দলের তলে সরকার নতুন মডেলের সন্ধানে

  মোস্তফা কামাল

২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০১:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

নানান লীগের ভারে নেতিয়ে পড়া থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চায় সরকার। এসব লীগের অতল থেকে উঠে আসতে এর মাঝেই মূল লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দিয়েছেন অসাধারণ বার্তা। জানিয়েছেন, আগামীতে ছাত্রলীগের নতুন মডেল আসছে। একের পর এক নেতিবাচক ঘটনায় নাম আসা ছাত্রলীগকে নিয়ে বিরক্তি ও বিব্রতের কথা স্বীকার করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ তার এ সহযোগী সংগঠনটি নিয়ে নতুন করে ভাবছে। এর আগে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে দলের বিতর্কিতদের নমিনেশন দেওয়া হবে না। খবর হিসেবে এটিও কম চমকপ্রদ নয়। এর বাইরে তিনি প্রতিদিনই থাকছেন গুরুত্বপূর্ণ শিরোনামে। আর ছাত্র, যুব থেকে শুরু করে শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবকসহ ইত্যাদি লীগ নিয়মিত থাকছে ব্রেকিং নিউজে।

চট্টগ্রামে এক শিক্ষক তথা ব্যবসায়ীকে ছাত্রলীগ নেতা রনির চড়-থাপ্পড় মারার ভিডিও প্রকাশ, টঙ্গীতে এক ছাত্রলীগ নেতার ইয়াবাসহ ধরা পড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাদের কা-ের পর তিনি এ বার্তা দিলেন। বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ নিয়ে আমরা নতুন করে ভাবছি। সামনে তাদের জাতীয় সম্মেলন। সেখানে ছাত্রলীগকে নতুন মডেলে বিকাশ করার একটা নির্দেশনা আমাদের নেত্রীর রয়েছে।’

তার বার্তাটি তথ্য হিসেবে চমৎকার। এ ধরনের চমৎকারে ঠাসা তথ্য অবশ্য তিনি মাঝে মধ্যে দিয়েই থাকেন। এর সুবাদে নগদে বেশ মিডিয়া কাভারেজও পান। প্রশ্ন হচ্ছে, মডেলের নতুনত্ব নিয়ে। ছাত্রলীগে মডেলের শেষ নেই। ছাত্রলীগ নিজেই একটা মডেল। সিরাজুল আলম খান, শাহ মোয়াজ্জেম, তোফায়েল আহমেদ, আসম রব, শাজাহান সিরাজ, নূর আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন থেকে শফিউল আলম প্রধান, শেখ শহীদ কত মডেল। তারা সবাই আইকনের মতো। ওবায়দুল কাদের নিজেও ছাত্রলীগের একজন মডেল। ডাকসুতে মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছে বিপুল ভোটে হারলেও তিনি আজকের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছেছেন ছাত্রলীগের প্রডাক্ট হিসেবেই। পরবর্তীকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে হাবিব, অসীম, শাহে আলম, মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, ইকবালুর রহিমরাও মডেল হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এর পর নিরীহ, সাচ্চা নেতা নাজমুল আলম সিদ্দিকীরা। ভেতরে ভেতরে ব্যাংকের মালিক। এর পাশাপাশি হালনাগাদের মডেল সুফিয়া কামাল হলের এশা, চট্টগ্রামের রনি, সিলেটের বদরুল। এখান থেকে কোন মডেল আসবে আগামী দিনের নেতৃত্বে?

এদিকে আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতাদের নমিনেশন না দেওয়ার লাল সংকেতই বা কাদের জন্য? কে, কেন বিতর্কিত এখন পর্যন্ত দল থেকে কোনো তালিকা নেই। কক্সবাজারের বদি, সাভারের এনাম, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, যশোরের চাকলাদার, টাঙ্গাইলের রানা, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, ব্যাংক সাফা করে খাওয়া ম.খা আলমগীররা বিতর্কিত না মডেল? তাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা কোনো মহল থেকে অভিযোগ এলে দল থেকে কড়া আপত্তি আসে অহরহ। অর্থ তো পরিষ্কার। প্রশ্নেরও নিষ্পত্তি।

ছাত্রীর রগ কাটা, শিক্ষিকাকে ধর্ষণ, শিক্ষককে মারধর থেকে কবরস্থান দখল, টয়লেট থেকেও চাঁদা তোলা পর্যন্ত সব কাজেই আগুয়ান বিভিন্ন লীগের নেতাকর্মীরা। নিজভুবনে তারা একেকজন মডেল। তাদের অনেক ফলোয়ার্স। নিত্যদিনের সংবাদগুলোয় ছাত্র, যুব, শ্রমিক, মহিলাসহ বিভিন্ন লীগের গুরুত্ব। তাদের নিয়েই ভাসছে দেশ। চারদিকে আওয়ামী লীগ ছাড়াও নানা লীগের কিলবিল কিলবিল। বিরোধীমতের অস্তিত্ব বাইনোকুলার দিয়ে দেখার অবস্থা। আওয়ামী লীগের কোথাও কোনো বিরোধী বা প্রতিপক্ষ নেই। যেখানে-সেখানে সবাই আওয়ামী লীগ। অন্য দলের লোকরাও আওয়ামী লীগের জনসমর্থন বাড়ানোর গুরুদায়িত্ব নিয়েছে। যে মুখে এতদিন বদনাম-গীবৎ করেছে সেই মুখেই এখন সুনাম করে। যিনি বিএনপির তিনিই আওয়ামী লীগের। জিন্দাবাদ-মারহাবার বদলে এখন জয় বাংলা। ভাগেযোগে উন্নয়নের জিকির ও কোরাস। জাতীয়তাবাদী, জামায়াতি, বামাতি আওয়ামী লীগের সার্কাসটা জমেছে বেশ।

অনেকে রসিকতা করে বলেন, এটাই এখন শান্তির একমাত্র পথ। বিএনপিসহ সব দল তাদের সাইনবোর্ড গুটিয়ে আওয়ামী লীগ করে ফেললে দেশটা কত শান্তিপূর্ণ হতো। আওয়ামী লীগ একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে যেত। তাদের আর বিএনপিকে নিয়ে খিস্তি করতে হতো না। মারামারি-কাটাকাটি একান্তে নিজেরাই করতে পারত। অন্য কারো শরিকানাই থাকত না। তা না হওয়ায় এখন আওয়ামী লীগকে মিলমিশ প্রতিনিধি দল করতে হয়েছে। ১৫ টিমের এই সদস্যরা গলদঘর্ম হয়ে উঠছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ ফ্যাসাদ মেটাতে। মন্ত্রী, এমপি অথবা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের দ্বন্দ্ব মেটাতে গিয়ে কোথাও কোথাও তারা নিজেরাই স্যান্ডুইচ হয়ে যাচ্ছেন। কিছু এলাকায় হুকুমত পোক্ত রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা সফররত টিমকে কব্জায় নিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে কোথাও কোথাও তারা কোনোরকমে কেবল কর্মী সম্মেলন করেই চম্পট দিচ্ছেন।

কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৬ জানুয়ারি থেকে আওয়ামী লীগের ১৫টি টিম তৃণমূলে সাংগঠনিক ট্যুরে নামে। এরই মধ্যে গুলা পঁচিশেক জেলা ট্যুর করেছে টিমগুলো। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতা, টেন্ডার-চাঁদার ভাগবাটোয়ারা, জমিদখলসহ খবরদারি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের জেলা থেকে উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পরিণতিতে মাঝে মধ্যে লাশ পড়েছে। নিজেদের রক্তে নিজেরাই লাল হচ্ছে মাঝে মধ্যে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপিং তুঙ্গে। কর্মীরাও বিভক্ত। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল থেকে ঢুকে পড়ারা জেলায় মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের গ্রুপিংয়ে বড় ফ্যাক্টর। অন্তর্কোন্দলের হোতাদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারিত হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ শ্রেণি আগামীতে নমিনেশন পাবে না। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আবৃত্তি আরও কড়া। তিনি বলেছেন, এদের বরাতে আগামীতে নৌকার টিকিট জুটবে না। এরা নৌকায় চড়তে পারবে না। কিন্তু যাদের লক্ষ্য করে এসব হুমকি-ধমকি, তারা নিশ্চিত তাদের ছাড়া নৌকা চলবে না। প্রয়োজনে নৌকার তলা ফুটা করার হিম্মত রাখেন তারা। দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া নেতাকর্মীরা পড়ে যাচ্ছে সাইডলাইনে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এত আওয়ামী লীগার কোথাও দেখা যায়নি। কী দুঃসময় উত্তাল স্রোতের উজানে নৌকা টেনেছেন নেতাকর্মীরা। তারা বুঝে উঠতে পারছে না এ হিম্মতওয়ালারা কোথায় ছিলেন এতদিন? এখন এত ফুয়েল কোথায় পান তারা? মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় ক্ষমতার দাপট ধরে রাখতে হরহামেশা চিহ্নিত ভেজাল মালদের দলে টানছেন। এ চান্সে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরাও আওয়ামী লীগে ভিড়ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করছে জয় বাংলায়। নাশকতার মামলায় চার্জভুক্ত আসামিরাও ফুল নিয়ে দুলহা সাজে যোগ দিচ্ছেন।

ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। দলে এবং স্থানীয়ভাবে সমঝদার, নির্মোহ হিসেবে পরিচিত মজ্জাগত আওয়ামী লীগার মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের অনেককেও এ বিমারিতে পেয়েছে। তারাও মৌসুমিদের পালে ভিড়েছেন। অতীত ত্যাগ-সংগ্রামের রেশ ধুয়েমুছে তারাও এখন কামাই-রোজগারের নেশায় আসক্ত। নইলে নাকি ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তৃণমূলে কমিটি-মনোনয়ন বাণিজ্য ছাড়াও দখল, চাঁদা, টেন্ডারে পাকা হয়ে উঠছেন তারা। পাল্টে গেছে সাদামাঠা জীবনাচারও। কাঙালের মতো ঘোরা এসব ব্যক্তিই এখন নানান ছুতায় কাঙালিভোজ দেন। নতুন-পুরনো মিলিয়ে তাই দেশে এখন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার। চারদিকে শুধুই আওয়ামী লীগ। দলের উন্নয়ন, দেশের সাফল্যের জয়গানে বাংলাদেশে এখন সবাই আওয়ামী লীগ। কোথাও কোনো সমস্যা দেখে না তারা। চারদিকে নিজেদেরই দেখে। মাঝখানে ফেলে রাখতে চায় একটুকরা দেশকে। এর পরও কাউকে সমস্যা মনে করলে জামায়াত, স্বাধীনতাবিরোধী এমনকি জঙ্গি বানিয়ে খেল খতম করে দিচ্ছে ওয়ান-টুর মধ্যে।

কাউয়া, মুরগা, হাইব্রিড, নবাগত ইত্যাদি সম্বোধন করলেও এর মাঝে আসল আর ভেজাল আওয়ামী লীগ যাচাই করার অবস্থা নেই। ব্যাধিটার সংক্রমণ দলের বাইরেও। শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পুলিশসহ প্রশাসনেও। এই দলীয়পনা ভালো কিছুর বার্তা দেয় না। মিথ্যাচার, ধামাচাপা, আড়াল করা বা এড়িয়ে যাওয়ার সাফল্যে সাময়িক লাভবান হওয়া যায়। চাঁদাবাজি, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুনোখুনি ইত্যাদিতে দলের লোক জড়িত থাকলে নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা কী সব কথা বলেন তা সবারই প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। টেলিভিশনে সেসব গৎবাঁধা কথার সঙ্গে মিলিয়ে কথা বলতে পারেন দর্শকরা। অনেক দর্শক আগেই বলতে পারেন। এমনকি বোঝেন ঘটনার ঘনঘটাও। সেই লক্ষণ কিছুটা আমজনতাও মালুম করছে সাম্প্রতিক কিছু হালনমুনায়। রহস্যজনক ঘটনা আড়াল করতে, দলকে বাঁচাতে পুলিশ বলছে, দুষ্কর্মের জন্য কারা দায়ী জানা যায়নি। মামলা হচ্ছে, আসামিদের অজ্ঞাত উল্লেখ করে। ফরেনসিক ডাক্তার বলে দেন, হত্যা নয়, আত্মহত্যা। মন্ত্রীরা বলেন, ওরা আমাদের দলের নয়। অনুপ্রবেশকারী। নাশকতাবাদী।

এই সংস্কৃতি ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ায়-পাড়ায়, ঘরে-ঘরে। ক্ষমতার লড়াইয়ে মরিয়ার মধ্যেও চলছে আনন্দ উল্লাস। অভাবনীয় এ পরিস্থিতি পালটে দিয়েছে গণতন্ত্র-উন্নয়ন, মানবতা-দেশপ্রেমের

অর্থ-সংজ্ঞা সব কিছু। বেতার-টিভি ও অন্যান্য প্রচার-প্রকাশ প্রতিষ্ঠানে দলের লোকজন দুহাত খুলে লেখে, গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, দিন-রাত টকবক করেÑ কেউ শোনে না, দেখে না, পড়ে না ওসব, বিশ্বাসও করে না। আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন-বনেদি দলের সরকারকে এসব হাবিজাবিতে মানায় কিনা, এ প্রশ্নের মধ্যেই এলো নতুন মডেলের কথা। কী হতে পারে মডেলটি? এর কোনো ধারণা বা ক্লু এখনো মেলেনি। এর পরও মন্দের ভালো স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, দেরিতে হলেও ভাবনাটা তো এসেছে। বাস্তবটা কেমন হয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।

য় মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে