উৎপাদনমুখী রাজনীতি

  এমাজউদ্দীন আহমদ

১৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ মে ২০১৮, ০১:৪২ | প্রিন্ট সংস্করণ

অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতি যে অস্থিতিশীল তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রায় সব উন্নয়নমূলক কর্মসূচি সরকার কর্তৃক সূচিত এবং এসব কর্মকা-ে জনগণের সম্পৃক্ততা তেমন গভীর নয়। এসব দেশে বেসরকারি উদ্যোগ পল্লবিত হওয়ার তেমন সুযোগ লাভ করেনি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। উন্নত সমাজে অবশ্য দুটি ধারাই সুস্পষ্ট। তাই ওই সব দেশে সরকারি ও বেসরকারি কাজের সমন্বয় সাধনই মুখ্য। অনুন্নত দেশে প্রায় সর্বত্রই জনগণ সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল, যদিও এসব উদ্যোগে জনকল্যাণমূলক কাজ তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়ে ওঠে না। এসব কারণেই উন্নয়নশীল দেশে শাসনযন্ত্র এত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। এই মূল্যবান যন্ত্রটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই উন্নয়নশীল দেশগুলোয় রাজনীতি এত আবেগজড়িত এবং আকর্ষণীয়। রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক এলিটরা শাসনযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উঠেপড়ে লাগেন। আর একবার তা আয়ত্তে এলে তা যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করেন। প্রয়োজনবোধে এ জন্য হিংসাত্মক পথও বেছে নেওয়া হয়। এ-ও দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হিংসাত্মক কার্যকলাপের অধিকাংশই সংঘটিত হয় সমাজের প্রভাবশালী এলিট গোষ্ঠীর প্ররোচনায়। নিজেদের স্বার্থে তারাই জনগণকে ব্যবহার করে থাকে।

ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে সমাজের এই প্রবণতা গভীর আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করেন। একজন শিল্পীর মতো। এই প্রবণতা সমাজজীবন থেকে দূর করার জন্য কৃতসংকল্প হয়ে ওঠেন। তিনি একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়কের মতো অনুধাবন করেন যে, যে সামাজিক অর্জনে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই, তা জনগণের নিজস্ব হতে পারে না। তা সংরক্ষণে কোনোদিন জনগণ আগ্রহী হয়ে ওঠে না। এই সত্য অনুধাবন করেই জিয়াউর রহমান গ্রামীণ পূর্তকর্মে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কৃষির উন্নতি সাধনের নিমিত্তে যে খাল কাটা বিপ্লবের সূচনা করেন তার প্রধানতম শর্ত ছিল গ্রামীণ জনসাধারণের স্বেচ্ছাশ্রম। কাউকে বাধ্যতামূলক শ্রমে টেনে না এনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেই কোদাল হাতে মাটি কেটে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জনসাধারণের সর্বাধিক উপযোগ স্মরণ রেখে প্রকল্প নির্ধারণ করে, প্রত্যেকটি প্রকল্পে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, উন্নয়নমূলক কর্মে জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমের যে নতুন অধ্যায় তিনি শুরু করেন, তার কোনো তুলনা নেই। বিভিন্ন পর্যায়ে জনসমর্থনের মাধ্যমে এর পুরস্কারও তিনি লাভ করেন। আগেই বলেছি, রাজনীতিকে তিনি ক্ষমতার রাজনীতির অন্ধগলি থেকে সরিয়ে নিয়ে কর্মোজ্জ্বল রাজপথে স্থাপন করেছেন। আদেশ-নির্দেশের উচ্চতার শিখর থেকে নামিয়ে আনলেন সামাজিক উপত্যকায় মাটি ও মানুষের কাছাকাছি। নৈর্ব্যক্তিক সরকারি কার্যক্রমকে নিজেদের লোনা স্বেদযুক্ত করে নিজেদের কার্যকর উদ্যোগ ও পরিশ্রম মিশিয়ে জনগণের নিজস্ব কার্যক্রমে রূপান্তরিত করেন। ক্ষমতার অন্তঃসারশূন্য রাজনীতিকে উৎপাদনমুখী রাজনীতির স্বরূপে প্রকাশিত হতে সহায়তা করেছেন। উৎপাদনমুখী না হলে রাজনীতি যে বিভাজনের কৌশলমাত্র, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু যে তা প্রতারণার কলাকৌশল এবং তা যে একেবারে অগ্রহণযোগ্য তা জিয়াউর রহমান প্রমাণ করলেন এবং দেশব্যাপী উৎপাদনমুখী রাজনীতির নতুন অধ্যায় রচনা করলেন।

উন্নয়ন সাহিত্যের (উবাবষড়ঢ়সবহঃ খরঃবৎধঃঁৎব) সর্বত্রই বলা হয়েছে, যাদের জন্য উন্নয়ন তাদেরই সর্বপ্রথম উন্নত করতে হবে। রাজনীতির বিভিন্ন আলেখ্যে তেমনিভাবে উচ্চারিত হয়েছে, যাদের ঘিরে রাজনৈতিক কর্মকা- তাদেরই সর্বাগ্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট করতে হবে। বিভিন্ন জনপদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এবং গণতান্ত্রিক সমাজের গতিধারা পর্যবেক্ষণ করে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করেন। জিয়ার নেতৃত্বের সুষ্ঠু পরিচয় এখানটায়। কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে খাল কাটা বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি যেমন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করেন উন্নয়ন কর্মকা-ে, তেমনি মানবসম্পদ উন্নয়নে, বিশেষ করে বয়স্কদের মাঝে সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য, দেশের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে যেভাবে সাক্ষরতা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন এবং প্রতিবছর এক কোটি জনসমষ্টিকে সাক্ষর করা ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে চার কোটি ব্যক্তিকে শিক্ষার আলো দান করার যে কর্মসূচি তিনি প্রণয়ন করেন, তাও ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত উদ্যোগ। নিয়মিত ও অনিয়মিত প্রক্রিয়ায় সাধারণ শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, শিক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে জাতীয় শক্তিকে এই উর্বর খাতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা তিনিই সর্বপ্রথম গ্রহণ করেন।

১৯৯০ সালে ইউনেসকো (টঘঊঝঈঙ) রিপোর্টে যে তথ্য প্রকাশিত হয় তা সত্যিই ভয়াবহ। বিশ্বের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ নিরক্ষর বাংলাদেশের। এ সংখ্যা ভারত, চীন ও পাকিস্তানের নিরক্ষরদের পরেই। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে নিরক্ষরদের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি। ১৯৯৯ সাল নাগাদ এই সংখ্যা হয়েছে ছয় কোটির মতো। এই সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও সাক্ষরতার হার বাড়ছে ধীরে ধীরে। যদি জিয়াউর রহমানের কর্মসূচি অব্যাহত থাকত, যদি জাতীয় সম্পদের বড় একটা অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত হতো এবং জাতির শিক্ষিত জনসমষ্টির সৃজনশীল অংশ জরুরিভিত্তিতে শিক্ষার প্রসারে নিয়োজিত থাকত, তা হলে নিরক্ষরতার অন্ধকার আজকে যত গভীর হয়েছে তা হতো না। বাংলাদেশের সার্বিক চেহারা অনেকটা পাল্টে যেতে পারত।

আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা উভয়ই আমাদের দেশে অত্যন্ত শিথিল। এর কারণও রয়েছে। এক. এ দেশে আইনে জনমতের প্রতিফলন কদাচিৎ ঘটে। দুই. এই সমাজে আইন প্রয়োগকারীদের কোনোদিনই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় না। তা ছাড়া আইনের প্রতি জনগণের আস্থাকে সুদৃঢ় করার জন্য কোনো সার্থক প্রচেষ্টা এ দেশে গৃহীত হয়নি, বরং ক্ষমতাসীনরা আইন প্রয়োগকারীদের মাধ্যমে অনেক সময় আইনের গলা টিপে মেরেছেন। ফলে আইনের প্রতি আস্থাহীনতা এবং আইন প্রয়োগকারীদের প্রতি অশ্রদ্ধা, এই দুই মিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এবং রাজনীতিকে হিংসাত্মক করেছে। বাংলাদেশে এই সমস্যা নতুন নয়, কিন্তু এর সমাধানের জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম এই সমস্যাকে সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা গ্রহণ করেন। তিনি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। বহুসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকে নতুনভাবে প্রশিক্ষণ দান করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বহুসংখ্যক নতুন মুখ সংযোজন করে এই নিস্তেজ বাহিনীকে কর্মক্ষম করেন। জিয়াউর রহমানের এসব পদক্ষেপের কোনো সময়ে যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। একদিকে তিনি যেমন আইন প্রয়োগকারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে তাদের দায়িত্বশীল করেন, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর হন। গ্রামাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সর্বপ্রথম তিনি গ্রাম বাহিনী সংগঠন করেন এবং গ্রাম সরকারের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে তিনি যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (ইধহমষধফবংয ঘধঃরড়হধষ চধৎঃু- ই.ঘ.চ) গঠন করেন এবং জাতীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ১৯ দফা কর্মসূচি পর্যালোচনা করলে এটি সুস্পষ্ট হয় যে, তার ১৫টি দফাই হলো জনসাধারণের অর্থনৈতিক উন্নতিসংক্রান্ত। এই প্রক্রিয়ায় জনসাধারণ নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। সচেতন হয়েছেন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে যে সমষ্টিগত স্বার্থ এবং সবকিছুর ওপরে যে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সে সম্পর্কেও। ব্যক্তি থেকে দল বড়, দল থেকে জাতি জাতি বড়Ñ এই শিক্ষা এই জাতিকে জিয়াউর রহমানই দিয়েছেন।

য় এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে