বাঙালি কী করে বাঙালি হবে

  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০১:০৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা আগে বাঙালি, না আগে মুসলমান সে নিয়ে এক সময় একটা বিতর্ক ছিল; বিজ্ঞজনরা বলতেন যে, বিতর্কটি নিতান্তই অহেতুক, কেননা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান হতে কোনো অসুবিধা নেই। বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের ভেতর বিরোধ যে নেই সেটা সত্য; কিন্তু তবু বিরোধ তো একটা তৈরি করা হয়েছিল এবং সেই বিরোধটা যখন তুঙ্গে উঠল তখন অখ- বাংলাকে দ্বিখ-িত করা ছাড়া উপায় রইল না। তাতে বাঙালির যে কত বড় সর্বনাশ ঘটেছে সেটার পরিমাপ করা অসম্ভব। কিন্তু ঘটনার অল্প পরই বেশিরভাগ বাঙালি বাস করে যেখানে সেই পূর্ববঙ্গে আওয়াজ উঠল, ভুল হয়ে গেছে, আমরা আগে বাঙালি, তার পর অন্যকিছুÑ মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ইত্যাদি।

ব্যাপারটা আত্মপরিচয়ের। বাঙালি নিজেকে বাঙালি বলেই পরিচয় দেবে, এটাই স্বাভাবিক, ঠিক যেভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে, আমরা সেভাবেই বলব আমরা বাঙালি বটে।

কিন্তু কাকে আমরা বাঙালি বলব? নিরিখটা কী? প্রথম নিরিখটা পরিষ্কার। সেটা হলো বাংলা ভাষার চর্চা। তাকেই বাঙালি বলা যাবে, যে বাংলায় কথা বলে, এই সংজ্ঞাটা সহজ। কিন্তু বাঙালিও বাংলা বলতে পারে। তাই কেবল বাংলা বললেই বাঙালি হবে এটা বলা যাবে না। একটু এগিয়ে গিয়ে বলতে হবে, সেই হচ্ছে বাঙালি যে বাংলা ভাষার চর্চা করে এবং অন্য বাঙালির সঙ্গে সহমর্মিতা অনুভব করেÑ তাদের দুঃখে কাতর হয়, তাদের আনন্দে উৎফুল্ল এবং সবার উন্নতি চায়। এই যে সহমর্মিতা এর একটা নাম সামাজিকতা, আরেকটা নাম দেশপ্রেম।

সামাজিক হওয়া চাই, দেশপ্রেমিকও হওয়া চাই, নইলে নয়। অর্থাৎ এক কথায় বাঙালি হতে হলে মানুষ হতে হবে। সামাজিকতা ও দেশপ্রেম মনুষ্যত্বেরই অংশ বটে, অপরিহার্য অংশ। যে মানুষ সামাজিক নয়, যে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে, সমাজে থেকেও দূর দ্বীপে কিংবা গহিন অরণ্যে বসবাস করে, একদিন নয়, দীর্ঘদিন, সব সময় সে লোকটি মানুষের মতো হলেও ঠিক মানুষ নয়। কেননা মানুষ প্রকৃত অর্থেই হচ্ছে একটি সামাজিক প্রাণী; তার বুদ্ধি, বিবেক, হৃদয়ানুভূতি, জ্ঞান, রুচি যা কিছুকে মানবিক গুণ বলে আমরা জানি সবকিছুই সামাজিকভাবেই বিকশিত হয়। এটা একা কোনো কিছুই সৃষ্টি বা অর্জন করা সম্ভব নয়। আমরা এ-ও বলতে পারি যে, সামাজিক হলেই দেশপ্রেমিক হওয়া সম্ভব।

আসলে বাঙালি হওয়া মানেই মানুষ হওয়া। পরিপূর্ণ অর্থে মানুষ হওয়া। আর সেটা হওয়া ক্রমেই যে কঠিন হয়ে পড়েছে তা একটি বাস্তবিক সত্য বৈকি। এই যে পহেলা বৈশাখ আসে, আবির্ভাব ঘটে বাঙালির নববর্ষের, তখন অন্তত একদিনের জন্য বাঙালি হয়ে উঠলাম বলে আমরা মনে করি। সবাই নয়, এমনকি নববর্ষের অনুষ্ঠানে যারা যোগ দেয়, তাদের ভেতরেও সবাই নয়।

বৈশাখ মানুষে মানুষে যে বৈষম্য সেটাকেই উন্মোচিত করে দেয়। এমনকি অল্প সংখ্যায় যারা উৎসবে-অনুষ্ঠানে যোগ দেন তারাও কাছাকাছি হন বটে, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হন না, সামাজিক হয়ে ওঠেন না। সমাজে সামাজিকতা কি নেই? আছে, অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখন পারিবারিক হয়ে পড়েছে। এমনকি পরিবারের সবাই যে একত্র হবে তাও হয় না। পরিবার আয়তনে বড় হয়েছে এটা যেমন সত্য, পরিবারের ভেতরও বৈষম্য দেখা দিয়েছে এটাও মিথ্যা নয়; কোথাও কোথাও বৃদ্ধি পেয়েছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ভাগবাটোয়ারার লড়াই, উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘর্ষ। ফলে সামাজিকতা অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে। পারিবারিক এবং বন্ধু-বান্ধবের মিলনের বাইরে বড় জায়গায় গিয়ে যে মিলব এমনটা দেখা যায় না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অভাব, খেলাধুলার জন্য মাঠ নেই, এমনকি জনসভাও এখন আর আগের মতো হয় না। আমরা সঙ্কীর্ণ হচ্ছি, ক্ষুদ্র হচ্ছি, ফলে মনুষ্যত্ব খর্ব হয়ে পড়ছে। আর মানুষ্যত্ব যদি না থাকে, তা হলে তো আমরা মানুষই থাকব না, বাঙালি হবো কী করে? পারছি না, হতে পারছি না।

মাতৃভাষার চর্চাটা দরকার। খুবই দরকার, অত্যাবশ্যক বলা যায়। সবাই মিলে বাংলা ভাষার চর্চা করব, তাতে আমাদের আত্মসম্মান বাড়বে, আমরা পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসব, একে অপরকে বুঝব, আমাদের শিক্ষাদীক্ষা একইরকম হবে। বৃদ্ধি পাবে সামাজিকতা তথা মনুষ্যত্ব।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে