নববর্ষের উৎসব : শুরু থেকে পথচলা

  খান মাহবুব

১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০১:১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিন দিন পরিসর বৃদ্ধি করে রঙ ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রঙ ও বৈচিত্র্যের বৈভবে ভরপুর। উৎসবের আমাজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে ভিত ধরে বাঙালি চিরায়ত বাঙালিয়ানাকে ধারা করে জীবন-জিজ্ঞাসু জাগ্রত করে পথচলার দিকনির্দেশকের প্রত্যয় যেন এই নববর্ষ। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বেশেষ এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের এক উৎস ভূমি।

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে আবহে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলনÑ এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদযাপনের সূচনায় ইতিহাসও স্বতঃসিদ্ধ নয়। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্নবাণ ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছানোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম যুক্তি যাই হোক না কেন, সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চায়। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের দিকদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের খেরোখাতায় অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মোগল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের নাম। মোগলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসনে অনুসরণ করত হিজরি সন। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌরসনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল নয় মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃজন হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মোগলরা হিজরি সনের অনুসৃত হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খাজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। মোগল রাজ্য ছিল কৃষিভিত্তিক ও তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে আবর্তিত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধা ও সুসংহতকরণের মানসেই আকবর ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে আদিষ্ট হয়ে দরবারের সেরা প-িত জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফতেহ উল্লাহ সিরাজী আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.কে ভিত্ত ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত, আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দীন-ই-ইলাহী’ ও তারিখ ‘ই-ইলাহীর সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহী পথ চলতে না পাড়লেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ সিরাজী প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সংজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাদী সনের কার্যকারণ ঘটান। এই সময় থেকে সুবে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শকাব্দসহ হিসাব ছিল সৌরবর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসিলম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্রমাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমাত্র হিসেবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এই পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’।

চান্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলন। স্বকর্মে প্রজারা তাকে মহামতি আকবর বলেই সম্ভাষণ করতেন। সৌরবর্ষ ও চান্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রাহয়ণ, পুষ্যা নক্ষত্র থেকে পৌষ, মসা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর আখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়াও আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পায়ে পেরেক ঠুকে নাম আছেÑ রাজা শশাঙ্ক, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তকের জয় টিকা সম্রাট মহামতি আকবরের দিকেই পাল্লা ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতরমাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মোগলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মোগল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চান্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি সুবে বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের, বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রথম আমলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময় ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সনজীদা খাতুনের লেখায় তথ্য মিলেÑ

‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পহেলা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরের আবাহন করেছেনÑবিষপড়সব ঢ়ধযবষধ ইধরংযধশয। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে। ঢাকায় প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এই বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। অবজারভার পত্রিকা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায়, হারমোনিয়ামে আছে শাহীন আকতার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু) পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহীদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পহেলা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গ-ি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে উন্মুখ আমরাÑ সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা একেবারেই সঙ্গীন। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌরে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের বিচ্যুতি কাক্সিক্ষত নয়।

আমরা বাংলা দিন-তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের কাল, ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথপরিক্রমণের অনিবার্য ও অপরিহার্য সম্বন্ধসূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের নৃতাত্ত্বিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জাতির জীবনে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে উপেক্ষা করে আমাদের এগোতে হবে আমাদের মতো করে। আমাদের পথচলার বীজমন্ত্র বাঙালিয়ানায় আর এর আনন্দ দেখতে পাওয়া যায় নববর্ষের বিভিন্ন উৎসবে। তাই আমাদের চিন্তা ও কর্ম থেকে নিজ মস্তিষ্ক সৃজিত ও এই বঙ্গভূমি থেকে অঙ্কুরিত। বাংলা নববর্ষের উৎসবের রূপ-রূপান্তরে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর হয়েছে সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমনÑ চাষের লাঙ্গল, জোয়াল, মই, ডানা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্যমেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্যমেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্যমেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অচীন। সবকিছুর পরও বাংলা নববর্ষ-বরণের পথপরিক্রমণ বাঙালির চলমান সংস্কৃতির প্রবহমানতায় পুষ্ট হয়ে এক অনন্য জীবন-জাগরণের সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনার প্রয়োজনÑ বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় ভাস্বর হবে বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে।

খান মাহবুব : গবেষক, প্রকাশক ও খ-কালীন শিক্ষক, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে