কথা প্রসঙ্গে

মঙ্গলে অমঙ্গল

  শান্তনু চৌধুরী

২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০১:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিশি অবসান হয়ে এলো নতুন বছর। রমনা বটমূলে ছায়ানট বাঁশির সুরে ভোরের রাগে স্বাগত জানাল নতুন বছরের সূর্যকে। সারাদেশ মেতে উঠল এক অপার্থিব আনন্দে। লাল-সাদা থেকে শুরু করে যার যার শখে ইচ্ছেমতোন সেজেছে কেউ কেউ। ঢাকা, ঢোল, বাঁশিÑ বেজেছে নানা বাদ্যও। এর পরও কি মনে হয়েছে কোথাও একটু ঘাটতি ছিল? বিশেষ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রায় অন্যান্যবারের চেয়ে লোকসংখ্যা ছিল কম। সন্দিগ্ধ মন তাই একটু ভাবাচ্ছে বৈকি! কোনো কোনো পত্রিকা বা অনলাইনও এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করেছে এবং সর্বোপরি ওইদিনই ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন সাংবাদিকরা। তার উত্তরটাও সুন্দর। ‘এখন উৎসব আর নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই, পুরো ঢাকা শহর থেকে শুরু করে সারাদেশে উৎসব হচ্ছে। সে কারণে মানুষও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।’ এটা জুতসই উত্তর বটে! এর পরও একটু খুতখুতানি থেকে যায়।

পহেলা বৈশাখে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও আড়ম্বরের সঙ্গে বাংলা বর্ষবরণের সিদ্ধান্ত গেল বছর থেকে জারি করেছে সরকার। ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করায় বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেওয়ার ঘোষণা আসে ২০১৬-এর নভেম্বরে। ইউনেসকোর ওয়েবসাইট এবং প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া বিবৃতির মাধ্যমে জানা যায়, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় আন্তঃদেশীয় কমিটির একাদশ বৈঠকে এই স্বীকৃতি মেলে। ’৮০-র দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে প্রথম পহেলা বৈশাখে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু হয়। তার পর থেকে প্রতিবছরই বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এতে উৎসাহিত হয়ে ঢাকার বাইরেও একই ধরনের শোভাযাত্রা বের হয় পহেলা বৈশাখ। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু উৎসবের অনুষঙ্গই নয়, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে মেলে ধরার পাশাপাশি সমাজে অবক্ষয় থেকে মুক্তি, পেছনের দিকে হাঁটা প্রতিরোধের আহ্বানও জানানো হয়। ইউনেসকো কমিটি তখন বলেছিল, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের মানুষের সাহস আর অশুভের বিরুদ্ধে গর্বিত লড়াই আর ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার প্রতীকী রূপ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণকেও মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয় ইউনেসকো কমিটি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে নতুনভাবে ধরা পড়বে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার সেøাগান ছিল, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’ ইউনেসকোর স্বীকৃতির সময় দেওয়া বিজ্ঞপ্তির কয়েকটি শব্দ বেশ উপলব্ধিময়। ‘বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি।’ বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশের চিত্র তাই। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে মনে হচ্ছে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কথাটা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। প্রশ্ন উঠতে পারে, কই নববর্ষকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক কিছু তো ঘটেনি। এটা ঠিক, ঘটেনি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোঝা যায়, কতটা কূপম-ূক হিসেবে তৈরি হচ্ছি আমরা। গেল কয়েক বছরে আমরা যে আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে আসছি এতদিন সেটা থেকে কেন জানি মনে হচ্ছে কিছুটা দূরে সরছি আমরা। সেটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে মৌলবাদ তোষণ নীতি থেকে শুরু করে বইপুস্তকে তাদের যেন জয়গান। আবার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও অলক্ষ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে উগ্রবাদ। এই যেমন, উৎসব হবে প্রাণখোলা, সেখানে কোনো রাখডাক বা বাধা-বিঘœ কাম্য নয়। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। রাষ্ট্র যেখানে নিরাপত্তা দেবে সেখানে জনগণের মনে নিরাপত্তাহীনতার ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে এটা করা হচ্ছে। কথাটা সাদা চোখে অনেকাংশে সত্য। আবার এ কথাও ঠিক যে, আগে তো এমন নিয়ম ছিল না। তার মানে দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ সত্যিই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এরা যে কোনো সময় ছোবল হানতে সক্ষম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশপ্রধান বারবার বলেন, ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ নিয়ন্ত্রণে। তার মানে তোমরাও এমন কিছু করো না যাতে জঙ্গিরা না রেগে যায়! বিষয়টির গভীরতা আছে কিন্তু। এমনো বলা হয়, কোনো কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে, তার মানে আনন্দও করতে হবে সীমাবদ্ধ থেকে। কারণ জঙ্গি, সন্ত্রাসীরা যদি সুযোগ পায় তবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, শান্তিপ্রিয় মানুষ তো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে না। সেটা যারা করবে তাদের ওপর বুলডোজার না চালিয়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে আনন্দ আয়োজনকে। সত্যিই সেলুকাস!

এবার আসা যাক, আমাদের মননে-মগজে গেল এক দশকে যে এ ধরনের ধোলাই চলছে তার কিছু নমুনা দেখি। এসব অবশ্য প্রতিবছরই হয়। কিন্তু প্রশাসন থেকে যদি কেউ এ বিষয়ে মদদ দেয় তা হলে সেটি ভাবার বিষয় বটে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবিদ আহমেদ লিটন নামে ইন্টেলিজেন্সের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেলার ১৩ এপ্রিল দেওয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে পহেলা বৈশাখের লাল-সাদা রঙের সঙ্গে শাঁখা-সিঁদুরের তুলনা করেছেন। ছায়ানটের অনুষ্ঠানকে সূর্য-পূজারিদের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ...’ তার এই ফেসবুক স্ট্যাটাস অসংখ্য শেয়ার ও কপি করে শেয়ার দিয়েছেন অনেকে। অথচ সরকারি চাকরিতে থেকে কোনো কর্মকর্তা এমন বিদ্বেষমূলক স্ট্যাটাস দিতে পারেন না। একই সঙ্গে এবার কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ’ শীর্ষক ওই নির্দেশনায় কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফেসবুকে পোস্ট ও ছবি আপলোডের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে ২০১৬ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকা অনুসরণ করতে বলা হয়। এসব পোস্ট কিন্তু জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। আবিদ আহমেদকে পরে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনিও পোস্টটি ডিলিট করে দেন। তবে সেটি স্কিন শট হিসেবে এখনো ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে ঘুরছে। একই কা- করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক সহকারী উপপরিদর্শক ইব্রাহিম খলিল। পহেলা বৈশাখের বেশ কয়েকটি ছবি আপলোড করে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বর্জন করার আহ্বান জানানো হয়েছিল তার ওই পোস্টে। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এলে খলিল তার পোস্টটি সরিয়ে নেন। এদিকে রাজশাহী থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের ছয় নারীসহ যে সাত সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ তাদের মধ্যে দুজন পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করেছে। কিছুটা হয়তো পুলিশের নজরে আসছে আবার এর বাইরে অনেক কিছুই থেকে যাচ্ছে অগোচরে। তার মানে বিষাক্ত সাপ ঠিকই বাড়ছে। এই যেমন পহেলা বৈশাখের চেতনাকে কৌশলে ভারতমুখী করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। তিনি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, পহেলা বৈশাখের নামে দেশময় অশ্লীলতা-বেহায়াপনা ও নগ্নতার ছড়াছড়িতে মুসলিম জাতিসত্তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মঙ্গল প্রদীপ, মাঙ্গলিক প্রতীক অঙ্কন প্রভৃতি আমদানি করা বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে তুলেছে।’ অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকেসহ ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি। এর সঙ্গে ধর্মের বিরোধ নেই।

আমরা আসলে ভাবতে চাই না বা ভাবতে ভালো লাগে না দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি বাড়ছে। উগ্র গোষ্ঠী বাড়ছে, আমরা বরং ভাবি এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষ কম হওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের বক্তব্য ঠিক। তিনি বলেছেন, ‘সুশৃঙ্খলভাবে যখন কোনো উৎসব হয়, তখন মানুষ একটু কম কমই লাগে। কিন্তু মানুষ যখন বিশৃঙ্খলভাবে উৎসব করে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তখন মানুষ বেশি বেশি মনে হয়।’ আমরা ভাবি, পহেলা বৈশাখের আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল, সে কারণে কিছুটা ভীতি ছিল। তাই লোকজন কম বের হয়েছে। টিএসসি ও এর আশপাশে এবার কোনো আয়োজন ছিল না। তাই লোকজন ছড়িয়ে পড়েছে। রোদের তেজের কারণে এবার অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বের হতে পারেননি। বিশেষ করে শিশুরা। এসবই সান্ত¡না। বাস্তবতা আমাদের মূল্যবোধ, চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা নষ্ট হচ্ছে। আশপাশে তাকালে সেটি বেশ স্পষ্ট হবে। আর তা হলে পুলিশ, সোয়াত, র্যাবের বেষ্টনী দিয়ে যতই মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হোক না কেন, সেখানে আনন্দের লেশমাত্র থাকবে না। সেটি শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।

য় শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে