প্রসঙ্গ শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা

  ড. কামরুল হাসান মামুন

১১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ মে ২০১৮, ০১:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গার্ডিয়ান বলে খ্যাত গুণধর ইউজিসি ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন আমাদের সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতিমালাটি পড়ে যেমন দুঃখবোধে আচ্ছন্ন হয়েছি, তেমনি আমাদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের জ্ঞানের সীমা দেখে এক ধরনের পুলকিত অনুভব করেছি। প্রথমত, ভাবছিলাম এই অভিন্ন নিয়ম করার আইডিয়াটা কার মাথা দিয়ে এলো? আমেরিকার এমআইটি, হার্ভার্ড আর সেখানকার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কি অভিন্ন নিয়ম আছে নাকি? ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ আর সেই দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কি এ রকম অভিন্ন নীতিমালা আছে নাকি। এমনকি চীন, কোরিয়া বা ভারতেও কি এমন নীতিমালা আছে? উত্তর হলো কোথাও নেই। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদের ইউজিসির নীতিনির্ধারকরা বেশ সৃষ্টিশীল। আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও গুরুত্ব যদি একই হতো সে ক্ষেত্রেই কেবল অভিন্ন নিয়মের কথা ভাবা যেত কিন্তু করা উচিত কিনা সেটা অনেক বড় আলাপ। এ দেশের এই একটা সমস্যা। ভালো-মন্দকে এক পাল্লায় মাপার প্রবণতা। ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ না বললেই দিন শেষে দুজনেরই অবনতি ঘটবে। এই অভিন্ন নিয়োগ নিয়ম চালু করে কি শিক্ষকতা পেশাতে সরকারি চাকরির মতো বদলি পদ্ধতি চালু করবে? মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্তও হতে পারে যে, তিন বছর নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলে তাকে বদলি করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, এর পর আবার তিন বছর পর অন্য কোথাও। চালু করতে পারলে কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো ইউজিসির লোকজনও বদলি বাণিজ্য শুরু করতে পারবেন।

এ ছাড়া এই নীতিমালার কয়েকটি বিষয় নিয়ে কথা না বলে চুপ থাকতে পারলাম না। প্রথম কথা হলোÑ প্রভাষক থেকে অধ্যাপক নিয়োগ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে এসএসসি আর এইচএসসির ফলাফল চেয়েছেন। ক. এই পুনরাবৃত্তি কেন? খ. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষ করে সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগের জন্য সেই শিশু অবস্থার ফলাফল কি দরকার আছে? আর যোগই যদি করবেন পিইসি আর জেএসসি বাদ পড়ল কেন? এদেরও রেখে দিন। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও কি এ রকম এসএসসি আর এইচএসসির ফলাফল দেখে? আমি নিশ্চিত যে, কোনো সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে এ রকম করতে পারে না। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট দেখে না। আবার এই দেখার ক্ষেত্রেও একটি ধহড়সধষু আছে যা আরও বিপজ্জনক। একজন ছাত্র যদি এসএসসি আর এইচএসসিতে ৪.৫-এর কম সিজিপিএ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে এবং এসএসসি-এইচএসসিতে তার চেয়ে অনেক ভালো সিজিপিএওয়ালা থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে শুধু ভালো নয় বরং তাদের সবাইকে টপকে যায় তা হলে সে কেন শিক্ষক হতে পারবে না? তা ছাড়া সিজিপিএ কম পাওয়ার কারণে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটাকে অঙ্কুরেই মেরে ফেলা কি অন্যায় নয়? এ তো বিশাল অন্যায়! দ্বিতীয় কথা হলোÑ নিয়োগ শর্তের কোথাও পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতাকে উল্লেখই করেনি। বিশেষ দ্রষ্টব্যতে কেবল বলা আছে পোস্ট ডক্টরাল প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে থাকলে সর্বোচ্চ দুই বছরকে সক্রিয় অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা হবে। অথচ আজকাল বিজ্ঞান অনুষদে অন্তত পোস্ট ডক্টরাল অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগই দেওয়া হয় না। সেখানে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পিএইচডিকে পর্যন্ত তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পুরো পদ্ধতি এমনভাবে করা হয়েছে যাতে পিএইচডিবিহীনও অধ্যাপক হতে পারেন। অর্থাৎ বিজ্ঞান অনুষদে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পিএইচডি ছাড়া একজন শিক্ষক অধ্যাপক হয়ে যাবেন। এটা মানা যায় না। ব্যতিক্রমী প্রার্থীদের জন্য সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম রাখতে হয়। সে রকম ব্যতিক্রমী কেউ থাকলে হতে পারে। যেমন আমাদের সত্যেন বোস পিএইচডি ছাড়া অধ্যাপক হয়েছেন। কিন্তু তাকেও করা হয়েছিল আইনস্টাইনের সুপারিশ ছিল বলে। এ রকম পিএইচডি পোস্ট-ডক ছাড়া পাইকারি হারে অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়া শুধু ঠিক হয়নি; বরং অন্যায় হয়েছে। শিক্ষা না শুধু যে কোনো কিছুর মান বাড়াতে দিন দিন নিয়োগ আর প্রমোশনের মানদ- বাড়াতে হয় যাতে সবাই চ্যালেঞ্জ অনুভব করে। আর অধ্যাপক হওয়ার পর আমাদের শিক্ষকদের একটি বড় অংশকেই দেখি হয় ফুলটাইম রাজনীতিতে নামে অথবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের জীবনযাপন করে। অর্থাৎ অবসরের আগেই অবসর। অধ্যাপক হওয়ার পর আর তেমন কোনো বড় চ্যালেঞ্জ নেই। অথচ পৃথিবীর সর্বত্র অধ্যাপক হওয়ার পর জুনিয়র সহকর্মীদের আমব্রেলা হয়ে গবেষণা কাজের নেতৃত্ব দেন। পিএইচডি ছাত্রের ংঁঢ়বৎারংড়ৎ হন। ইউজিসির নীতিমালায় এই বিষয়ে কোনো আলোকপাত করা হয়নি। চতুর্থ কথা হলোÑ লক্ষণীয় বিষয় হলো সর্বক্ষেত্রে পিএইচডি আর পোস্ট-ডক্টরাল অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করা। অথচ এগুলোই হলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের উৎকর্ষ সাধনের সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষকদের জ্ঞান সৃষ্টির প্রতি ব্রতী করে। স্নাতকোত্তর পাস কাউকে নিয়োগ দিয়ে প্রবেশনারি পিরিয়ড নামক দুই বা তিন বছরের এক খড়গ মাথার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর ওই দুই বা তিন বছর সে পিএইচডি করতে বিদেশ যেতে পারবে না। অথচ সেই সময়টাই হলো পিএইচডি করার শ্রেষ্ঠ সময়। স্নাতকোত্তর করার পরপরই যত শিগগির সম্ভব পিএইচডি শুরু করা উচিত। আবার পিএইচডি করে ফিরে আসার পর আবার দুই-তিন বছরের খড়গ। ওই দুই-তিন বছরের মধ্যে পোস্ট-ডক করতে কোথাও যেতে দেবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এমনই একটি চাকরি যা দেশ-বিদেশে গবেষণা করতে যাওয়া খুবই জরুরি। যেটা করতে পারে সেটা হলো স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে গেলে ছুটিকালীন কোনো বেতন দেওয়া হবে না। কারণ দেখা গেছে, অনেকেই বেতনসহ ছুটি নিয়ে গিয়ে বেতন তুলেছেন ঠিকই কিন্তু পিএইচডি শেষে আর ফিরে আসেননি। এটাকে রোধ করতে বিনা বেতনে ছুটি দেওয়া যেতে পারে। আমার পোস্ট-ডক হোস্টকে দেখেছি বছরের অর্ধেকের বেশি সময় পৃথিবীর নানা দেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে যোগ দিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ই টাকা দেয়। কারণ উনি হলেন দেশের একজন অ্যাম্বাসেডর যিনি দেশের গবেষণাকে বিশ্বের নানা জায়গায় তুলে ধরেন। আমাদের এখানে ছুটি দিতে আর টাকা দিতে অসম্ভব সবধহ! তৃতীয় কথা হলোÑ স্বীকৃত জার্নালে সহকারী অধ্যাপকের ক্ষেত্রে ৩টি, সহযোগী অধ্যাপকের ক্ষেত্রে ৬টি এবং অধ্যাপক হিসেবে ১২টি প্রকাশনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো শুধু অধ্যাপক হিসেবে প্রমোশন বা নিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ১২টির মধ্যে অন্তত দুটির প্রকাশনায় ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর থাকতে হবে। অর্থাৎ সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকের ক্ষেত্রে প্রকাশনাগুলোর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর না থাকলেও চলবে। মানে দাঁড়ায়, নেচারে প্রকাশনা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জার্নালে প্রকাশনার নো পার্থক্য। ভাবা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মাত্র ২টি ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর যুক্ত জার্নালে প্রকাশ করে! পাশের দেশে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরযুক্ত জার্নালে ১৫টি প্রকাশ করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকই হতে পারেন না আর আমাদের এখানে ২টি দিয়েই অধ্যাপক! শুধুই কি তাই? সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রথম অথর, দ্বিতীয় অথর বা করেসপন্ডিং অথর নামে আরেক হইচই কা-। তাদের ধারণাই নেই এগুলো এখন আউটডেটেড। অনেক ক্ষেত্রে অথরদের ক্রম নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে করে, কখনো কখনো কন্ট্রিবিউশনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে হয়। যেভাবেই হোক এটাকে এখন কোথাও আর তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। আর্টিকেলের মান এবং আর্টিকেল সংখ্যাই মূল বিবেচ্য বিষয়। এই নিয়োগ আর প্রমোশন নীতিমালা দিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষার উন্নতির বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হলো। এমনিতেই আমাদের শিক্ষার মান তলানিতে এসে ঠেকেছে, এখন সেই তলানিকেই নিচে নামানো হলো। সবকিছুকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয়, যারা এই নীতিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা জানেন না বিশ্ববিদ্যালয় মানে কী? তারা জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান বাড়াতে হলে কী করা উচিত। শিক্ষকতা প্রফেশনের ভাবমূর্তি সমাজে বাড়াতে চাইলে এর নিয়োগ এবং প্রমোশন নীতিমালাকে কঠিন করতে হবে। যে কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যেতে পারেন আর যেনতেন করে যেখানে সেখানে ১২টি আর্টিকেল প্রকাশ করতে পারলেই অধ্যাপক হয়ে যেতে পারলে মানুষ শিক্ষকদের কেন সম্মান করবে? আর শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের মান বাড়ানো সর্বাগ্রে প্রয়োজন। এ কথাগুলো যত দ্রুত উপলব্ধি করব ততই আমাদের মঙ্গল।

একটি নিয়ম করা যেতে পারে, সেটা নিম্নরূপ। একজন প্রভাষক তিন বছর পর সহকারী অধ্যাপকের বেতন পেতে পারেন কিন্তু তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাবেন না যতক্ষণ তার পিএইচডি এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরযুক্ত জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। সেই সময় তার পদ হতে পারে সিনিয়র প্রভাষক। আবার এর মধ্যে যদি সহকারী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন তখন পদসহ প্রমোশন দেওয়া যেতে পারে। আবার দশ বছর পর যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয় অন্যান্য নিয়ম-কানুন ঠিক থাকলে তাকে সহযোগী অধ্যাপকের বেতন দেওয়া যেতে পারে কিন্তু পদ হবে সহযোগী প্রভাষক এবং তখনো পিএইচডি বা পাবলিকেশন না বাড়লে ওই সহযোগী প্রভাষক হিসেবেই অবসরে যাবেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষকদের মধ্যে একটি সুস্থ চাপ বজায় রাখা যায়, যার মাধ্যমে শিক্ষকরা নিয়ত চেষ্টা করে যাবেন নিজের উৎকর্ষ সাধন করতে। মনে রাখতে হবে, পদার্থবিজ্ঞানে কাজ হলো বল এবং বলের দিকে সরণের গুণফল। ঠিক তেমনি আমাদের উৎকর্ষের সরণ ঘটাতে হলে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।

য় ড. কামরুল হাসান মামুন : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে