিয়ায় পুরোপুরি নিজেদের আধিপত্য সৃষ্টি করতে দেশগুলোকে নিজেদের ‘পক্ষে’ টানতে কাজ করছে চীন। তবে নেতাদের কারো ধারণা, সম্প্রতি চীনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দেশটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে; যা অতীতে কখনো করেনি।

দেশের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির এক সিনিয়র সদস্য বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে ভূ-রাজনীতি বড় একটি বিষয়।

জানা গেছে, নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক কিংবা না-ই করুক সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকাও তৈরি হচ্ছে। তবে বিএনপি নেতাদের কাছে খবর আছে, যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে রাজি হবেন না, তাদের কারাগারে যেতে হবে। সে ক্ষেত্রে বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়ার পরিবেশ থাকবে না বলেই মনে করেন তারা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে