বাসেও ভয়ে নারীরা

  হাবিব রহমান

২৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ০৯:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

নারীÑ ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়; পদে পদে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার। প্রকাশ্যে বাসের চালক ও তার সহকারীদেরও লালসার শিকার। গণপরিবহনে আগে নারীরা যৌন নিগৃহের শিকার হলেও বর্তমানে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা বেড়ে গেছে। একশ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল বাসযাত্রীও তাদের নিগৃহ করছে। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ সময় লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী মুখ খোলেন না। সাহস করে দুই-একজন যা-ও মুখ খুলছেন, তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত সময়ে সুবিচার পাচ্ছেন না। ফলে দিনদিন বাড়ছে এমন অপরাধ। গণপরিবহনে যাতায়াত করা তাই এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে পড়েছে।  

নারী অধিকারকর্মী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন হয়রানির ঘটনা যেমন বেড়েছে, তেমনই এ বিষয়ে প্রতিবাদকারী নারীর সংখ্যাও বেড়েছে। মুখ খুলতে শুরু করেছেন তারা। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি গণপরিবহনে কর্মী নিয়োগ দেওয়ার আগে তাদের মানসিকতাসহ কিছু বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে কর্তৃপক্ষের। কারণ যাত্রীদের সেবাপ্রদানের মতো কাজে মানসিক বিকারগ্রস্ত ও নৈতিকতাহীন লোকের কাজ করা একেবারেই উচিত নয়। এমন হীন কা- বৃদ্ধির জন্য ইন্টারনেটের লাগামহীন ব্যবহারও দায়ী বলে মনে করছেন তারা।
গত বছর করা একটি জরিপের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন বলছে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানির তালিকায় বিশ্বে চতুর্থ স্থানে ঢাকা।
গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার এক নারী আমাদের সময়কে জানান, তিক্ত ওই অভিজ্ঞতার পর বাসে তো বটেই, রিকশায় চড়তেও ভয় পান তিনি। ঘটনার পর সপ্তাহখানেক রাতে একটুও ঘুমাতে পারেননি। সব সময় তাড়া করেছে কুৎসিত সেই অভিজ্ঞতা।
গত ১৭ মার্চ ফার্মগেট থেকে নিউভিশন পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন ইডেন মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী। বাসটি কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে দেন চালকের সহকারী। বাসে সাকুল্যে ২-৩ জন যাত্রী ছিলেন। চালক ওই শিক্ষার্থীর উদ্দেশে অশালীন মন্তব্য করে হাসতে থাকেন। তার সঙ্গে যোগ দেন যাত্রীরাও। বিপদ আঁচ করতে পেরে সংসদ ভবনের মোড়ে এসে চালকের সহকারীকে ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাস থেকে রাস্তায় লাফ দেন ওই ছাত্রী। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে সেদিন রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন ওই তরুণী। পোস্টে বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। ওই পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর তৎপর হয় পুলিশ। ঘটনার এক সপ্তাহ পর, ২৩ মার্চ নিউভিশন পরিবহনের ওই বাসটির চালক দ্বীন ইসলাম ও তার সহকারী বিল্লাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল।
সর্বশেষ গত শনিবার দুপুরে বাড্ডা থেকে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী। এ সময় বাসে যাত্রী ছিলেন মাত্র ৭-৮ জন। বাস সামনে যাবে না বলে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে থাকেন বাসের স্টাফ। এ সময় ছাত্রীটির সন্দেহ হলে তিনিও বাস থেকে নেমে যেতে উদ্যত হন; কিন্তু বাসের হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর কন্ডাক্টর তার হাত ধরে টানতে শুরু করে। কন্ডাক্টর ও হেলপারের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলাকালে এক সুযোগে চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়েন তরুণী। বিষয়টি জানাজানি হলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তুরাগ পরিবহনের অর্ধশত বাস সড়কে আটকে রেখে বিক্ষোভ করেন। এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ছাত্রীর স্বামী। পরে তুরাগ পরিবহনের ওই বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারীকে গ্রেপ্তার করে তিনদিনের রিমান্ডে নেয় গুলশান থানা পুলিশ। গুলশান থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাপস রেজা আমাদের সময়কে বলেন, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা তিনজনই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করতে শুরু করেছে।
তুরাগ পরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার ওই ছাত্রীর স্বামী গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, এখন আমরা দেখতে চাই, কতটা দ্রুত এর বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয় এবং কবে অপরাধীরা তাদের প্রাপ্য শাস্তি পায়। তার স্ত্রী মানসিক অসুস্থতা কাটিয়ে উঠেছেন বলে জানান তিনি।
বাসে কোনো যৌন হয়রানির ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী পোস্ট দেওয়ার পর সম্প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের এডিসি মো. নাজমুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ফেসবুকে পোস্ট দিলে আসামিরা সতর্ক হতে পারে। তাই ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জানানোই উত্তম। এতে করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
গত বছরের ২৫ আগস্টের ঘটনা। জাকিয়া সুলতানা রুপা নামের এক কলেজছাত্রী বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে ফিরছিলেন। বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী নিরাপদ পরিবহনের ছোঁয়া নামের একটি বাসে ওঠেন তিনি। পথে চালক, সুপারভাইজার ও তিন হেলপার মিলে একজনের পর একজন বাসের ভেতর তাকে ধর্ষণ করেন। এরপর খুন করে রুপাকে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠলে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল ঢাকা-আরিচা সড়কে চলাচলকারী একটি বাসে ওঠেন এক পোশাককর্মী। বাসটি ধামরাইয়ের জয়পুরা ও কেলিয়ার মাঝামাঝি এলাকার সড়কে থামিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করে বাসটির চালক, হেলপারসহ কয়েকজন। ঘটনার পরদিন মকবুল, সোহেল, বলরাম দাস, বাবু ও সুজন নামে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শুধু বাসের কর্মীই নয়, এক শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীও গণপরিবহনে নারীদের নিপীড়ন করছে। নারীরা গণপরিবহনে চলাচল করতে গিয়ে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ ছাড়াও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও কটূক্তির শিকার হন। এর পাশাপাশি নারীদের অজান্তে বিশেষ কায়দায় তাদের ছবি তোলা এবং এসব ছবির সঙ্গে অশ্লীল কথা জুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এ ছাড়া নারীযাত্রীর পরিহিত পোশাকের অংশবিশেষ আলগোছে কেটে ফেলা, ছড়ানো চুল বা ওড়না সিটের সঙ্গে বেঁধে রাখার মতো বিব্রতকর ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রেস্টোরেটিভ জাস্টিস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, এসব ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ কতটা লোপ পেয়েছে। ইন্টারনেটে শেখা অশুভ বিষয়গুলোও এ জন্য দায়ী। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে। তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি বছরের ২২ মার্চ ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরতে রিকশা নেন। রিকশাটি কড়াইল বস্তি পার হয়ে গন্তব্যের দিকে না গিয়ে দিক পরিবর্তন করে নির্জন স্থানের দিকে যেতে থাকে। সামনে কয়েক তরুণ দাঁড়ানো দেখে অশুভ কিছু আঁচ করতে পেরে চিৎকার করে ওঠেন ওই ছাত্রী। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে পালিয়ে যায় রিকশাচালক ও অপেক্ষমাণ তরুণরা। গত বছরের অক্টোবরে বনানী এলাকায় এক নারী এমন ঘটনার মুখে পড়ার বর্ণনা দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেনÑ ‘অল্পের জন্য আজ গণধর্ষণ থেকে বেঁচে গেলাম।’
এ বিষয়ে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী আমাদের সময়কে বলেন, বিচারহীনতা এসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ। ইন্টারনেটে পর্নো সাইটসহ নানা বিষয় সহজলভ্য হয়ে গেছে সব শ্রেণির কাছে। যারা এটি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন না, তাদের হাতেও পৌঁছে গেছে। এসব দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়। আবার বাসের স্টাফরা এসব নিপীড়নকে অপরাধ মনে করে না অনেক সময়। তারা এমন ধারণাও করে যে, লজ্জার বিষয় বলে ভুক্তভোগী নারী তা প্রকাশ করবেন না, কাউকে বলবেন না। এসব অপরাধের বিচার হচ্ছে না, সে সম্পর্কেও তারা অবগত। প্রশিক্ষণ না থাকা, নৈতিকতার অভাবও দায়ী এমন কা-ের জন্য।
তবে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, আমরা স্টাফসদের সঙ্গে মিটিং করে তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আমাদের টিম নামানো হয়েছে। এর পরও যদি কেউ এমন অপরাধ করে, আমরা জানার সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছি।

 

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে